করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিগত চারটি ঈদ উৎসব ভালোভাবে উদযাপন করতে পারেননি দেশবাসী। মন্দা ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যেও। এবার প্রত্যাশা ছিল সেই সংকট কাটিয়ে উঠবেন। তবে এবার যখন গোটা দেশ উৎসব মুখর, অর্থনীতির চাকাও ঘুরচে জোরে ঠিক তখনই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া শঙ্কা বাড়াছে বাংলাদেশেও।
অবশ্য শুধু ভারতই নয়, গোটা এশিয়া ও ইউরোপের বেশকিছু দেশেও সংক্রমণ বাড়ছে করোনার। এমন পরিস্থিতিতে সতর্কবার্তা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক। সেই বার্তার সূত্র ধরে একদিন পরই সরকারের কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারকে ৬ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। উৎসবে প্রাণ ফেরার আগ মুহূর্তে এমন নির্দেশনা ঈদ-উৎসবের ওপর খানিকটা প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
দেশে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আছে এবং মৃত্যুও শূন্যের কোঠায়- এমনটা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, এটি আমাদের ধরে রাখতে হবে। সংক্রমণ যেন আবার না বাড়ে সে ব্যাপারে সবাইকেই সচেতন থাকতে হবে। ভারতের সংক্রমণ বাড়ার তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ভারতে নতুন করে আবারও সংক্রমণ বাড়ছে। ওই দেশে যারা যাতায়াত করছেন, তাদের দিকে নজর দিতে হবে।
এদিকে. গত ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ভারতের দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল দেড় হাজারের নিচে। নতুন করে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়াচ্ছে প্রতিবেশী ভারত। দীর্ঘদিন পর ভারত সরকার ভ্রমণ ভিসার সুযোগ দেওয়ায় অনেকেই এখন দেশটিতে ভ্রমণ করছেন। আবও অনেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। ভিসা সেন্টারগুলোতে প্রতিদিন লাইন লেগে থাকছে। বিষয়টি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বেশি করে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সতর্কতার পর বিষয়টি আমলে নিয়ে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি রবিবার রাতে জরুরিভিত্তিতে অনলাইনে সভা আহ্বান করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়ার কারণ এবং দেশে সংক্রমণের হার ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণে রাখতে করণীয় বিষয়ে কারিগরি পরামর্শক কমিটির মতামত জানতে চাইলে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সব সদস্যের উপস্থিতিতে বিস্তারিত আলোচনা শেষে ৬ দফা প্রস্তাবনা বা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো-
১. বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ নিম্নমুখী হলেও পার্শ্ববর্তী দেশসহ এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী, যা উদ্বেগজনক। জাতীয় কারিগরি কমিটি আশঙ্কা করে এখন থেকেই সতর্ক না হলে দেশেও সংক্রমণ বাড়তে পারে। তাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সঠিকভাবে মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করাসহ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের সুপারিশ করেছে কারিগরি কমিটি। একইসঙ্গে সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়।
২. যেসব দেশে সংক্রমণের হার বেশি, সেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে আগমনের ক্ষেত্রে টিকা নেওয়া থাকলেও কোভিড নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিশ্চিত করা এবং সব বন্দরে জনগণের প্রবেশ পথে স্ক্রিনিং জোরদারকরণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
৩. আসন্ন ঈদুল ফিতরে বাজার, কেনাকাটা এবং ঘরমুখী মানুষের যাতায়াতের সময় মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া তারাবির নামাজ ও ঈদ জামাতে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৪. কোভিড-১৯ মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোকে সতর্ক করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালগুলোর সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সভা আয়োজন করে এই বিষয়ক প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
৫. কোভিড নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আয়োজন করে সবাইকে করোনা নিয়ন্ত্রণে সতর্কাবস্থানে থাকার সুপারিশ করা হয়।
৬. সভায় জিনোম সিকোয়েন্সিং ও সার্ভেলিয়েন্স জোরদার করার সুপারিশ করা হয়।
পরামর্শক কমিটির সদস্য ডা. কাজী তারিকুল ইসলাম এর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, গত বছরের কোরবানির ঈদেও সংক্রমণ বেড়েছিলো। আমরা দেখেছি দুই ঈদের মাঝখানে অবস্থা খুবই খারাপ হয়। এমন পরিস্থিতিতে সবাইকে মাস্ক ব্যবহারসহ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বলেছেন, আমরা অনেকগুলো ঢেউ দেখেছি। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ঢেউ দেখেছি। চতুর্থ ঢেউ যে আসবে না, তা হলফ করে কেউ বলতে পারে না। আমরাও পারি না। আমাদের সতর্ক অবস্থায় থাকতে হবে।
গেল বছরে জাতিসংঘের বিশেষায়িত একটি সংস্থা করোনা সংক্রান্ত ৪২ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে করোনার সংক্রমণ বাড়ার পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়। যার মধ্যে ছিল প্রথমত, যুক্তরাজ্যে করোনার পরিবর্তিত ধরন বা ইউকে ভেরিয়েন্ট, দ্বিতীয় উষ্ণ আবহাওয়া এবং তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যবিধি অগ্রাহ্য করে অবাধ চলাফেরা। সেই প্রতিবেদনের আলোকে বাংলাদেশেও করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে অবাধ চলাফেরার বিষয়টিতে দৃষ্টি দেয় দেশে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, দেশে করোনায় মৃত্যুহার ধরে রাখতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ মাস্ক পরতে হবে। যতটুকু সম্ভব সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। যারা এখনও করোনার টিকা নেননি তাদের টিকা নিতে হবে। কোভিড নিয়ন্ত্রণ এবং টিকাদানে বিশ্বে বাংলাদেশ রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ১২ কোটি ৮৪ লাখ টিকা দিয়েছি।
গত ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম ৩ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়ে ১৮ মার্চ প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। সে বছর করোনা মহামারি আকার ধারণ করলে ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধ ছিল। দেশে দেয়া হয় কয়েক দফা লকডাউন। ২০২১ সালের ৫ ও ১০ আগস্ট দুদিন সর্বাধিক ২৬৪ জন করে মারা যান। এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৫২ হাজার ৫৮৩ জন। মারা গেছে ২৯ হাজার ১২৭ জন। সুস্থ হয়েছেন ১৮ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫৯ জন।
আনন্দবাজার/শহক









