প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে বছরে ৭ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটে। সাম্প্রতিক ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, সিডর, আইলা, নার্গিস, মহাসেন, সিত্রাংয়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এসব ক্ষয়ক্ষতি আরো বাড়ছে। নদীভাঙনের কারণে চরাঞ্চলের ৪২ শতাংশ শিশু শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে। গতকাল সোমবার রাজধানী ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জলবায়ু পরিবর্তন, জলবায়ু শরণার্থী ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে মূলপ্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
গণউন্নয়ন কেন্দ্র আয়োজিত অনুষ্ঠানে ড. কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, আইপিসিসির ১৯৯০ সালে ফার্স্ট এসেসমেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব মানুষের স্থানান্তরকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউএনএইচসিআরের তথ্যানুযায়ী ২০১০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত (১২ বছরে) জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে ২ কোটি ৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক্স এন্ড পিস ইকোসিস্টেম থ্রেট রেজিস্ট্রার শীর্ষক ২০১৮ সালের প্রতিবেদনের হিসেবে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে ১০০ কোটি মানুষ বাড়িঘর হারাতে পারে।
ড. কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে বছরে ৭ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, সিডর, আইলা, নার্গিস, মহাসেন, সিত্রাংয়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এসব ক্ষয়ক্ষতি আরো বাড়ছে। ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার-আইডিএমসির তথ্যমতে, ২০১৯ সালে বিশ্বের ৫টি জলবায়ু বিরূপ দেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ বাংলাদেশ। এদেশে বাস্তুচ্যুত লোকের সংখ্যা ৪০ লাখ ৮৬ হাজার। আর বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৮ সালের তথ্যামতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত হতে পারে এক কোটি ৩৩ লাখ মানুষ। ইকোনমিকস ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের দ্যা গ্লোবাল লাইভএবিলিটি ইনডেক্স-জিএলআই এর ২০২২ তথ্যমতে, বিশ্বের ১৭৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৬তম। চরাঞ্চল সম্পর্কে বলেন, নদীভাঙনের কারণে চরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থানান্তর করতে হয়। চরাঞ্চলে বঞ্চিতর শিশুর শিক্ষার হার ৪২ শতাংশ। আর উত্তরাঞ্চলের ২১০টি নদীর মধ্যে মাত্র ১৮টি বেঁচে আছে। তা ছাড়া কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিভিত্তিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। এতে ৭০ শতাংশ মানুষ কর্ম হারাচ্ছে।
পরিকল্পনান্ত্রী বলেন, মানুষ প্রতিনিয়ত অভিযোজন করেই বেঁচে আছে। প্রকৃতি থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই। কেননা এখানেই জন্ম এখানেই মৃত্যু। প্রকৃতিকে নিয়েই বাঁচতে হবে। পরিবেশ-প্রকৃতি নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। আগে হাওরের মানুষ সকালে কোদাল-টুকরি নিয়ে বাঁধ রক্ষা করতে নিজেরা ছুটে যেত। এখন এটি কমে গেছে। কেননা এখন প্রশাসন দায়িত্ব নিয়েছে। নদীর বাঁধ সম্পর্কে এম এ মান্নান বলেন, প্রতিবছর বাঁধ দেয়া হয়। এটি নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার সময় এসেছে। মালিককে নিজের বাঁধ তৈরিতে অর্থায়ন করতে হবে। আমাদের বাধ্য হয়ে আজকের বিপদ আজকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। জলবায়ুতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে দশমিক ৭ শতাংশ অর্থায়ন করার জন্য ৬০ এর দশকে জার্মান চেন্সেলর দাবি করেছিলেন। কাজ শুরু করেছিলেন। মন্ত্রী বলেন, আমার বাড়ি-ভিটার দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে। এখন আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। তা না হলে হবে না। সবার আগে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। দৃঢ় পরিচ্ছন্ন ও নিষ্ঠুর নেতৃত্ব ছাড়া এসব অর্জন সম্ভব নয়।
সূচনা বক্তব্য রাখেন গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী এম আব্দুস সালাম। সিনিয়র সাংবাদিক কেরামত উল্লাহ বিপ্লবের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি, বিশেষ অতিথি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বায়ুমণ্ডলী দূষণ অধ্যায়ন কেন্দ্র-ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। বক্তব্য রাখেন বিএমইটির মহাপরিচালক শহীদুল আলম এনডিসি, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্টের সাবেক পরিচালক ড. মো. রেজাউল হক, সাউথ এশিয়ান জার্নালিস্ট ফোরামের মহাসচিব আসাদুজ্জামান সম্রাট প্রমুখ।
ডা. এনামুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক শরণার্থী তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্বে দুর্যোগপ্রবণ দেশ ও মোকাবিলায় রোল মডেল। গ্রিন হাউজ ইফেক্ট বা ওজন স্তরের ক্ষতিগ্রস্ততা কমিয়ে আনতে চেষ্টা করা হচ্ছে। গ্রিন এনার্জি ৩০ শতাংশ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত হয়েছে কপ২৭ এ। তিনি বলেন, ইলেক্ট্রনিক গাড়ি ব্যবহারে যেতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সোলারে পরিবর্তন করতে হবে। ভারত সাড়ে ৩লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে হবে। বাঁধের ব্যাপারে চিন্তা করতে হবে। চীন হুয়াংহুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বাংলাদেশ কেন পারবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলো ডেল্টার কারণে রক্ষা করা যাবে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদী। লবণাক্ততা সহনীয় ধান, পাট উৎপাদন হচ্ছে। এসব নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। ৫৫০টি মুজিব কিল্লার কাজ চলমান আরো ১০০০টি করা হবে। বঙ্গবন্ধু মুজিব কিল্লা তৈরির রোল মডেল। তিনি কাজ শুরু করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী সেটি আবো বৃদ্ধি করেছেন।
ড. মো. রেজাউল হক বলেন, হাওরের পরিকল্পনা সেই স্থানে বসেই করতে হবে। বর্তমানে ৮০ শতাংশ হাওর ভরাট হয়ে গেছে। আমরা দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ না করার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। তিনি বলেন, প্লাস্টিক বোতলের পানি পুরোটা খাওয়া যায় না। এসব প্লাস্টিক বানাতে হয়। এটি তৈরি করলে কার্বন নিঃসরণ হয়। এক্ষেত্রে গ্লাসে পানি পান ও মাটি বা কাঁচের পাত্রে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা শুরু করি।
শহীদুল আলম বলেন, জলবায়ু সকলের জন্য প্রযোজ্য। বছরে ৬০ হাজার মানুষ কুমিল্লা থেকে বিদেশ যায়। গাইবান্ধা তথা উত্তরবঙ্গ থেকে এক হাজার লোকও হয় না। ৭-৮ টি জেলা থেকে ৯ লাখ ও ৫৪ জেলা থেকে বিদেশে যায় ১০ লাখ মানুষ। উপজেলা পর্যায়ে টিটিসি প্রশিক্ষণার্থীদের বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে তাদেরকে সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তিনি বলেন, অভিবাসনে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। টাকা উদ্ধারে কোন আদালতে জবাবদিহি করতে পারে না। লোকাল মোবাইল কোর্টকে এক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায় কিনা তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। বিদেশ যেতে যেকোন ব্যাংক থেকে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
শহীদুল আলম প্রকৃতিকে রক্ষায় প্রকৃতিকে ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তা ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় মনের দুর্যোগ পাল্টাতে হবে। বিশ্বব্যাপী অভিবাসন করতে হবে। চলতি বছরে পৌনে ১১ লাখ মানুষকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। গত বছর ছিল ৯ লাখ। তিনি বলেন, ১৪ বছরে ৮৫ লাখ মানুষকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এদের খাওয়াতে হলে প্রতিদিন ৩ বেলা খাওয়ানোর দরকার হতো। অথচ এখন তারা অর্থ উপার্জন করছে। ১৭৬টি দেশে কাজ করে।
আনন্দবাজার/শহক









