পৃথিবীপৃষ্ঠে উৎপাদিত খাদ্যসম্ভারে ধীরে ধীরে টান পড়ছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে খাদ্যের যোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশকে। সেজন্য খাদের বিকল্প উৎসের অনুসন্ধান চলছে বিগত শতাব্দি থেকেই। এক্ষেত্রে খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন অপার সম্ভাবনার একটি দিক।
তারা বলছেন, সমুদ্র-তলের খাদ্যসম্ভার ভূপৃষ্ঠের তুলনায় কোনো অংশেই কম নয়। আগামী পৃথিবীর খাদ্য, বহুমুখী খণিজ ও শিল্পের কাঁচামালের উৎস হয়ে উঠবে এসব সমুদ্র ও মহাসমুদ্রগুলো। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সম্মেলনে খাদ্য সম্ভাবনার বড় সম্ভাবনা হিসেবে সমুদ্রের বিষয় আলোচনায় উঠে আসে। স্পিরুলিনা নামে অতিক্ষুদ্র নীলাভ শৈবালকে ভবিষ্যতের সেরা খাদ্য হিসেবে সেই সম্মেলনেই ঘোষণা করা হয়। সামুদ্রিক শৈবালকে খাদ্যের বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন।
অবশ্য সেই স্বীকৃতির চার বছর আগেই ১৬৭০ সালে প্রথমবারের মতো জাপানের টোকিও উপসাগরে বাণিজ্যিকভিত্তিতে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ শুরু হয়। সেই সূচনার পর বিগত পাঁচ দশকে বিশ্বের বহু দেশে শৈবালের চাষ শুরু হয়। বর্তমানে চীন, জাপান, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চিলি, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, ফিজি, কানাডাসহ অনেক দেশে বাণিজ্যিকভিত্তিতে সামুদ্রিক শৈবালের চাষ হচ্ছে। একমাত্র বাংলাদেশেই শৈবাল পশুখাদ্য ও জমির সার হিসেবে বেশি ব্যবহার হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শৈবালের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার কারণেই এমনটা ঘটে চলেছে। তবে শুধু এই শৈবালের ওপর ভিত্তি করেই নয়, বরং সমুদ্রকে ঘিরে বিপুল অর্থনীতির স্বপ্ন দেখা শুরু হয় বিগত শতকের শেষ সময় থেকে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘে আমন্ত্রণ জানানো হয় বেলজিয়ামের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক গুন্টার পাউলিকে। তাকে ভবিষ্যতের অর্থনীতির রূপরেখা প্রণয়নের জন্য বলা হয়। সে সময় বিস্তারিত আলোচনা, গবেষণা আর নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পাউলি ব্লু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি নামে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই সমুদ্র অর্থনীতির মডেল উপস্থাপন করেন। আধুনিক বিশ্বে এই সমুদ্র অর্থনীতিকেই আগামীর সম্ভাবনাময় বিকল্প অর্থনীতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সমুদ্রের পানি আর এর তলদেশে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, সেসবের সঠিক ব্যবহার করতে পারলেই নতুন ধারার এ অর্থনীতি বদলে দিতে পারে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
মূলত, এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সাগরসীমা বিজয়ের মাধ্যমেই বাংলাদেশে অর্থনীতির অপার সম্ভাবনা ক্ষেত্র তৈরি করেছে বিশ্বের বৃহৎতম উপসাগর বঙ্গোপসাগর। এর নীলজল আর তলদেশে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তা দেশের অর্থনীতির ধারণাকেই বদলে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি (তেল-গ্যাস) মজুদ রয়েছে বঙ্গোপসাগরে। যা আগামীদিনের জ্বালানি-রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, গবেষণার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের তলদেশের খনিজ সম্পদ যথাযথ ব্যবহার করতে পারলে দেশের অর্থনীতির প্রচলিত কাঠামোই বদলে যাবে। আর এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে সমুদ্র গবেষণাবিষয়ক দেশের একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই)। যার সূচনা হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে।
আনন্দবাজার/শহক









