রুটির ঝুড়িতে হামলা--
- গম-ভুট্টা-সূর্যমুখীর উৎস ইউক্রেন-রাশিয়া
- তেল-গ্যাসের সরবরাহ থমকে যাবে
বিশ্বে খাদ্যশস্যের অন্যতম চার রপ্তানিকারক দেশ ইউক্রেন, রাশিয়া, কাজাখস্তান ও রোমানিয়া। আর বিশ্বের ৬০ ভাগ সূর্যমুখী তেল রপ্তানি হয় ইউক্রেন থেকে। শুধু তেল নয় খাদ্যশস্য রপ্তানিতে বিশ্বের চতুর্থর্থ থাকা দেশটির ওপর গম, ভুট্টাসহ খাদ্যসামগ্রীর জন্য নির্ভরশীল বিভিন্ন দেশ। বিশ্বের ৩০ শতাংশ গম ২০ শতাংশ ভুট্টা রপ্তানি হয় রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। গম, ভুট্টা দিয়ে শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে প্রাণিজখাদ্য উৎপাদন হয়। সূর্যমুখী তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশই করে এ দুই দেশ।
বৃহস্পতিবার থেকে ইউক্রেনে হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। এমনকি শুক্রবারে দেশটির রাজধানী কিয়েভে ঢুকে পড়েছে তারা। এই হামলার ফলে বিশ্বে খাদ্যসরবরাহ ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাশিয়ার সেনারা কিয়েভে প্রবেশ করেছে বলে নিশ্চিত করেছে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এক টুইটে বিষয়টি জানানো হয়।
যুদ্ধের কারণে খাদ্য ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। জ্বালানি তেলের ব্যারেল বৃহস্পতিবারই ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। ঊর্ধ্বমুখী খাদ্যপণ্যের দামও। বিভিন্ন দেশে শেয়ারবাজারে ভয়াবহ দর পতন শুরু হয়েছে।
খাদ্যশস্য ও গম রপ্তানিতে বাধার আশঙ্কা
মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) এর তথ্যমতে, চলতি ২০২১-২২ মৌসুমে বিশ্বজুড়ে ২০ কোটি ৬৯ লাখ টন গম রপ্তানি হবে। এর মধ্যে ২৩ শতাংশই রপ্তানি করবে রাশিয়া ও ইউক্রেন। মোট বৈশ্বিক ভুট্টা রপ্তানির ১৬ শতাংশই আসবে এ দুই দেশ থেকে। ইউক্রেনের কৃষি উৎপাদনে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলা শুরু হবে। কেননা আরব বসন্তের অন্যতম কারণ ছিল বৈশ্বিক খাদ্যসরবরাহে ঘাটতি।
আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিলের পূর্বাভাষ অনুযায়ী, আগামী ৫ বছরে বিশ্বের ৬ ভাগের ১ ভাগ ভুট্টা আমদানির উৎস হবে ইউক্রেন। দেশটি ইতোমধ্যে শস্য রপ্তানিতে বিশ্বের প্রথম ৪টি দেশের মধ্যে অবস্থান করছে।
এদিকে ইউক্রেনে হামলার কারণে বাধার মুখে পড়েছে কৃষ্ণ সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াত। যুদ্ধের প্রভাবে এটি বিশ্ববাজারে মারাত্মক আকার ধারণ করবে। এতে এ পথ দিয়ে আমদানি-রপ্তানি করা খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। করোনা মহামারির কারণে এর মধ্যেই বিশ্বের অনেক অঞ্চলের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে নতুন করে খাদ্যের দাম বাড়লে তা সংকট বাড়াবে।
খাদ্যশস্যের চার রপ্তানিকারক দেশ ইউক্রেন, রাশিয়া, কাজাখস্তান ও রোমানিয়ার পণ্য রপ্তানি হয় কৃষ্ণ সাগরের বিভিন্ন বন্দর দিয়ে। গম রপ্তানির দিকে দিয়ে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে রাশিয়া। ইন্টারন্যাশনাল গ্রেইনস কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ভুট্টা রপ্তানিকারক দেশ হতে যাচ্ছে ইউক্রেন। আর গম রপ্তানিতে দেশটির অবস্থান চতুর্থ।
ইউএসডিএর তথ্যমতে, দেশ দুটি যে পরিমাণ গম রপ্তানি করে তা বিশ্বের মোট উৎপাদিত গমের (২০৬ দশমিক ৯ মিলিয়ন মেগা টন) চার ভাগের একভাগ। এই যুদ্ধে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বড় দুই গম আমদানিকারক দেশ তুরস্ক ও মিসরকে খাদ্য সংকটে পড়তে হবে। কেননা ২০১৪ সালের পর থেকে পূর্ব ইউরোপে স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করেছে। আরব উপসাগরীয় দেশগুলোতেও এটির প্রভাব পড়বে। কেননা লেবানন, মিসর, ইয়েমেন, ইসরাইল ও ওমান ইউক্রেনের খাদ্যশস্যের প্রধান ক্রেতা হওয়ায় তাদের ওপর এ ঘটনায় বড় প্রভাব পড়বে। লেবানন ও ইয়েমেন এরই মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। ২০২১ সালে বিশ্বের খাদ্যপণ্যের দাম আগের বছরের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
এদিকে গত বছরের গ্রীষ্মে চাষ করা বেশিরভাগ খাদ্যশস্যই রপ্তানি করে ফেলেছে ইউক্রেন। খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে দেশ দুটিতে বড় মানবিক বিপর্যয় হতে বাধ্য। ২০২০ সালে ইউক্রেন থেকে মুরগি আমদানি করা দেশগুলোর শীর্ষ ১১টির মধ্যে ৫টিই ছিল মধ্যপ্রাচ্যের। ইউক্রেনের মুরগির গোশতনির্ভর খাদ্যপণ্যের প্রধান ক্রেতা কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব।
২০১০ সালে খরার কারণে রাশিয়ায় গম উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মস্কো সে সময় অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। সেই খাদ্যসংকটের ফলাফল হচ্ছে আরব বসন্ত। বিশ্বে তখন গমের দাম বেড়েছিল। রাশিয়ার খাদ্যশস্যের বড় ক্রেতা ছিল মিসর। দেশটিতে রুটির দাম যাতে না বাড়ানো হয়, সেই দাবিতে মানুষ প্রতিবাদ করেছিলেন। মিসর, তিউনিসিয়াসহ সেখানকার গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম কারণ ছিল বৈশ্বিক খাদ্যসংকট।
২০১৯-২০ অর্থবছরের খরার ভয়াবহ প্রভাব কাটিয়ে গমে বিশ্ববাজার দখল করেছে ইউক্রেন। ২০২১-২২ মৌসুমের প্রথমার্ধে ৩ কোটি ২২ লাখ টন খাদ্যশস্য রপ্তানি করেছিল। মোট রপ্তানিকৃত খাদ্যশস্যের মধ্যে ১ কোটি ৫৮ লাখ টন গম, ৫২ লাখ টন যব এবং ১ কোটি ৮ লাখ টন ভুট্টা। যা আগের মৌসুমের একই সময়ের তুলনায় ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। তাদের প্রত্যাশা ছিল পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে দ্বিতীয়ার্ধে রপ্তানি আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসেবে গত বছরের অক্টোবরে দেশটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করেছে। ২০২১-২২ মৌসুমের প্রথম চার মাসে উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৪ লাখ টনে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে ১৮ শতাংশ। দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, এ বছর খাদ্যশস্য রপ্তানি ৬ কোটি ১৫ লাখ টনে পৌঁছবে, যা ২০২০-২১ মৌসুমের তুলনায় অনেক বেশি। ওই সময় ইউক্রেন ৪ কোটি ৪৭ লাখ টন খাদ্যশস্য রপ্তানি করে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর খাদ্যশস্য উৎপাদন ৮ কোটি ৫ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে। আগের বিপণন মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল ৬ কোটি ৫০ লাখ টন।
মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফরেন এগ্রিকালচার সার্ভিস সম্প্রতি গ্লোবাল এগ্রিকালচারাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি মৌসুমে ইউক্রেনে ৩ কোটি ৯১ লাখ টন ভুট্টা উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গম উৎপাদন পৌঁছতে পারে ৩ কোটি ২১ লাখ টনে। তবে যুদ্ধের কারণে এর ওপর প্রভাব ফেলবে।
প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেল
রাশিয়া ইউক্রেনে হামলার কারণে তেলের বাজারে এখন আগুন জ্বলছে। ইউরোপের ৩৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা পূরণ হয় রাশিয়া থেকে। দেশটি থেকে বেলারুশ ও পোল্যান্ডের মধ্য দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে জার্মানিতে গ্যাস সরবরাহ করা হয়ে থাকে। নর্ড স্ট্রিম ১-এর মাধ্যমে সরাসরি রাশিয়া থেকে জার্মানিতে যায় গ্যাস। আবার ইউক্রেনের ভেতর দিয়েও ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ করে মস্কো। এখন নর্ড স্ট্রিম ১-এর পর এবার নর্ড স্ট্রিম-২ পাইপলাইন নির্মাণের পথে হাঁটছে রাশিয়া ও জার্মানি। নতুন এই প্রকল্প চালু হলে ইউরোপে যেমন রাশিয়ার গ্যাসের আমদানি বাড়বে, তেমনি জ্বালানির ক্ষেত্রে মস্কোর ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এ অঞ্চল।
২০২০ সালে করোনার ধাক্কায় ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা পড়ে গেলে ক্ষতির মুখে পড়ে রাশিয়া। ক্ষতি কাটাতে গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়। রাশিয়া থেকে উত্তোলন করা জ্বালানি তেল ইউক্রেন হয়ে স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও চেক প্রজাতন্ত্রে যায়। ২০২১ সালে ইউক্রেনের মধ্য দিয়ে দেশগুলোতে ১ কোটি ১৯ লাখ টন অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে মস্কো। যেখানে আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ টন।
বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেনের ব্যবসা-বাণিজ্য
রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্য রয়েছে। দেশ দুটিতে তৈরি পোশাক, পাটসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। আবার গমসহ আরও বিভিন্ন পণ্য আমদানিও করা হয়।
২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয়েছে। একই সময়ে আমদানি হয়েছে ৪৬ কোটি ৬৭ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৪৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য। রাশিয়া থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭৮ কোটি ২০ লাখ ডলারের পণ্য।
প্রতি বছর ৫০ লাখ টন গম আমদানি করে থাকে বাংলাদেশ। এটি আমদানি করা হয় রাশিয়া, ইউক্রেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা ও ভারত থেকে। মোট আমদানির এক-তৃতীয়াংশই রাশিয়া ও ইউক্রেনের।









