পুরনো সংযোগে বাড়ছে ঝুঁকি
তিন শতাধিক কক্ষে এসি ব্যবহার করা হচ্ছে। যা গণপূর্ত বিভাগের অনুমোদিত নয়। এমনকি এসব এসির ৯০ শতাংশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করেনি। এগুলো দিয়েছে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি
গত একযুগে বিদ্যুৎ বিভাগ সংস্কারের নামে যত বরাদ্দ এসেছে তার অধিকাংশই লোপাট হয়েছে। এক কর্মকর্তা জানান, বিগত ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বরাদ্দ আসে ৪ কোটি টাকা। তার সিকিভাগও কাজে আসেনি, হয়েছে লুটপাট। দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি
রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে বাড়ছে শর্ট সার্কিট থেকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। হাসপাতাল সূত্র বলছে, গত ১২ বছরে এ হাসপাতালে দুর্বল সট সার্কিট থেকে ৪২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৬ ব্যক্তির মৃত্যুও হয়েছে। তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে আহত হয়েছে অন্তত শতাধিক রোগী।
সর্বশেষ এক মাসে দুই দফা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে হাসপাতালটিতে। বিদ্যুতের পুরোনো লাইনগুলো অপরিকল্পিতভাবে যুক্ত করায় বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামের চাপ নিতে পারছে না। এ কারণে প্রায়ই বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনার শঙ্কা হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের।
জানা যায়, ১৯৭৬ সালে ৪ তলা ভবনে যাত্রা শুরু হয় ৫০০ শয্যার রমেক হাসপাতাল। পরে রোগির চাপ বেড়ে যাওয়ায় একে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হয়। সেই সঙ্গে ভবন করা হয় পাঁচ তলা। বর্তমানে প্রতিদিন আড়াই হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন হাসপাতালটিতে। এখানে বিদ্যুতের ব্যবহার বহুগুণে বৃদ্ধি পেলেও পুরোনো সংযোগেই চলছে কার্যক্রম। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ভারি চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত এসি ব্যবহার করায় বাড়তি চাপ পড়ছে সংযোগগুলোর ওপর।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, দিন দিন হাসপাতালের পরিধি বৃদ্ধি, ভারি যন্ত্রপাতি স্থাপন ও এসির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় পুরোনো বিদ্যুতের সংযোগ চাপ নিতে পারছে না। এতে বিদ্যুৎবিভ্রাটে বিকল হয়ে পড়ছে কোটি টাকা মূল্যের সরঞ্জাম। বিদ্যুৎ সংযোগ সংস্কারে প্রতি বছর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে অর্থ চেয়ে পত্র পাঠালেও পর্যাপ্ত টাকা পাওয়া যাচ্ছে না।
হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকে তিন বছরে হাসপাতালে ছোটবড় অন্তত ১০টি অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। এসব ঘটেছে বিদ্যুতের নড়বড়ে সংযোগের কারণে। সর্বশেষ ২২ জানুয়ারি মধ্যরাতে হাসপাতালের নিচ তলায় পরিচালকের কার্যালয়ের সামনে বিদ্যুতের মেইন ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ডে (এমডিবি) আগুন লাগে। গণপূর্ত বিভাগ ধারণা করছে, সংযোগের ওপর বাড়তি চাপের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।
হাসপাতালের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বর্তমানে এখানে তিন শতাধিক কক্ষে এসি ব্যবহার হচ্ছে, যা গণপূর্ত বিভাগের অনুমোদিত নয়। এমনকি এসব এসির ৯০ শতাংশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করেনি। বিভিন্ন সময়ে নানা ওষুধ কোম্পানির পক্ষ থেকে এসিগুলো চিকিৎসকদের উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসকেরা এগুলো কক্ষে লাগিয়েছেন।
গণপূর্ত বিভাগ জানায়, হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে ভারি ভারি যন্ত্রপাতি, এক্সরে মেশিন বসানো হয়েছে। এসব বসাতে গণপূর্তের অনুমোদন নিতে এবং তাদের মাধ্যমে স্থাপন করতে হয়। কিন্তু সেটা করা হয় না। এ কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং অগ্নিসংযোগ ঘটছে।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন স্থাপন করা হয় ২০১৪ সালে। মেশিন দুটি ২০২০ সালে অচল হয়ে যায়। এ ছাড়া আরও পাঁচটি সাধারণ এক্স-রে মেশিন বিকল রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।
হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তর এবং গণপূর্ত বিভাগ জানিয়েছে, বিদ্যুতের সংযোগ সংস্কারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ১ কোটি ১৪ লাখ ৩১ হাজার ৩১ টাকার একটি চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এখনো সেটি পাস হয়ে আসেনি। এর আগের দুই অর্থবছরে সংস্কারের জন্য যে অর্থ পাওয়া গেছে তা ছিল চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের কম।
রংপুর গণপূর্তের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোছা. রাজিয়া সুলতানা বলেন, বিদ্যুতের সংযোগগুলো পুরোনো হওয়ায় ওভার লোড নিতে পারছে না। সে কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকছে। এ ছাড়া যেসব এসি এবং ভারিযন্ত্র বসানো হয় তা অনেক সময় আমাদের জানার বাইরে। এসব সংযোগ দেওয়ার জন্য আমাদের জানালে আমরা সেটা বলতে পারতাম কোথায় কীভাবে লাগাতে হবে, কোনো সংযোগ সেটার লোড নিতে পারবে কি পারবে না। রাজিয়া সুলতানা আরও জানান, হাসপাতালের বৈদ্যুতিক সংযোগ মেরামতের জন্য অর্থ চেয়ে যে প্রস্তাব পাঠানো হয় তার পুরোটা পাওয়া যায় না। এ কারণে পুরো সংস্কারও সম্ভব হয় না।
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক মো. রেজাউল করিম আনন্দবাজারকে বলেন, ‘সংস্কার প্রয়োজন। প্রতি বছর কিছু কিছু হয়, কিন্তু যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু হচ্ছে না। এগুলোর দায়িত্বে আছে গণপূর্ত। আমি তাদের অনুরোধ করব, হাসপাতালের যে বৈদ্যুতিক সাপ্লাই সিস্টেম রয়েছে, সেগুলো পুরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটা রিপোর্ট দিতে। একই সঙ্গে কত এসি কে ব্যবহার করছে, সেগুলো সার্ভে করে রিপোর্ট দিতে। লোডে একটু ভারসাম্যহীনতা থাকতে পারে, সেটাও তারা বের করবে। এ জন্য তাদের সঙ্গে আমি বসব।
রংপুরের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, গত একযুগে এ হাসপাতালের বিদ্যুৎ বিভাগ সংস্কারের নামে যত বরাদ্দ এসেছে তার অধিকাংশই লোপাট হয়েছে।
হাসপাতালের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান, বিগত ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিদেশ বিভাগ মেরামতের জন্য বরাদ্দ আসে ৪ কোটি টাকা। কিন্তু তার সিকিভাগও কাজে আসেনি, হয়েছে লুটপাট। লুটপাটের অভিযোগে দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।









