- করোনায় বিধ্বস্ত টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প
- শ্রমিক-অর্থ সংকটে বন্ধ ৮০ শতাংশ তাঁত
- বেড়েছে সুতার দাম
করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবায় তীব্র সংকটে পড়েছে টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প। করোনা সংক্রমণের প্রথম থাবাতে তাঁতীরা অস্থায়ী সংকট মনে করলেও ক্রমশ তাঁতপল্লীর অবস্থা স্থায়ী সংকটের সম্মুক্ষিণ হয়। কাপড়ের চাহিদা না থাকায় টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লীতে অসংখ্য তাঁত বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে বিক্রি করতে না পেরে তাঁতীদের ঘরেই পড়ে থাকে অসংখ্য মূল্যবান তাঁতের শাড়ি। এতে বিপাকে পড়েন তাঁতীরা। এ শিল্পের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন তাঁতশিল্পের সাথে সম্পৃক্তরা। তবে তাঁতী বা তাঁতশিল্পের সাথে সম্পৃক্তরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।
করোনার প্রথম ঢেউয়ে লকডাউনে তাঁতে কাপড় তৈরিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ছিল। দীর্ঘস্থায়ী লকডাউনের কবলে পড়ে ওই সময় অসংখ্য তাঁতশ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েন। বেঁচে থাকার তাগিদে এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যোগ দেন অসংখ্য তাঁতশ্রমিক।
এদিকে করোনা মহামারির সঙ্গে গত ২০২০ সনের বন্যার ভয়াল থাবায় জেলার তাঁতশিল্পকে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানায় তাঁত মালিকদের বিনিয়োগ বিনষ্ট হচ্ছিল। বন্যার পানি প্রবেশ করে ফ্যাক্টরিতে চালু তাঁত, তাঁতে থাকা সুঁতার ভিম, কাপড় ও সরঞ্জামাদি প্রায় সবই নষ্ট হয়। এরপরও তাঁতশিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২১ সনের রমজানের আগ মূহুর্ত থেকে কিছু কিছু তাঁত খুলতে শুরু করে। এরইমধ্যে সুঁতা, রঙ, রাসায়নিক কেমিক্যাল ও তাঁতের অন্যান্য সরঞ্জামাদির দামও বেড়ে যায়। করোনা দ্বিতীয় ঢেউ এসে সেখানেও আঘাত করে।
তাঁতপল্লী ঘুরে জানা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে তাঁত বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন তাঁতীরা। কর্মহীন হওয়ায় পেশা পরিবর্তন করে শ্রমিকরা। করোনার প্রথম ধাপে করটিয়া শাড়ীরহাট বন্ধ আর শো-রুমগুলোতে ক্রেতা না থাকায় শাড়ী উৎপাদন করেনি মালিক পক্ষ। শাড়ীহাট আর শাড়ী বানানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও এখনও তাঁতপল্লীর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়েনি। ক্রেতা শূণ্যে অধিকাংশ তাঁত বন্ধ করে দিয়েছে মালিক পক্ষ।
জেলার অধিকাংশ তাঁতীদের ঘরেই পড়ে রয়েছে অবিক্রিত শাড়ী। বিছানায় অগোছালো রয়েছে মূল্যবান শাড়ী। তাঁতীদের লোনকৃত টাকা আটকে রয়েছে এ কাপড়ে। লোনকৃত টাকা নিয়ে চরম হতাশায় রয়েছেন তাঁতীরা। তাঁতশিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারের জন্য জেলার কালিহাতীর বল্লায় (ঘাটাইল, মধুপুর, ধনবাড়ী, গোপালপুর, কালিহাতী ও ভূঞাপুর উপজেলার জন্য একটি এবং সদর উপজেলার বাজিতপুর, দেলদুয়ার, বাসাইল, মির্জাপুর, নাগরপুর, সখীপুর ও সদর উপজেলার জন্য একটি) বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের দুইটি বেসিক সেন্টার রয়েছে। বাতাঁবো’র বাজিতপুর ও বল্লায় এ দুটি বেসিক সেন্টারের নিয়ন্ত্রণে ৪৯টি প্রাথমিক তাঁতী সমিতি এবং ৪টি মাধ্যমিক তাঁতী সমিতি রয়েছে। এসব সমিতির চার হাজার ৩৯১টি তাঁত ফ্যাক্টরি মালিকের ৩০ হাজারের উপরে তাঁত রয়েছে। এ পেশায় এক লাখ তিন হাজারেরও বেশি তাঁত শ্রমিক সম্পৃক্ত।
পাথরাইলের কৃষ্ণনগর পাড়ার তাঁতী বাদল রাজবংশী বলেন, ‘আমার ৪০টি তাঁত রয়েছে। এরমধ্যে করোনার প্রভাবে বর্তমানে ২০টি চালু রয়েছে। এগুলোও বন্ধের উপক্রম। বাজারে কাপড়ের চাহিদা নেই। বিক্রি করতে না পারায় এখনও আমার ঘরে ৫ শতাধিক কাপড় রয়েছে। এতো টাকার কাপড় আটকে থাকলে ব্যবসা করবো কী দিয়ে। ব্যাংকের লোন পরিশোধ করবো কীভাবে?’
তিনি আরও বলেন, ‘টাঙ্গাইলের সবচেয়ে বড় শাড়ীহাট করটিয়া। লকডাউনে সেটাও বন্ধ ছিল। বাস বন্ধ থাকায় অন্য জেলা থেকে পাইকাররা আসতে পারেনি। এজন্য কাপড়গুলো তখন বিক্রি হয়নি। যানবাহন ও হাট বাজার চালু হলেও শাড়ি বিক্রি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে তাঁতশিল্প টিকিয়ে রাখা অসম্ভব।’
তাঁত মালিক প্রদীব রাজবংশী বলেন, ‘আমার চারটি তাঁত ছিল। করোনার আগে বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন তাঁত বন্ধ ছিল। ২৫০ টাকার সুঁতা এখন সাড়ে ৯শ’ টাকায় পৌঁছেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এখন মহাজনের কাছ থেকে দাদন এনে দুইটি তাঁত চালু করেছি। মহাজনরা আমাদের শুধু পারিশ্রমিক দিচ্ছেন। এখনও এ এলাকায় ৮০ শতাংশ তাঁত বন্ধ। একারণে তাঁত শ্রমিকরা অন্য পেশায় চলে গেছে।’
রহিদাস বলেন, ‘করোনার কারনে তাঁত দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। পরে মহাজনদের কাছ থেকে দাদন এনে ১৪টি তাঁতের মধ্যে এখন ৪টি চালু করেছি। বিক্রি না হওয়ায় আমারও প্রায় তিন শতাধিক কাপড় ঘরে রয়েছে।’ এখন কিছু কিছু বিক্রি করছি। রাম রাজবংশী নামে আরও এক তাঁতী বলেন, ‘মহাজনের কাছ থেকে টাকা এনে ১০টি তাঁতের ৪টি চালু করেছি। আমি শুধু পারিশ্রমিক পাচ্ছি। তাঁত বন্ধ থাকায় অসংখ্য শ্রমিকরা বেকার হয়েছে।’
কাপড় ব্যবসায়ী মুন্নাব মিয়া বলেন, ‘করোনায় আমার ব্যবসা প্রায় এক বছর বন্ধ ছিল। ওই সময় টাকা-পয়সা ঋণ করে কোনও রকমে সংসার চালিয়েছি। এখন আবার কাপড়ের ব্যবসা চালু করেছি। বর্তমানে হাটে কিছু কাপড় বিক্রি হচ্ছে।’
টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লী চন্ডী-পাথরাইল শাড়ী ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক বলেন, করোনার প্রথম ঢেউয়ের পর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা কাপড় কিনতে আসা শুরু করেছিল। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আবার থেমে যায়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ঈদুল ফিতরের কয়েকদিন আগে সীমিত পরিসরে তাঁত চালু হয়েছিল। কিন্তু ক্রেতা ছিল সিমিত। বিক্রি না হওয়ায় এখনও অসংখ্য তাঁত মালিকের ঘরে কাপড় আটকে রয়েছে। টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক ও টাকার অভাবে অসংখ্য তাঁত বন্ধ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের বিশেষ নজরদারির পাশাপাশি তাঁতীদের সহজ শর্তে ঋণদানের ব্যবস্থা করা জরুরী।
আনন্দবাজার/এম.আর







