ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রমজানকে টার্গেট রেখে লাগামহীনভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ভোজ্য তেলের দাম। গত দুদিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে মণপ্রতি ৩শত থেকে ৪শত টাকা পর্যন্ত বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সয়াবিন ও পাম তেলের দাম। ব্যবসায়িদের দাবি আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং দর বৃদ্ধির কারণেই দাম বেড়েছে ভোজ্যতেলের। তবে ভোক্তা ও বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিন্ন কথা, তাদের ভাষ্য আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং দর বাড়লেও দেশে এখন দাম বাড়ানো হচ্ছে কারসাজি করে।
কারণ কোনো পণ্যের বুকিং দর বাড়লে তার প্রভাব পড়তে তিন মাস সময় লাগে। যেহেতু এখন যেসব ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে তা আগের বুকিংয়ে আমদানি করা। এখানে যুদ্ধকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কারসাজির মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভোজ্যতেলের দাম ইচ্ছামতো বাড়িয়ে দিয়েছেন। ভোজ্যতেলের দাম অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাওয়াতে চরম বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখে ত্বরিৎ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন বাজার বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তারা।
সূত্রমতে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে গত দুই বছরে দেশে বাজারে সয়াবিন ও ভোজ্যতেলের দাম নয় দফা বাড়ানো হয়েছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত সয়াবিনের দাম বেড়েছে ৬৩ টাকা। সেই হিসাবে প্রতিবছর লিটারে দাম বেড়েছে গড়ে ১২.৬ টাকা। বর্তমান বাজারে বোতলজাত প্রতি লিটার ১৬৮ থেকে। যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এরমধ্যে যুদ্ধের অজুহাতে লাগাতার দাম বাড়িয়ে চলাতে লাগামহীন সয়াবিনসহ ভোজ্য তেলের বাজারে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ক্রেতা সাধারণ।
সূত্রমতে, সর্বশেষ গত ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে এক লিটার সয়াবিনের দাম ৮ টাকা বাড়িয়ে ১৬৮ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। এছাড়া খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৭ টাকা বাড়িয়ে ১৪৩, বোতলজাত সয়াবিনের পাঁচ লিটারের দাম ৩৫ টাকা বাড়িয়ে ৭৯৫ এবং পাম তেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১৩৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
এর আগে ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৬০ ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৩৬ টাকা নির্ধারিত হয়েছিল। এছাড়া বোতলজাত সয়াবিনের পাঁচ লিটারের দাম ৭৬০ ও পাম তেলের দাম ছিল প্রতি লিটার ১১৮ টাকা।
চট্টগ্রামের বনেদি পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে ভোগ্যপণ্যের বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে পাইকারিতে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৯০০ টাকা। যা সর্বশেষ গত বুধবার বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার ৫০০ টাকায়। অন্যদিকে বর্তমানে পাম বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার টাকায়, যা গত বুধবার বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার ৭০০ টাকায়।
এ ব্যাপারে চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ভোজ্যতেলসহ প্রায় সব ধরনের ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দরবৃদ্ধির কারণে মূলত দেশের বাজারে দাম বাড়ছে। অনেকে অভিযোগ করেন, ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে দাম বৃদ্ধি করে থাকেন। আসলে বিষয়টি সঠিক নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাজার বিশ্লেষক প্রশ্ন রেখে বলেন, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ভোজ্য তেলের দাম বাড়বে কেন? ওখান থেকে তো কোনো ভোজ্যতেল আসে না। তিনি বলেন, আন্তার্জাতিক বাজারে বুকিং রেট বাড়ার ফলে তেলের দাম বৃদ্ধির যে কারণ দেখানো হচ্ছে তা অজুহাত মাত্র।
প্রথমত ভোজ্যতেল আসে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে। দ্বিতীয়ত এখন বুকিং দিলে ওই তেল বাজারে আসতে কমপক্ষে তিন মাস সময় লাগবে। অর্থাৎ আগামী জুলাই আগস্ট নাগাদ এ তেল বাজারে আসবে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান বাজারে যে ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে তা গত বছরের সেপ্টেম্বর-নভেম্বর কোয়ার্টারে বুকিং করা পণ্য। তাহলে আগের বুকিং করা এ পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে কোন যুক্তিতে। তিনি এ দাম বাড়ানোকে কারসাজি উল্লেখ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানান।
জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশেন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, দেশে ভোগ্যপণ্যের বাজার পুরোটাই ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ব্যবসায়ীরা কখনো ভোজ্যতেল, কখনো পেঁয়াজ, কখনো চাল-ডাল, আবার কখনো চিনি নিয়ে চিনিমিনি খেলে। আন্তর্জাতিক বাজারে ২ ডলার দাম বাড়লেও তারা দ্বিগুণ দাম বাড়িয়ে দেন। তারা নিত্যনতুন অজুহাতে দাম বাড়িয়ে থাকেন। এখন যেমন রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের অজুহাতে প্রায় সব ধরণের ভোগ্যপণ্যের বাজার বৃদ্ধি করছেন। আমরা বারবার প্রশাসনকে বাজার মনিটরিংয়ের কথা বলে আসছি। দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র রমজান এলেই বাজার মনিটরিং জোরদার হয়। অন্যসময়ে সেঅনুযানি বাজার মনিটরিং হয় না। এতে অসাধু ব্যবসায়িরা তাদের ইচ্ছামত বাজার নিয়ে নোংরা খেলায় মেতে উঠে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশেন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্যমতে, দেশের বাজারে ২০২০ সালে খোলা সয়াবিনের লিটার ছিলো ১০১ টাকা, ২০১৯ সালে ৮৮.৪০ টাকা ২০১৮ সালে ৯৯.৫০ টাকা, ২০১৭ সালে ৯২.৫৮ টাকা এবং ২০১৬ সালে ৯০ টাকা। অন্যদিক প্যাকেটজাত সয়াবিনের লিটার ২০২০ সালে ১১৩.৭৫ টাকা, ২০১৯ সালে ১০৪.৩০ টাকা, ২০১৮ সালে ১০৮.৭৫ টাকা, ২০১৭ সালে ১০৫.৯৬ টাকা এবং ২০১৬ সালে ৯৭.৬৩ টাকা।









