- বিঘা প্রতি লোকসান ৩-৪ হাজার টাকা
- দেনার কবলে কৃষক
গত বছর অধিক আলু উৎপাদন ও দাম ভালো পাওয়ায় এবছরও লাভের আশায় আগাম আলু চাষে ঝুঁকেন উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার আলুচাষিরা। কিন্তু এবার আগাম আলুর দাম কম থাকায় লোকসানের কবলে পড়েছেন তারা। গত বছর আলুচাষিরা প্রতিকেজি আলু মাঠেই বিক্রি করেছিলেন ২৫ থেকে ২৮ টাকা দরে। এবার তা এক ধাক্কায় নেমে এসেছে ১০ থেকে ১২ টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচের সঙ্গে আলুর দামের ফারাক বিস্তর। প্রতিবিঘা জমিতে চাষিদের লোকসান গুনতে হচ্ছে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। এতে ধারদেনা করে চাষাবাদ করা চাষিরা পড়েছেন বড় দেনার কবলে। আগামী দিনগুলো তাদের কিভাবে অতিবাহিত হবে তা নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মধুপুর গ্রামের কৃষক রবীন রায় বলেন, গতবার যে পরিমাণ আলু উৎপাদন হয়েছে এবারও তেমনই আলু উৎপাদন হয়েছে। বৃষ্টির কারণে সামান্য ক্ষতি হয়েছে তবে তা মানিয়ে নেওয়ার মতোই। কিন্তু গতবার আলুর দাম পেলেও এবার আলুর দাম আমাদের কপালে হাত ঠেকিয়েছে। সামনের দিনগুলো আরও ভয়াবহ হতে পারে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বেগুনবাড়ি ইউনিয়নের ভোপলা গ্রামের কৃষক মিঠুন বাবু বলেন, এবারের আলুর যা দাম তা হিসাব করলে দেখাযায় প্রতিবিঘা জমিতে আমাদের উৎপাদন খরচ বেশি হয়েছে। বিঘায় আমাদের আলু উৎপাদন করতে খরচ হয় ২১ থেকে ২২ হাজার টাকা। কিন্তু আমরা আলুর দাম পাচ্ছি গড়ে ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা। এখন পর্যন্ত আমরা আলু চাষে লোকসানের মধ্যে আছি।
কৃষক হাবিবর রহমান বলেন, সারের দাম, শ্রমিকের মজুরি, সেচ সব মিলিয়ে যা খরচ তার চেয়ে আলুর অনেক কম দাম পাচ্ছি আমরা। এবার আলুর উৎপাদন খরচ আর দামের ফারাক মেটাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে আমাদের।
সবজি ক্রেতা জাহাঙ্গীর হাসান পাপন বলেন, বর্তমানে আলুর দাম বাজারে ১৫ থেকে ১৬ টাকা। শীতকালীন সবজির লাগামহীন দাম ছিলো কিছুদনি আগে। তখন আলুর চাহিদা মানুষের বেশি ছিলো। ফলে আলুর দামও ছিলো। এখন শীতকালীন সবজির দাম মানুষের অনেকটা নাগালের মধ্যে এসেছে তাই আলুর প্রতি মানুষের চাহিদাও কিছুটা কমেছে।
শাহী হিমাগারের আলু ব্যবসায়ী আব্দুর রফিক বলেন, গত বছর জেলায় অধিক আলু উৎপাদন হয়েছিল। যার কারণে আমরা ডিসেম্বর পর্যন্ত হিমাগেরর আলুটা বাজারে পেয়েছি। ফলে নতুন আলুর চাহিদার ওপর প্রভাব পড়েছে। নতুন আলু বেশিদিন সংরক্ষণ করে রাখা যায় না। যার কারণে আলুর চাহিদা কম, দামও কম।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ি গ্রামের কৃষক আমিন মিয়া বলেন, এ বছর দুই বিঘা জমিতে আগাম আলু লাগিয়েছি। বীজ, সার, শ্রমিকের খরচ, সেচ বাবদ প্রতি বিঘা জমিতে ১৫-১৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আর এক বিঘা জমির আলু বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে ১৪-১৬ থেকে হাজার টাকা। ফলে গুনতে হচ্ছে লোকসান।
মহেন্দ্রনগর গ্রামের কৃষক বেলাল মিয়া বলেন, উচ্চ মূল্যে বীজ কিনে আলু চাষ করেছি। এখন বিক্রির সময় ভালো দাম পাচ্ছি না। দুই মাস আগে প্রতি কেজি আলু ৫৫-৬০ টাকা বিক্রি হচ্ছিল। আর এখন জমি থেকে ৭ টাকা থেকে সাড়ে ৯ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
শিয়াল খোওয়া গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, আমি এ বছর দুই একর জমিতে আলুর আবাদ করেছি। ফলনও মোটামুটি ভালো হয়েছে। কিন্তু আলুর বাজার দর ভালো না পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। সরকার যদি আলুচাষিদের দিকে না তাকায় তাহলে আমরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলব।
আদিতমারি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলিনুর রহমান বলেন, কৃষকরা এখন আগাম জাতের আলু তুলছে। এবার আগাম আলুর ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। তবে দাম কম পাচ্ছেন কৃষক। খুচরা বাজারে আলুর যে দাম পাইকারি বাজারে তার থেকেও অনেক কম। কৃষি অধিদফতর মনে করছে, এই আগাম আলু যদি আরও ১০-১৫ দিন আগে তোলা হতো তাহলে কৃষকরা দাম মোটামুটি ভালো পেতেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্র জানায়, উত্তরের ১৬ জেলায় এ বছর আগাম জাতের আলু চাষাবাদ হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩১২ হেক্টর জমিতে । যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৬ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টন। আর গড়ে প্রতি কেজিতে উৎপাদন খরচ সাড়ে সাত টাকা। এ পর্যন্ত মোট আবাদের ৪০ শতাংশ জমির আলু তোলা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদ হায়দার জানান, এখন পর্যন্ত আগাম আলুর মাত্র ৫৫ শতাংশের মতো উৎপাদন করা হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে কাঙ্ক্ষিত লাভ হচ্ছে না। তবে সামনের দিকে দাম কিছুটা বাড়লে চাষিদের লোকসানে পড়তে হবে না।
আনন্দবাজার/এম.আর









