- জমি লিজ নিয়ে তুলা চাষে আগ্রহী উদ্যোক্তারা
- ২০১৮ সালে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী
- সরকারি সহায়তা পাবেন ব্যবসায়ীরা
আগামীতে পোশাকখাতের পরিধি ও বাজার আরো বড় হবে। কয়েক দশকে পোশাক পণ্যের চাহিদা বিশ্ববাজারে আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেজন্যই এখাতে কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করতে হলে তুলার সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখা ও একক দেশনির্ভরতা কমিয়ে আনতে বিকল্প উৎসদেশ খুঁজে বের করা জরুরি এখন জরুরি।
দেশের প্রধান রফতানিমুখী শিল্প পোশাকখাতের প্রধান কাঁচামাল সুতার চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে। গত এক দশকের ব্যবধানে চাহিদা বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। তবে চাহিদার লাগাম আটকাতে পারছে না সুতার প্রধান উৎসা দেশীয় তুলার উৎপাদন। দিন দিন যে হারে চাহিদা বাড়ছে সে হারে তুলা চাষের জমি কিংবা উৎপাদন বাড়ছে না। এতে পোশাকখাতের কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রে হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। আমদানিনির্ভরতা থেকে কোনোভাবেই বেরুতে পারছেন না পোশাক খাত। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় পুরোটাই মেটানো হচ্ছে আমদানি করা তুলা দিয়ে। জ্যামিতিকহারে তুলার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গেল এক দশকে দেশে আমদানিও বেড়েছে কয়েকগুণ। আর এই আমদানি করা তুলার বেশিরভাগই আসছে পাশের দেশ ভারত থেকে। তবে এক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ।
দেশে যে পরিমাণ কৃষিজমি রয়েছে সেগুলোতে মূলত খাদ্যপণ্য চাষ করা হয়। পাট ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো অর্থকরী ফসল তেমন চাষ হয় না। অন্যদিকে পোশাকশিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা উৎপাদন করতে প্রয়োজন হয় লম্বা সময়ের। এজন্য ছয় মাসের মতো সময় নিতে হয়। অথচ এই সময়ের মধ্যে চাষীরা দুটো শস্য ঘরে তুলতে পারে। এজন্য অন্যান্য কৃষিপণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না তুলা চাষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদনের খরচ কমিয়ে চাষীদের কাছ থেকে বেশি দামে তুলা কিনতে পারলে সুফল আসতে পারে। অন্যদিকে, বিপুল পরিমাণ তুলা আমদানির চেয়েও বড় সংকট এর বাজার। মাঝে মধ্যেই ভারত রফতানি বন্ধ করে দেয় কিংবা উচ্চ শুল্করোপ করে। এতে বড় বিপদে পড়তে হয় দেশের সুতা-কাপড় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানসহ পোশাকখাতের উদ্যোক্তাদের।
এসব বিবেচনা করেই কয়েক বছর ধরে তুলা উৎপাদনে বিকল্প উৎস নিয়ে ভাবতে শুরু করে সরকার। এরই অংশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় সম্ভাবনার দেখা মিলছে। সেখানে জমি লিজ নিয়ে তুলা আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগামীতে পোশাকখাতের পরিধি ও বাজার আরো বড় হবে। কয়েক দশকে পোশাক পণ্যের চাহিদা বিশ্ববাজারে আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেজন্যই এখাতে কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করতে হলে তুলার সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখা ও একক দেশনির্ভরতা কমিয়ে আনতে বিকল্প উৎসদেশ খুঁজে বের করা জরুরি এখন জরুরি।
এক্ষেত্রে আফ্রিকার মতো অঞ্চলে জমি লিজ নিয়ে তুলা উৎপাদনের পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দিতে চায় সরকার। কয়েক বছর আগে থেকেই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কৃষি খাতে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। বস্ত্রখাতের কাঁচামাল তুলা উৎপাদনে এ সুযোগকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখার বিষয়টি এখন সামনে এসেছে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর রফতানি আয় ধরে রাখাসহ অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা করছে। তার অংশ হিসেবেই আফ্রিকার দেশগুলোতে তুলা চাষের বিষয়টি সম্ভাবনার নুতন দিগন্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ৬০ লাখ বেল করে তুলা আমদানি করছেন ব্যবসায়ীরা। প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ বেল করে চাহিদা বাড়ছে।
বস্ত্রখাতের প্রধান কাঁচামাল তুলার উৎপাদন বাড়াতে উচ্চফলনশীল ও প্রতিকূলতা সহনশীল জাতের উন্নয়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে আঁশের গুণগত মানের উন্নতি সাধন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খায় এমন জাত উদ্ভাবন করতে হবে। এজন্য লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর, তুলার জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, উচ্চফলনশীল, খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ও মানসম্পন্ন আঁশ উৎপাদনকারী জাতের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জলবায়ু পরিবর্তনশীল এলাকায় তুলা চাষ সম্প্রসারণের জন্য জলবায়ু অভিযোজনশীল তুলার জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এখন সময়ের দাবি।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: আমাদের প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশ ভারত তাদের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের রফতানি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে তিনবছরের মধ্যে দেশজুড়ে সাতটি বৃহৎ টেক্সটাইল পার্ক বা বস্ত্রপল্লি করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। একেকটি বস্ত্রপল্লি এক হাজার একরের বেশি জমির ওপর স্থাপিত হবে। যেখানে থাকবে বিশ্বমানের অবকাঠামো। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তুলা রফতানি কমিয়ে দিতে পারে ভারত। সেক্ষেত্রে বিকল্প পথ খুঁজতে হবে বাংলাদেশকে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে পোশাকখাতে এখনও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই আধুনিক কোনো পরিকল্পনা নেয়া হয়নি। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে ৫০০ একর জমিতে যে পোশাকপল্লি গড়ে তোলা হচ্ছে সেখানে প্রাথমিকভাবে যাচ্ছে মাত্র ৩৭টি প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে বস্ত্র খাতের মাত্র ৫ থেকে ৭টি কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ হচ্ছে। আগামীতে বস্ত্র খাতের ব্যবসা সম্প্রসারণে আরো বেশি পরিকল্পনা নিতে হবে।
আনন্দবাজার/শহক









