নানা অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য শেষ হয়ে গেল আরও একটি বছর। আজ নতুন বছরের সূর্য আলোকিত করছে গোটা বিশ্ব। নানা শঙ্কা আর উদ্বেগের মধ্য দিয়েই শুরু হচ্ছে নতুন বছর। করোনা মহামারির ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের। তবে বছরের এক মাস যেতে না যেতেই শুরু হয়ে যায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। মহামারির থাবা থেকে উঠে দাঁড়ানোর আগেই এই যুদ্ধ গোটা বিশ্বের শান্তির জন্যই অনিশ্চিয়তা তৈরি করে। মূলত, বছরের প্রথমভাবে ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পরই পাল্টে যায় বিশ্ব পেক্ষাপট। বিশ্ব অর্থনীতিতে নেমে আসে কালোমেঘ। ওলটপালট করে দেয় সব হিসাব-নিকাশ। তছনছ হয়ে যায় সব কিছু।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঝামেলাপূর্ণ একটা বছরের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে একটা বছর। বাংলাদেশের সামনে ২০২৩ সাল আসছে নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে। যে চ্যালেঞ্জকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন বলা হচ্ছে। বাংলাদেশ যদি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তাহলে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। অর্থনীতির গতি যেমন বাড়বে তেমনি সম্প্রসারণশীল ধারায় এগিয়ে যাবে ২০৪১ সালের টার্গেট ধরে। উন্নত সমৃদ্ধিশালী দেশের পথে অগ্রসর হবে বাংলাদেশ।
বিদায়ী বছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেখা দেয় ডলারের চরম সংকট। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বাজারেও। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে ওঠে মূল্যস্ফীতি। আগামী বছরেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। তবে গেল বছরে নানা সংকটের মধ্যেও উচ্ছ্বাস ছড়ায় স্বপ্নের পদ্মা সেতু ও বহুল প্রতীক্ষিত মেট্রোরেল। বছরটিতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে সুসংবাদ যেমন ছিল, তেমনি ছিল নেতিবাচক খবরও। বছরের শেষ দিকে এসে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ব্যাংকিং খাতে চরম দুরবস্থার চিত্র ফুটে ওঠে, যা সরকারকে বেশ বেকায়দায় ফেলে দেয়।
জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের জিনিসের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় দেশে দেশে চড়তে থাকে মূল্যস্ফীতি। পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে থাকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর অর্থনীতির দেশ আমেরিকান মুদ্রা ডলারের দর। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের তথ্যে ২০২২ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাত্র ২ শতাংশে নেমে আসবে। এই অস্থিরতার ছোবল বাংলাদেশেও লেগেছিল; বেশ ভালোভাবেই। তবে প্রত্যাশার কথা হচ্ছে, শ্রীলঙ্কা কিংবা পাকিস্তানের মতো কোনো পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি দেশকে। বিপরীতে দেশের অর্থনীতি এখনও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যা নতুন সম্ভাবনার পথ দেখাতে পারে।
মেট্রোরেলের বাণিজ্যিক যাত্রা: ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন একটি যুগ শুরু হয়েছে গত ২৮ ডিসেম্বর। বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়েছে মেট্রোরেলের একাংশের। এর মধ্য দিয়ে বৈদ্যুতিক রেলের যুগে প্রবেশ করল দেশ। মেট্রোরেল ঢাকায় তীব্র যানজট সমস্যার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়বে। অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করবে।
তবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়ে দেশের পণ্যমূল্যের ক্ষেত্রে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার গত ৫ আগস্ট সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা, পেট্রলের দাম ৪৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা এবং অকটেনের দাম ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। দাম ৪২ থেকে ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এ হার দেশে রেকর্ড সৃষ্টি করে। মূল্যস্ফীতি যে এক লাফে সাড়ে ৯ শতাংশে উঠে গিয়েছিল, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি তাতে প্রভাব ফেলেছিল। গেল বছরে আরও কিছু ঘটনা অর্থনীতিকে নাজুক করে ছেড়েছে।
দ্রব্যমূল্যে ভোক্তার নাভিশ্বাস: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্বব্যাপী ঊর্ধ্বমুখী চাহিদায় দেশেও পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে বিদায়ী বছরে। গড়ে পণ্যের আমদানি মূল্য বেড়েছে ৫০ শতাংশ। কোনোটির দাম বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। অন্য সব ধরনের জিনিসের দামও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। তাতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যায়।
ডলার-সংকট ও রেকর্ড দাম: চলতি বছরে ব্যাংক খাতে আলোচিত ঘটনা ছিল ডলার-সংকট। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও প্রবাসী আয় কমে যাওয়ায় এই সংকট আরও তীব্র হয়। তাতে খোলাবাজারে সেঞ্চুরি হাঁকায় ডলার; ছাড়িয়ে যায় ১২০ টাকা। এরপর ব্যাংকেও ডলারের দর সেঞ্চুরি করে। ব্যাংক খাতে কয়েক মাসের ব্যবধানে ডলারের বিনিময় মূল্য ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে এখন ১০৫, ১০৬ বা ১০৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রিজার্ভে চাপ: ডলার-সংকট সামাল দিতে প্রতিনিয়ত রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। তারপরও ডলারের বাজার স্বাভাবিক হচ্ছে না। এর ফলে কমে গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। গত বছরের আগস্টে রিজার্ভ বাড়তে বাড়তে ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এখন সেই রিজার্ভ কমে ৩৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এক বছর আগে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষে রিজার্ভ ছিল ৪৬ বিলিয়ন ডলার।
খেলাপি ঋণে রেকর্ড: খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এ যাবতকালে এটিই সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের অঙ্ক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। করোনা মহামারিকালে ব্যাংকঋণ আদায়ে দেয়া বিশেষ ছাড় বছরের শুরুতে তুলে নেয়ার পর ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে খেলাপি ঋণ।
তবে বিদ্যমান নানা সংকটের মধ্যেও রপ্তানি আয়ে নতুন মাইলফলক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে গেল বছরে দেশের পণ্য রপ্তানি অবশেষে ৫ হাজার কোটি ডলারের মাইলফলকে পৌঁছায়। সব মিলিয়ে গত জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে ৫ হাজার ২০৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার সমান। এই আয় ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ৩৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি। একক মাসের হিসাবেও গত নভেম্বর মাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ; এই মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। এর আগে কখনই এক মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে এত বেশি বিদেশি মুদ্রা দেশে আসেনি।
প্রবাসী আয়ে নিম্নগতি: অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেল চাঙা হওয়ায় চলতি বছর দেশে প্রবাসী আয় ১০০ কোটি ডলার কমবে বলে বিশ্বব্যাংকের সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসেই প্রবাসী আয় ১৬০ কোটি ডলারের নিচে ছিল। চলতি মাসের প্রথম ২৩ দিনে (১-২৩ ডিসেম্বর) দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ১২৮ কোটি ৪২ লাখ ডলার। অর্থবছরের পাঁচ মাসের (জুলাই-নভেম্বর) রেমিট্যান্স প্রবাহে ২ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও, অর্থবছর শেষে এই প্রবৃদ্ধি থাকবে কী না-তা নিয়ে যথেষ্ট সংশ্রয় দেখা দিয়েছে।
মাথাপিছু আয় ২,৮২৪ ডলার: দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ২৩৩ ডলার। গত পাঁচ বছরে এ দেশের মাথাপিছু আয় ৩৮ শতাংশের বেশি বেড়েছে। দেশের অভ্যন্তরে ও দেশের বাইরে থেকে একটি দেশে যত আয় হয়, সেটিকে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে মাথাপিছু আয়ের হিসাব করা হয়।
আনন্দবাজার/শহক









