স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে সয়াবিন তেলের বাজার। বাজারের প্রতিটি দোকানেই মিলছে নতুন বোতলজাত সয়াবিন তেল। পুরনো তেল কিনতে হন্যে হয়ে ঘুরছেন ক্রেতারা। প্রতিটি বাজারের দোকানে দোকানে ঘুরছেন তারা। তবে কোথাও মিলছে না পুরনো বোতলজাত তেল। সবার একটাই প্রশ্ন গুদামজাত করে রাখা এত তেল কোথায় গেল?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারওয়ান বাজারের এক দোকান পরিচালক দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, এতদিন গুদামজাত করে রাখা তেল তো সরকার অভিযান চালিয়ে জব্দ করেছে। যে কারণে বাজারে পুরনো তেলের সন্ধান মিলছে না। কারওয়ান বাজারের প্রতিটি দোকান ঘুরে দেখলেও এক লিটার পুরনো সয়াবিন তেল খুঁজে পাবেন না। তার কথার সত্যতাও মিলেছে আবদুল্লা নামেন এক ক্রেতার দেয়া তথ্যে। তিনি বলেন, সাইকেল নিয়ে বাজারে বাজারে ঘুরেছি কিন্তু কোথাও পুরনো বোতলজাত তেল পাইনি। এখন বেশি দামে (নতুন দাম) নতুন তেল কিনতে হয়েছে। কত টাকায় কিনলেন এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল্লাহ বলেন, ৫ লিটারের দাম নিয়েছে ৯৮০ টাকা।
কারওয়ান বাজারের আলী ট্রেডার্সে গিয়ে দেখা যায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে সারি সারি সয়াবিন তেল। প্রতিটি বোতলের গায়ে নতুন মূল্য দেয়া রয়েছে। পুষ্টি সয়াবিনের একলিটার তেলের বোতলে মূল্য দেয়া রয়েছে ১৯৮ টাকা। তবে বিক্রি করা হচ্ছে ২০০ টাকা করে। এ বিষয়ে দোকান কর্মচারীর অজুহাত দুই টাকা খুচরো না থাকায় ২০০ টাকা করে বিক্রি করছেন তারা। কেউ যদি খুচরো দিতে পারে তাহলে ১৯৮ টাকা রাখা হয়। একই ৫০০ গ্রাম বোতলজাত তেল বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকায়। ৫ লিটারের ভোতলজাত সয়াবিন তেলের গায়ে মূল্য রয়েছে ৯৮৫ টাকা। তবে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫ টাকা কমিয়ে ৯৮০ টাকায় বিক্রি করছে বেশিরভাগ দোকানি।
বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের পরিচালক রাসেল ক্ষোভ প্রকাশ করে দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, আগে কম টাকায় বেশি তেল কিনতে পারতাম। ক্রেতাও ছিলো বেশি। এখন অধিক টাকা খরচ করে কম তেল কিনতে হচ্ছে। আগের মতো ক্রেতাও নেই। এখন বেশি পুঁজি খাটিয়ে কম লাভ করতে হচ্ছে। তবে এতদিন তেলের সঙ্কট থাকলেও এখন আর নেই। কোম্পানিগুলো থেকে এখন তেল পাওয়া যাচ্ছে। দাম বেশি হওয়ার কারণে ক্রেতার সংখ্যা অনেকটা কমে গেছে বলে জানান তিনি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে। আগে টন প্রতি ৭৫০ ডলার করে খরচ পড়লেও এখন ১৯০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ঈদের আগে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। মানুষের ব্যয়ের কথা চিন্তা করে তখন দাম বাড়ানোর প্রস্তাব সরকার অনুমোদন করেনি। যদিও আগেই বেশি দামে বিশ্ব বাজার থেকে তেল সংগ্রহ করতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। ঈদের পরে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে এক সঙ্গে এত টাকা বৃদ্ধিতে ভোক্তাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে জানিয়ে ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এর দায় সম্পূর্ণভাবে সরকারকে নিতে হবে।
ভোজ্যতেল সংকটের বিষয়ে এস আলম গ্রুপের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের সরবরাহ ঠিক আছে। সাধারণত প্রতিদিন ৩-৪ হাজার টন সরবরাহ থাকে। রমজানে এটি বেড়ে ৪-৫ হাজার টন হয়। আমরা নিয়মিত সরবরাহ করেছি। সরকারের কাছে সরবরাহের তথ্য আছে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও আমরা রমজানে দাম স্বাভাবিক রেখেছি। কিন্তু শেষের দিকে কী হয়ে গেল আমরা কেউ জানি না। তবে সবাই যখন বুঝতে পারছিল কয়েকদিন পরে দাম বাড়বে। তখন কেউ কেউ মজুত করেছে।
টিকে গ্রুপের এক কর্মকর্তা বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের উচিত চাহিদার ২০ শতাংশ তেল আমদানি করা। এছাড়া টিসিবির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাদের চাহিদার অনুযায়ী তেল আমদানি করা দরকার। এছাড়া এ বিষয়ে সঠিক গাইডলাইন দরকার। কতটুকু মজুত করতে পারবে তা নির্ধারণ করে দিতে হবে।
বাজার স্বাভাবিক হলেও পুরনো তেলের দেখা মিলছে না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে দোকান আছে ৫৪ লাখের মতো। সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি দোকান থেকে তেল উদ্ধার করেছে সরকার। যেসব দোকান থেকে তেল উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলো জব্দ করা হয়েছে। হয়তো এখনো কিছু দোকানে মজুত থাকতে পারে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দাম বাড়ার অপেক্ষায় ছিলো। দাম বাড়ার পর তারা সুযোগ খুঁজতে লুজ করে বেচার জন্য। যদিও খুব একটা তেল মজুত আছে বলে মনে হচ্ছে না।
বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে টিসিবির ভোজ্যতেল আমদানি করা উচিত জানিয়ে জসিম উদ্দিন বলেন, টিসিবি স্বল্পমূল্যে বিক্রির জন্য ২ কোটি লিটার তেল নিয়েছে আমদানিকারকদের কাছ থেকে। সংকটের পেছনে সেটিও কাজ করেছে। সংকট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেই সরকারের। এতে নতুন নতুন সমস্যা হচ্ছে। ১৫ দিন পরপর বাজার সমন্বয় করা উচিত। এছাড়া বন্ডের মাধ্যমে তেল আমদানি করতে হবে। তাহলে সরকারের কাছে তথ্য থাকবে। তিনি বলেন, খোলা বা লুজ তেল বিক্রি বন্ধ করলে দাম ২০ শতাংশ কমানো সম্ভব। ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক হলে সমস্যা সমাধান সম্ভব। এছাড়া সরকারের উচিৎ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে সমস্যা সমাধান করা।
এদিকে আগামী সোমবার থেকে ট্রাকে করে ভোক্তাদের জন্য ১১০ টাকা করে সয়াবিন তেল বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এখান থেকে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ ২ লিটার সয়াবিন তেল কিনতে পারবেন।
রাজশাহীতে তিন দিনের অভিযানে মজুদ করা প্রায় এক লাখ ৬৩ হাজার লিটার ভোজ্যতেল জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে জেলায় এক লাখ ৪০ হাজার এবং নগরীতে ২৩ হাজার লিটার। একের পর এক অভিযান অব্যাহত আছে। এসব অভিযানের পরেও রাজশাহীর খুচরা বাজারে ভোজ্যতেলের দাম কমেনি। বাজারে আগের মতোই আছে ভোজ্যতেলের দাম।
পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর বাজার দেশের উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ব্যবসাকেন্দ্র। এখান থেকে পাশের জেলা ও রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে তেল সরবরাহ করা হয়। গত মঙ্গলবার বিকেলে বানেশ্বর বাজারের চারটি গুদাম ও একটি ট্রাক থেকে ৯২ হাজার ৬১৬ লিটার ভোজ্যতেল জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ২৪ হাজার ৬৮৪ লিটার সয়াবিন ও ৬৭ হাজার ৯৩২ লিটার পাম তেল রয়েছে। এই দিনে গোদাগাড়ী বিদিরপুর থেকে ২০ হাজার লিটার এবং আগের দিন বাগমারার তাহেরপুর বাজার থেকে ২৭ হাজার লিটার তেল জব্দ করা হয়। এছাড়াও বুধবার নগরের একটি গুদামে পাওয়া যায় ২৩ হাজার লিটার ভোজ্য তেল।
রাজশাহী জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) ইফতে খায়ের আলম জানান, মজুত রাখতে হলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের একটি লাইসেন্স থাকতে হয়। বানেশ্বর, তাহেরপুর ও গোদাগাড়ীর এই ব্যবসায়ীরা তাৎক্ষণিকভাবে সেই লাইসেন্স দেখাতে পারেননি।
পুলিশ কর্মকর্তা ইফতে খায়ের আলম বলেন, ‘বেশি মুনাফার লোভে রোজার আগে থেকে এসব ব্যবসায়ীরা তেল মজুত করে রেখেছিলেন। বাজারে কৃত্রিম সংকটের জন্য এরাও দায়ী। তারা তেলের ব্যবসার বৈধ কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। তাই সব তেল জব্দ করা হয়েছে। এই তেলগুলো জেলা পুলিশের হেফাজতেই রয়েছে। তবে তেলগুলো টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্য মূল্যে ভোক্তাদের কাছে বিক্রির অনুমতির জন্য পুঠিয়া থানার ওসি (তদন্ত) রাজশাহী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-০৩ এ আবেদন জানিয়েছেন। অনুমতি পেলেই তেলগুলো টিসিবির কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এতো তেল জব্দ হলেও তেলের খুচরা বাজারে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আগের সর্বোচ্চ দামেই বিক্রি হচ্ছে তেল। রাজশাহী মহানগরীর উপকণ্ঠে পবা উপজেলার বায়া বাজার। গতকাল বৃহস্পতিবার বায়া বাজারে ছিল হাটের দিন। ওই বাজারে দোকান নিয়ে বসা আমজাদ নামে এক খুচরা ব্যবসায়ী জানান, খোলা বাজারে সয়াবিন তেল প্রতি লিটার তেল বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকা। বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। পাইকারি বাজারে দাম কমার কোনো লক্ষণই নেই। রাজশাহী মহানগরীর উপশহর এলাকার খোকন স্টোরের মালিক তারিফ জামান। তিনি বলেন, তেলের বাজারে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, আমরা শুনেছি তেলের সঙ্গে বাড়তি পণ্য নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে কিছু প্রমাণও পেয়েছি। তবে মিলাররা বলছে ডিস্ট্রিবিউটাররা এ কাজ করেছে। কে করেছে তা আমাদের অভিযানে প্রমাণিত হয়ে যাবে। আমরা আগামী সপ্তাহ থেকে এর বিরুদ্ধে অভিযানে নামবো। এখন থেকে বাজার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এ সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
আনন্দবাজার/শহক









