
সবুজ কারখানা এমন একটি পরিবেশ বান্ধব শিল্প কারখানা যেখানে আন্তর্জাতিক সব নিয়ম মেনে করা হয়। যে কারখানার জন্য অধিগ্রহণ করা জমির অর্ধেকটাই থাকবে সবুজায়নের জন্য। কারখানা ঘিরে সবুজ বাগান আর চারপাশে খোলা জায়গা থাকবে। কারখানার ভেতরেও থাকবে খোলা জায়গা।
শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ থাকবে পরিবেশবান্ধব। ঘিঞ্জি বা গা ঘেঁষাঘেঁষি করে নয়, এক শ্রমিক থেকে অন্য শ্রমিকের দূরত্ব থাকবে। তবে এসবই করা হবে অটোমেশনে। যন্ত্রপাতি হতে হবে অত্যাধুনিক এবং অন্তত ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী। থাকবে সোলার প্যানেল, এলইডি লাইট। এছাড়াও হবে পানি রি-সাইকিন হবে।
সবুজ কারাখানা বা গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি শব্দটি এসেছে মূলত গ্রিন ইকোনমি বা টেকসই অর্থনীতির ধারণা থেকে। যা বিশ্ব ব্যাংক এবং ইউনাইটেড ন্যাশন এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের মতো কিছু সংস্থা অনুসরণ করে থাকে। বিভিন্ন ধরনের কৌশল, নীতি আর কর্মসূচির সমন্বয়ে তৈরি হওয়া সবুজ কারখানা মূল লক্ষ্য তাকে সুষ্ঠু উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো। ইউনাইটেড ন্যাশন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশনের মতে, সবুজ কারখানা একটি টেকসই মানোন্নয়ন ব্যবস্থার রূপরেখা বা যাত্রাপথ। যা সুষ্ঠু ও সঠিক জনবিনিয়োগ ও নীতির মাধ্যমেই পরিচালিত হবে।
মূলত, সবুজ কারাখানা সব দিক দিয়েই পরিবেশের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন। বলা যায়, অন্যান্য শিল্পকারাখানা যেখানে পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ, সেখানে সবুজ কারাখানা ঠিক তার উল্টো। পরিবেশ, জীব ও মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় এমন কোনো পণ্য উৎপাদন না করাই থাকে মূল লক্ষ্য। চূড়ান্তভাবে, একটি সবুজ কারাখানা একদিকে অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে জোর দেয়, অন্যদিকে, পরিবেশ ও সামাজিক অবস্থার অবনতি না ঘটিয়ে কীভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি ঘটানো যায় সে দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখে।
পণ্য উৎপাদনের জন্য যেসব প্রাকৃতিক প্রভাবক ও যোগান সরবরাহ করা হয় (পানি, প্রাকৃতিক শক্তি, গ্যাস, কাঁচামাল) তার ব্যবহার কমিয়ে আনা হয় সবুজ কারাখানায়। কঠিন ও তরল বর্জ্যকে পুণরায় ব্যবহারযোগ্য করার চেষ্টা করা হয়। উৎপাদনের ক্ষেত্রে কোনো রকম বিষাক্ত পদার্থের ব্যবহার করা হয় না। অন্যদিকে উৎপাদনের ফলে পরিবেশের ক্ষতি করে এরকম কোনো প্রকার গ্যাস যেন নির্গত না হয় সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা হয়।
বিগত ১৯৯৩ সালে যাত্রা শুরু করে ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) নামের সংস্থার। এর অধীনে শিল্প-কারাখানার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভবন, স্কুল, হাসপাতাল, বাড়ি, বিক্রয়কেন্দ্র, প্রার্থনাকেন্দ্রের মতো বিভিন্ন স্থাপনা পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা যায়। এই সংস্থার সনদ পাওয়া সারাবিশ্বে বাণিজ্যিক স্থাপনার সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে গেছে। সনদের জন্য নয়টি শর্ত পরিপালনে মোট ১১০ পয়েন্ট আছে। এরমধ্যে ৮০ পয়েন্টের ওপরে হলে ‘লিড প্লাটিনাম’, ৬০-৭৯ হলে ‘লিড গোল্ড’, ৫০-৫৯ হলে ‘লিড সিলভার এবং ৪০-৪৯ হলে ‘লিড সার্টিফায়েড’ সনদ মেলে। মোট পয়েন্টকে সাতটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সনদ দেয়া হয়। এগুলো হচ্ছে- জমির ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য ২৬ পয়েন্ট, পানি সাশ্রয়ে ১০ পয়েন্ট, প্রাকৃতিক শক্তির ব্যবহারে ৩৫ পয়েন্ট, পরিবেশ বান্ধব নির্মাণসামগ্রীর জন্য ১৪ পয়েন্ট, অভ্যন্তরীণ পরিবেশগত অবস্থার জন্য ১৫ পয়েন্ট, অতি সাম্প্রতিক উদ্ভাবিত যন্ত্রের ব্যবহারে ৬ পয়েন্ট এবং এলাকাভিত্তিক প্রাধ্যান্যতা বিবেচনায় ৪ পয়েন্ট।
এর মধ্যে আবার নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হয় ইউএসজিবিসির স্বীকৃতি পেতে। এর মধ্যে প্রথমত, কারখানা নির্মাণে কী ধরনের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে; দ্বিতীয় কারখানায় সূর্যের আলোর কী পরিমাণ ব্যবহার হয়; তৃতীয়ত, সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার করা হয় কিনা; চতুর্থত, কারখানার নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে শ্রমিকদের বাসস্থান আছে কিনা; পঞ্চমত, স্কুল, বাজার করার ব্যবস্থা বা বাসস্ট্যান্ড রয়েছে কিনা; ষষ্ঠত, সূর্যের আলো ব্যবহার করার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুত ও বিদ্যুতসাশ্রয়ী বাতি ব্যবহার করা হয় কিনা; সপ্তমত, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তা ব্যবহার করা হয় কিনা; অষ্টমত, কারখানা নির্মাণে নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা রাখা হয়েছে কিনা; নবমত, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আছে কিনা এবং বৈদ্যুতিক ফিটিংস স্থাপন ছাড়াও অগ্নি দুর্ঘটনা এড়াতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে কিনা এসব শর্ত পূরণ করতে হয়।
উদ্যোক্তারা বলছেন, সবুজ কারাখানা স্থাপন করতে প্রচুর বিনিয়োগের প্রয়োজন। বিনিয়োগের পরিমাণ দুশ থেকে তিনশ কোটি টাকার বেশি। এর পাশাপাশি জমিরও প্রয়োজন পরে ৩ থেকে ১০ বিঘা। এখন অবধি দেশে যেসব শিল্পকারাখান সবুজ কারাখানার স্বীকৃতি পেয়েছে তাদের বেশিরভাগ উদ্যোক্তার বিনিয়োগ ৫০০ থেকে ১১০০ কোটি টাকার মধ্যে। মূলত, সবুজ কারখানার স্বীকৃতি পেতে একটি প্রকল্পকে ইউএসজিবিসির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ থেকে উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে সর্বোচ্চ মান রক্ষা করতে হয়। ভবন নির্মাণ শেষ হলে কিংবা পুরনো ভবন সংস্কার করেও আবেদন করা যায়।
আনন্দবাজার/শহক








