রেলক্রসিংয়ে সৃষ্ট যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে মহাপরিচালকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে ‘জনউদ্যোগ’ নামে এক সংগঠন।
প্রায় আড়াইশো বছরের পুরনো শহর ময়মনসিংহ। পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনের মর্যাদা লাভের পর শহর থেকে নগরে পরিণত হয়েছে। সেই সঙ্গে জনসমাগম বেড়েছে কয়েকগুণ। তবে সেই তুলনায় প্রশস্ত হয়নি রাস্তাঘাট। তাই দিন দিন যানজটের শহরে পরিণত হচ্ছে ময়মনসিংহ নগরী। রেলওয়ে জংশন হওয়ার কারণে সিটি করপোরেশন এলাকাতেই রয়েছে ২২টি রেলক্রসিং। প্রতিবার ট্রেন চলাচলের সময় প্রতিটি রেলের লেভেল ক্রসিং ব্যারিয়ারে আটকা পড়তে হয় সড়ক ব্যবহারকারীদের। ফলে এসব লেভেল ক্রসিং এর যানজটের কারণে প্রতিদিন মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।
ময়মনসিংহ নগরীর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে হলে কোনো না কোনোভাবেই রেল ক্রসিং অতিক্রম করে যেতে হয়। নগরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত রেল স্টেশন হতে তিন দিকে তিনটি লাইন চালু থাকায় অধিকাংশ সড়ক জুড়েই রেল ক্রসিং রয়েছে। এই লেভেল ক্রসিংগুলোই বর্তমানে নগরবাসীর ভোগান্তির আরেক নাম। এরমধ্যে অবৈধ অটো রিকশা চলাচলের সঙ্গে শহরজুড়ে যানজটের একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রেলের লেভেল ক্রসিং। কারণ সারাদিন মিলিয়ে এই রেলক্রসিংগুলো দিয়ে ৫৮টি ট্রেন আপ-ডাউন করায় প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে যানজটের।
প্রতিবার ট্রেন চলাচলের সময় প্রতিটি রেলক্রসিংয়ে ৫ থেকে ১০মিনিট আটকা পড়তে হয় সড়ক ব্যবহারকারীদের। এতে করে এসব লেভেল ক্রসিং এ যানজটের কারণে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ৭ কর্মঘণ্টা। সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে ২২টি লেভেল ক্রসিং থাকায় ট্রেন চলাচলের সময় যানজটে আটকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এ রেলপথ দিয়ে ময়মনসিংহ হতে ঢাকা, জামালপুর, ভৈরব ও মোহনগঞ্জ রুটের বিভিন্ন গন্তব্যে ২৪ ঘণ্টায় ৭ জোড়া আন্তঃনগরসহ ২৯ জোড়া যাত্রীবাহি ট্রেন চলাচল করে।
ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা যায়, শহরের সিকে ঘোষ রোড, পাটগুদাম, কৃষ্টপুর, কেওয়াটখালী, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সাহেব আলী রোড, আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টার, সানকিপাড়া, কলেজ রোডসহ সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্নস্থানে রয়েছে অনুমোদিত ও অনঅনুমোদিত ২২টি রেলক্রসিং। বিভিন্ন রুটে ৫৮ বার ট্রেনের যাওয়া আসার সময় থামাতে হয় যানবাহন।
তামিম হাসান নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, যত দিন যাচ্ছে আমাদের শহরে যানজট ততই বাড়ছে। বছর তিনেক আগেও পায়ে চালিত রিকশায় করে নগরীর চরপাড়া থেকে গাঙ্গিনারপাড় যেতে সময় লাগতো ১০ থেকে ১৫ মিনিট। আর এখন এই জায়গাটুকু ব্যাটারি চালিত রিকসায় যেতে সময় লেগে যায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট।
সংবাদকর্মী নিয়ামুল কবীর সজল জানায়, এই শহরে ব্যাটারি চালিত রিকশা ও অটো রিকশা অনেক বেশি। চালকদের নেই কোনো প্রকার প্রশিক্ষণ। কার আগে কে যাবে এমন মানসিকতার করণেই যানজটের সৃষ্টি হয়। আর মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের যত্রতত্র গাড়ি পাকিং ও উল্টো পথে চলাচল করাও যানযটের কারণ।
ব্যাংক কর্মকর্তা শওকত হোসেন বলেন, এমন কোনো মোড় নাই, যেখানে জ্যাম নাই। আর রেলের লেভেল ক্রসিং ব্যারিয়ার ফেলে দিলে আরো ১০ থেকে ১৫ মিনিট বেশি লাগে। প্রতিদিন অসহনীয় যানজটের শিকার হওয়া হাবিবুর রহমান মিলন নামের এক অভিভাবক বলেন, ট্রেন আসার প্রায় ১০/১৫ মিনিট আগেই রেলগেটের ব্যারিয়ার ফেলে রাখা হয়। এটা আমাদের জন্য খুবই কষ্টদায়ক। রোদবৃষ্টির মধ্যেই আমাদের অপেক্ষা করতে হয়। বাচ্চাদের স্কুলে যেতেও দেরি হয়ে যায়।
নগরীতে সরু সড়ক ও লেভেল ক্রসিংয়ের বিষয়টিই যানজটের অন্যতম বড় কারণ বলছেন জেলা পুলিশ সুপার আহমার উজ্জামান। তিনি বলেন, 'বিভাগীয় শহর হিসেবে সড়কগুলো যতটা প্রশস্ত থাকা দরকার, তা নেই। সরু সড়ক যানজটের অন্যতম কারণ। তারমধ্যে আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে শহরের ভেতর থাকা রেলক্রসিং। ২২টি জায়গায় প্রতিদিন ৫৮ বার ট্রেনের জন্য গাড়ি থামানোর কারণে যে জ্যামের সৃষ্টি হয় তা পুরো শহরেই ছড়িয়ে পড়ে।
যানজট নিরসনে রেলপথকে শহরের বাইরে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের মেয়র ইকরামুল হক টিটু। তিনি বলেন, এই রেলপথ সরানোর শুধু রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে সম্ভব না। এখানে একাধিক মন্ত্রণালয় জড়িত আছে। আমরা সেসব মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো, যাতে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে পরিকল্পনা করে রেললাইন শহরের বাইরে সরানো যায়। যদিও এটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তবুও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এ ব্যাপারে সচেষ্ট থাকবে।
এদিকে ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন সুপারিনটেডেন্ট জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রেলপথ সরানোর কোনো পরিকল্পনা বা সুযোগ কোনোটাই আপাতত নেই। বরং আরও এটিকে সম্প্রসারণ করা হবে। রেললাইন রেখেই যানজট নিরসনে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি আমার।
তবে সব বিভাগের সমন্বয়ে দ্রুত শহরকে যানজটমুক্ত করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর দাবি নগরবাসীর। রেলক্রসিংয়ে সৃষ্ট যানজটের কারণে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং বংলাদেশ রেলওয়ে মহাপরিচালক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছেন ‘জনউদ্যোগ’ নামে একটি সংগঠন।









