রমজানে শরীর সুস্থ রাখতে পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খাওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, শাক-সবজি, ফল, ডিম, রুটি, চিড়া আদর্শ খাবার বলে জানিয়েছেন পুষ্টিবিদরা। দুধ খাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন তারা। এসব খাবার খেলে শরীরে শক্তি বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি প্রোটিন ও ভিটামিনের অভাবও পূরণ হয়। ইউক্রেণ-রাশিয়ার যুদ্ধসহ নানা করণ দেখিয়ে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি হলে সরকারি প্রচেষ্টায় সয়াবিন ও পেঁয়াজের দাম কমেছে। তবে অধিকাংশ নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষগুলো টিসিবি পণ্যের আওয়ায় এলেও মধ্যবিত্ত মানুষ রমজান নিয়ে রয়েছে বিপাকে।
গত শুক্রবার টাঙ্গাইল শহরের প্রধান পাইকারি বাজার পার্কবাজার ঘুরে ও জেলা-উপজেলার অন্যান্য বাজারের নিত্যপণ্যের দর ও সাধারণ ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া জানা গেছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রমজানের আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের দাম কমেছে। কিছু স্থিতিশীল রয়েছে। তবে রমজানের আগেই বড় ধরণের ধাক্কা লেগেছে পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবারের ওপর। যা রমজানে সাধারণ মানুষদের ওপর বিরুপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন পুষ্টিবিদরা।
সারাদিনের রোজার পর ইফতারে অভাজাপোড়া ও ভারি খাবার খেলে অনেক ধরনের শারীরিক সমস্যার সঙ্গে ওজন ও বাড়তে পারে। তাই শরীর সুস্থ ও দেহের ওজন না বাড়িয়ে পুরো রমজান মাস ভালো থাকার জন্য একটা ব্যালেন্স ডায়েট বা সুষম খাবারের দরকার বলছেন চিকিৎসকরা। শরীরকে হাইড্রেট রাখতে প্রচুর পানি, সরবত, মৌসুমি ফল ও সবজির জুস বা এ ধরনের তরল, ঠান্ডা ও আঁশ জাতীয় খাবার রাখার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক। শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং শরিরের শক্তি জোগায় এমন খাবার খাওয়ার পরামর্শ তাদের।
সরবতের প্রধান উপাদান চিনি ও লেবু। রমজানের আগে চিনির দাম কমেনি। এখনও চিনি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। লেবুর দামও বেড়েছে। লেবু প্রতি কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি। অন্যান্য বছরের রমজানে লেবুর দাম থাকে ৫০ থেকে ৬০টাক কেজি।
ভারি খাবারের তালিকায় থাকে ভাত, মাছ মাংস। রোজাকে সামনে রেখে বেড়েছে মাংসের দাম। গরুর মাংস প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ টাকা কেজি। খাঁসির মাংস প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৯৫০টাকায়। ব্রয়লার মুরগির মাংস বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৬০ টাকা কেজি। সোনালী মুরগি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩৩০ টাকা দরে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি লাল মাংসে বেড়েছে প্রায় ৫০ টাকা, অন্যান্য মাংসে বেড়েছে কেজি প্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা। পাঙ্গাস থেকে শুরু করে সব ধরণের মাছের বাজার অনেকটা চড়া। পাঙ্গাস মাছে কেজি প্রতি বেড়েছে ২০টাকা। ১৪০ টাকার বাটা মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি। দেশীয় মাছ বিক্রি হচ্ছে প্রায় দ্বিগুন দামে। মাংস ব্যবসায়ী মো. আছলাম মিয়া জানান, গরু ও খাসির দাম বেড়ে যাওয়ায় এসব মাংসের দামও বেড়েছে।
দুধ অন্যতম পুষ্টিকর খাবার। রমজানে দুধ ও দুগ্ধজাতীয় খাবার থাকে রোজাদারদের খাবার মেনুতে। শুক্রবার বাজারে দেখা গেছে, দুধের দাম কেজিতে বেড়েছে ২০-২৫ টাকা। ৫০/৫৫ টাকা কেজি দরের দুধ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা কেজি দরে। তবে দুধ বিক্রেতারা বলছেন, অতিমাত্রায় দুধ ফ্রিজিং করার কারণে দুধের দাম বেড়েছে। এদিকে দুগ্ধজাতীয় অন্যতম পুষ্টিকর খাবার ঘি। ১১শ টকার ঘি এবার বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ শ টাকা কেজি দরে। টাঙ্গাইলের প্রসিদ্ধ ঘি-বাড়ীর স্বত্ত্বাধিকারী অভিজিৎ ঘোষ বলেন, দুধের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বাজারে ঘি’র দাম বেড়েছে।
নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু সবজির দাম কমলেও বেড়েছে পুষ্টি সমৃদ্ধ সবজির দাম। বাজাওে সাজিনার দাম প্রতি কেজি ১২০ টাকা। মিষ্টি লাউ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকা। কড়লা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ৯০- টাকা। ঢেঁড়স এখনও ৭০ টাকা কেজি, শসা বিত্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি যা দুদিন আগেও ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি।
রোজার সময় শাক-সবজি কম খাওয়া হয়, এ কারণে ইফতারে ফল খাওয়াটা জরুরী। সব ধরনের ফলই পুষ্টিমান সমৃদ্ধ। ফলে আছে শর্করা, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, লৌহ, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-এ বা ক্যারোটিন। ফলের মধ্যে পটাশিয়াম ও পানি থাকার কারণে দেহ শীতল হয় ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। রমজানের আগেই প্রত্যেক শ্রেণির ফলের দাম বেড়েছে। ১৫০ টাকার আপেলে বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি। ১৮০ টাকার আঙ্গুর বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৫০ টাকা কেজি। ১৪০ টাকার মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়, ১৩০ টাকার কমলা বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা কেজি। তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা কেজি। গত রমজানের তুলনায় সব ধরণের খেজুরের দাম বেড়েছে। কলা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা হালি, বাঙ্গি ও ডাবের পানি দাম আকাশ ছোঁয়া, পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি। সব ধরণের পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা বিপাকে পড়েছেন।
তবে দামে স্বস্তির মধ্যে রয়েছে আদা, রসুন,টমেটো ও পেঁয়াজ। রসুনের কেজি ৫০টাকা, পেয়াজ ৩০ টাকা , টমেটো প্রতি কেজি ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজি ব্যবসায়ী ছানোয়ার মোল্লা বলেন, অধিকাংশ সবজির দাম কমেছে। তবে যেসব সবজির দাম এখনও চড়া সেগুলোর উৎপাদন কম হয়েছে। সেগুলো বেশি দামে কেনায় বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্যের মতো পুষ্টি সমৃদ্ধ পন্যের দামও ক্রেতাদের আয়ত্বে রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি বাজার করতে আসা ক্রেতাদের।
কৃষিবিদ শাকিল আহম্মেদ শুভ জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে কৃষি উৎপাদনের ব্যাঘাত ঘটছে। অতি খরায় সবজির চরম ক্ষতি হচ্ছে। কিছু সবজি গাছ মারাও যাচ্ছে। কিছু সবজির উৎপাদন কম হচ্ছে। উৎপাদন কমে গেলে বৃষ্টির পর সবজির বাজার আরও চড়া হবে। তবে এই মুহুর্তে বৃষ্টি হলে সব ধরণের সবজির দাম ক্রেতাদের আওতায় চলে আসবে।
টাঙ্গাইল সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সুজাউদ্দিন তালুকদার বলেন, রমজানে প্রচুর পরিমানে পানি খাওয়া উচিৎ। সেই সাথে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া প্রয়োজন। এছাড়া টাটকা শাক-সবজী যার মধ্যে থাকে প্রচুর পরিমাণ আঁশ, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ। তাজা ফল ও ফলের রসসহ আমিষের জন্য মাছ, মাংস, ডিম, কম চর্বি যুক্ত দুধ ও দুগ্ধ জাতীয় খাদ্য। শষ্যদানার মধ্যে লাল আটার রুটি, লাল চালের ভাত এবং আলু খাওয়ারও পরামর্শ দেন।









