তাপমাত্রার পারদ নামছে তো নামছেই। ডিসেম্বর শুরু থেকেই উত্তরাঞ্চলে শীতের মাত্রা বাড়তে থাকে। সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করছে মাসের শুরু থেকেই। তবে গত দুদিন ধরে তাপমাত্রা আর খানিকটা কমে গিয়ে উত্তরাঞ্চলের দুই জেলা পঞ্চগড় ও নওগাঁর ওপর দিয়ে বইতে শুরু করেছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। যদিও আবহাওয়াবিদরা বলছেন, তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে দুএকদিনের মধ্যেই শৈত্যপ্রবাহ দূর হতে পারে। সেই সঙ্গে তারা আগামী তিনদিনের মধ্যে বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাসও দিয়েছে।
সূত্রমতে, গতকাল শনিবার সকালে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। নওগাঁর বদলগাছী এবং পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় এ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। একদিনের ব্যবধানে আবার রাজধানীতেও শীতের তীব্রতা বেড়েছে। ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে কমে গিয়ে হয়েছে ১৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়াবিদদের দেয়া তথ্যমতে, দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত নিম্নচাপটি পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে গতকাল শনিবার সকাল ৬টায় একই এলাকায় অবস্থান করছিল। এটি পরবর্তীতে পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। এর বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ বিহার ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে।
গতকাল সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাষে বলা হয়, অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা এবং দেশের অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে। তবে নওগাঁ ও পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু শৈত্যপ্রবাহ প্রশমিত হতে পারে বলে জানানো হয়।
এদিকে, তাপমাত্রা কমে ১০ ডিগ্রিতে নেমে আসায় পঞ্চগড়সহ উত্তর সীমান্তের জনপদে দুর্ভোগ বেড়েছে। স্থানীয়রা জানান, বিকেল ৪টার পর থেকেই হিমেল হাওয়ায় শীত লাগতে শুরু করে। সন্ধ্যার পর থেকে শীতের পারদ নেমে আসে। মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত শীত অনুভূত হয়। গ্রামে শহরের হাটবাজারগুলোতে খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতে দেখা যায়। শীতবস্ত্রের অভাবে নিম্নবিত্তরা ফুটপাত থেকে গরম কাপড় কিনতে ভিড় করছে।
কনকনে শীতের কারণে বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন শ্রেণির খেটে খাওয়া মানুষ। কনকনে শীতের কারণে কাজে যেতে কষ্ট হচ্ছে অনেকের। তবে পেটের তাগিদে কাউকে নদীতে পাথর তুলতে, কাউকে চা-বাগানে আবার কাউকে দিনমজুরের কাজে যেতে দেখা গেছে। কয়েকজন চা-শ্রমিকের ভাষ্য, কনকনে শীতের কারণে বাগানে কাজ করতে গেলে চা পাতা বরফের মতো লাগে। বাগানের পাতা তুলতে গিয়ে হাত-পাতা অবশ হয়ে আসে। তারপরও কাজ করতে হচ্ছে।
মহানন্দা ও ডাহুক নদীর পাথর শ্রমিকরা জানান, সকালে নদীর পানি বরফের মতো ঠান্ডা থাকে। একদিকে কনকনে শীত, আরেকদিকে নদীর পানি বরফের মতো ঠান্ডা। কাজ করতে খুব কষ্ট হয়। তবুও জীবিকার টানে কাজ করতে হচ্ছে। নারী পাথর শ্রমিকরা তাদের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে জানান, কদিন ধরে খুব ঠান্ডা। ভোরে উঠে ঘরের মেঝে, আসবাবপত্র সব বরফের মতো লাগে। তারপরও কাজ শেষ করে পেটের দায়ে পাথরের কাজে যেতে হচ্ছে।
অটোরিকশা চালকরা বলছেন, একদিকে তীব্র শীত, আরেকদিকে ঘন কুয়াশা। গাড়ি চালানো কষ্টকর হয়ে উঠেছে। যাত্রীও মিলছে না। আয় রোজগার কমে গেছে। আগের থেকে তেমন ভাড়া হচ্ছে না। এদিকে দিন-রাতে তাপমাত্রা দুই রকম থাকায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীতজনিত রোগ। জ্বর, সর্দি-কাঁশি, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ ঠান্ডাজনিত রোগ নিয়ে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছেন রোগীরা। উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু।
চিকিৎসকরা বলছেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে রোগীর চাপ বেড়েছে। এমনিতে শীত মৌসুমে আবহাওয়া শুষ্ক থাকায় বাতাসে জীবাণুর পরিমাণ বেড়ে যায়। শীতজনিত রোগ হিসেবে সর্দি-কাঁশি, শ্বাসকষ্ট বেশি হয়ে থাকে। আর শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠরা শীতজনিত রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। তাই এ সময়টাতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে পারলে কিছুটা সুরক্ষা মিলবে।
আনন্দবাজার/শহক









