দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
মাত্র কয়েকদিন আগে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার এক সাবেক প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম ব্রেনষ্টক হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে নিউরো বিভাগের ৪৭নং বেডে। জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি হলেও ইর্ন্টানি চিকিৎসক খোঁজ নিলেও সিনিয়র কোনো ডাক্তারের দেখা মেলেনি। পরে পরিবারের লোকেরা তাকে ভালো চিকিৎসা পেতে তাকে ৪৪০নং কেবিনে নেয়। হাসপাতালের বাহিরে পার্সোনাল চেম্বারে ছুটোছুটি করে সিনিয়র ডাক্তারের সন্ধান করে।
একই অভিযোগ করে বিরামপুরের বামুন্ডাগ্রামের বাসিন্দা আজিজুর রহমান ও হাসিনা বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে মেহেদী হাসান। এক সপ্তাহ ধরে পেটে ব্যথা অনুভব করছিলেন মেহেদী। বাবা-মা ছেলেকে নিয়ে গত শুক্রবার যান দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দেখানো হলে মেহেদীকে ভর্তি করে নেওয়া হয়। এরপর থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মেহেদী। তবে দিনে তাকে চিকিৎসক দেখেছেন মাত্র এক বার। এর মধ্যে দুবার এক্স-রে করা হলেও চিকিৎসক ঠিকমতো না আসায় তা দেখানো সম্ভব হয়নি। একমাত্র ছেলেকে হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখলেও কিছুই করার ছিল না বাবা-মায়ের।
আরও খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে এই হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে নীলফামারীর ডিমলা থেকে আসা আমির হামজার। আট দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও পেয়েছেন শুধু ইন্টার্ন চিকিৎসকের জোড়াতালির সেবা। ক্ষুব্ধ আমির হামজা বলেন, ‘দুই মাস আগে আমার ডান পায়ের রক্ত নালি শুকিয়ে যাওয়ায় ব্যথা শুরু হয়। তখন এ হাসপাতালে ভর্তি হই। সে সময় অপারেশন করে আমার ডান পায়ের পাঁচটি আঙুল কেটে ফেলা হয়। এরপর চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে যাই। তবে, আমার ডান পায়ে আবার ব্যথা শুরু হলে এই হাসপাতালে আবারো ভর্তি হই। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ডাক্তারের দেখা মিলছে না। শুধু ইন্টার্ন ডাক্তাররা আমাকে সেবা দিচ্ছে। যেখানে আগে বড় ডাক্তাররা দিনে একবার হলেও আসতেন। এখন তো একবারও ঠিকমতো আসেন না। ইন্টার্ন ডাক্তারদের কিছু বললে তারা আমাকে বলে হাসপাতালে ডাক্তার সংকট। যারা আছে তাদের দিয়েই পুরো হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
জাতীয় সংসদের হুইপ ও দিনাজপুর সদর আসনের এমপি ইকবালুর রহিম প্রতিবারই সরকারি কর্মসূচিতে দিনাজপুরে আসলে এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। প্রতিবার পরিদর্শন করলেও চিকিৎসক সংকটে জোরালো কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। এতে চলতে হয়, তাই চলছে এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি। সেবার মান বলতে কিছুই নেই।
সরজমিনে হাসপাতালের ৪র্থ তলায় দেখা গেছে রোগীদের খাদ্যপণ্য কুকুরে খাচ্ছে। যত্রতত্র দেয়ালে পানের পিক, রোগীদের নষ্ট ও ফেলে দেওয়া খাবার পড়ে আছে বারান্দার এখানে ওখানে। যেনো দেখার বা পরিস্কার করার কেউ নেই। পুরো হাসপাতালটি ডাক্তারসহ জনবল সংকটে ভুগছে। হাসপাতালে কে আয়া, কে নার্স বুঝাও মুশকিল?
শুধু মেহেদী হাসান ও আমির হামজা ও শিক্ষক আমিনুল ইসলামের ক্ষেত্রেই যে এরকম ঘটনা ঘটেছে তা নয়। এই হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন আসা ৬শ’ থেকে ৭শ’ রোগীর সঙ্গে একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। কারণ তীব্র চিকিৎসক সংকট। ২০২১ সালে চিকিৎসা সেবায় দেশের দ্বিতীয় ¯’ান অর্জন করেছিল ৫শ’ শয্যার এ হাসপাতালটি। হাসপাতালে চিকিৎসকদের অনুমোদিত পদ রয়েছে ২০২টি। তবে সেই পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৬৯ জন। চিকিৎসক শূন্যতার এই হার শতকরা ৬৬ শতাংশ। এ ছাড়া ১৫০ জন ইন্টার্ন চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১০৫ জন।
এ প্রসঙ্গে দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. আরমান হোসেন বলেন, ‘দিনাজপুর একটি বড় জেলা। হাসপাতালে শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। কেননা ঢাকা থেকে অনেক দূরের এই উত্তরাঞ্চলের জেলা। তাই শুধু এই জেলারই নয়, পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী ও জয়পুরহাট জেলা থেকেও রোগী এখানে আসে। কিš‘ রোগীর তুলনায় হাসপাতালে যত সংখ্যক চিকিৎসক থাকা দরকার, তা নেই। চিকিৎসক সংকটের পরও আমরা ইন্টার্ন চিকিৎসকরা রোগীদের শতভাগ সেবা নিশ্চিতের চেষ্টা করছি। চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো হলে আমাদের কাজ করতে সুবিধা হবে।’
চিকিৎসক সংকটে অস্ত্রোপচারের কাজও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ডা. মো. মফিজুর রহমান চৌধুরী লিটন। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের হাসপাতাল থেকে ৬জন সিনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যানেসথেসিওলজিস্ট বদলি হওয়াতে আমরা সংকটে পড়েছি। গড়ে আমাদের প্রচুর অপারেশন করতে হয়। কিš‘ চিকিৎসক সংকটের ফলে ঠিকমতো অপারেশন করতে হিমশিম খেতে হ”েছ। তারপরও যে জনবল রয়েছে, তা দিয়ে আমরা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। বর্তমানে রমজান মাসে রোগীর অপারেশন কম হচ্ছে। তবে ঈদের পর অপারেশন রোগীর সংখ্যা বাড়বে। তখন আমরা অনেক সংকটে পড়ে যাব। তাই এখনই চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো উচিত।’
চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী শামীম হোসেন বলেন, ‘এই হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ৫০০ হলেও প্রতিদিন গড়ে নতুন রোগী আসে ৬ থেকে ৭শ’ জন। এ ছাড়াও বহির্বিভাগের রোগী আছে। আর গড়ে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০টি অপারেশন করা হয়। তবে এই হাসপাতালে অনুমোদিত পদের সংখ্যায় অনেক কম চিকিৎসক রয়েছেন। তারপরও আমরা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। কয়েক দিন আগে ১২ জন জুনিয়র কনসালট্যান্টকে বদলি করা হয়। এরপর মধ্যে ৬ জন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ছিলেন। যার ফলে আমাদের অপারেশন করতে সমস্যা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন র্কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এর বাইরেও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিকিৎসক সংকট দূর করার জন্য কথা বলেছেন।’









