পর্যটন মৌসুমে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে চলাচল করা বাইকের চাপায় প্রতিদিন অন্তত ছয় হাজার কাঁকড়ার মৃত্যু হচ্ছে। এছাড়া অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের প্রভাবে প্লাস্টিক দূষণ ও পশুপাখি বিলীন হয়ে সৈকতটি তার সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলছে: পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন, মেরিন জার্নালিস্টস নেটওয়ার্ক
কাঁকড়া আর্থ্রোপোডা পর্বের ক্রাস্টেশিয়ার অন্তর্গত একটি অমেরুদণ্ডী প্রাণী। বাংলাদেশের নোনা, আধা নোনা ও স্বাদু পানিতে নানা জাতের কাঁকড়া পাওয়া যায়। এদের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে খাদ্য হিসেবে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি হলো জাত কাঁকড়া, নীল সাঁতারু কাঁকড়া ও কাঁটা কাঁকড়া বা লাল কাঁকড়া। বর্তমানে শহরের অভিজাত রেস্তোরাঁগুলোতে নিয়মিত কাঁকড়ার বিভিন্ন খাবার পরিবেশিত হচ্ছে। নীল সাঁতারু কাঁকড়া নোনা ও আধা নোনা পানির কাঁকড়া। বঙ্গোপসাগরসহ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে জাত কাঁকড়া দেখা যায়। কাঁকড়া সমুদ্র উপকূলের দূষণ পরিষ্কারকারী ‘মেইন বায়োটার্বেটর’ বা জৈব রাসায়নিক পরিবর্তনকারী প্রধান প্রাণী হিসাবে বিবেচিত।
বাংলাদেশের কাঁকড়াচাষিরা প্রতিবছর সিঙ্গাপুর, হংকং, থাইল্যান্ড, চীন, তাইওয়ানসহ বিভিন্ন দেশে জীবন্ত জাত কাঁকড়া রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। সাম্প্রতিক দশকগুলিতে বিশ্বব্যাপী বাজারে চাহিদাবৃদ্ধি ও প্রকৃতিজাত কাঁকড়ার সংখ্যা কমে যাওয়ায় কাঁকড়াচাষ বাড়ছে। এদিকে চিংড়ির চেয়ে বেশি লাভজনক হওয়ায় সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, পাইকগাছা ও কয়রা, বাগেরহাটের রামপাল, মোংলা, বাগেরহাট সদর ও শরণখোলা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি কালীগঞ্জ ও দেবহাটা উপজেলায় কাঁকড়া চাষ বেড়েছে। দেশে বর্তমানে উৎপাদিত কাঁকড়ার পরিমাণ সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব না হলেও কাঁকড়া রপ্তানি থেকে প্রতিবছর প্রায় ২৫ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে।
কাঁকড়ার বিশ্ব বাজার
২০১৯ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি কাকড়ার ব্যবসা হয়। চীনের এই অঞ্চলের কাঁকড়ার বাজারে সবচেয়ে বেশি অংশীদারিত্ব রয়েছে। যেখানে ২০১৮ সালে মোট রপ্তানি মূল্যের ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল চীনের। তারপরে ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনের অবস্থান। চীনে কাঁকড়ার অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে একটি শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
উত্তর আমেরিকা ২০১৯ সালে কাঁকড়ার বাজারে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অঞ্চল ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০১৮ সালে কাঁকড়ার বৃহত্তম আমদানিকারক দেশ ছিল, যার আমদানি মূল্য ১.৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দাম সাপেক্ষে চাহিদা বৃদ্ধি এবং কাঁকড়ার পুষ্টির উপকারিতা সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা এই অঞ্চলে কাঁকড়ার সামগ্রিক চাহিদাকে আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিবেশ রক্ষায় কাকড়া
কাঁকড়া হল সমুদ্রের ক্লিনার। যারা সমুদ্রের তলদেশের মৃত জিনিস খায়। তারা বৃহত্তর প্রাণীর মৃতদেহ থেকে পুষ্টি পুনরুদ্ধার করে, যারা মারা গেছে। তারা শ্যাওলা খায়, ব্যাকটেরিয়া খায়, যা মানুষের খালি চোখে দেখা যায় না। তবে তাদের কাছে এগুলো খুবই দৃশ্যমান। এরা সামুদ্রিক প্রাণীদের মলও খেয়ে নেয়। তারা মাকড়সার মতো খুব চঞ্চল, কিন্তু বাস্তুতন্ত্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই কাকড়াকে ‘মেইন বায়োটার্বেটর’বলা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেভাবে সমুদ্রের দূষণ ঘটছে, সেক্ষেত্রে নীল কাঁকড়া ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্যগুণ
কাঁকড়া প্রোটিন দিয়ে পরিপূর্ণ, যা পেশী তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কাঁকড়াতে ওমেগা -৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন বি ১২ এবং সেলেনিয়ামের উচ্চ মাত্রা রয়েছে। এই পুষ্টিগুলি সাধারণ স্বাস্থ্যের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী অবস্থার প্রতিরোধে সহায়তা করে।
বেশ কিছু গবেষক এবং পুষ্টিবিদ দাবি করেছেন যে কাকড়া পুষ্টির দিক থেকে দারুণ। তারা কাঁকড়ার সমৃদ্ধ ভিটামিন, প্রোটিন এবং অ্যামিনো অ্যাসিড উপাদানের জন্য এই দাবিকে দায়ী করেন। পুষ্টিবিদরাও একমত যে কাঁকড়া একটি সমৃদ্ধ এবং স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে একটি অপরিহার্য সংযোজন।
কাঁকড়া হল একটি ক্রাস্টেসিয়ান যার ২টি ডাঁটাযুক্ত চোখ, চওড়া ক্যারাপেস এবং ৫ জোড়া পা রয়েছে যা মূলত সমুদ্রের তীরে বৃদ্ধি পায়। যদিও প্রতিটি কাঁকড়া সমুদ্রে বাস করে না যেমন কিছু মিঠা পানিতে বাস করে আবার অন্যরা স্থলে বাস করে। ক্রাস্টেসিয়ান ব্র্যাচুরার একটি ইনফ্রাঅর্ডারের অন্তর্গত যা একটি ছোট প্রক্ষিপ্ত লেজ বা পেট দ্বারা আলাদা।
কাঁকড়া প্রকৃতিতে সর্বভুক বলা হয়ে থাকে। কারণ এটি উদ্ভিদ এবং প্রাণী উভয়েরই উৎপত্তি যেমন ছত্রাক, প্ল্যাঙ্কটন, শৈবাল, ক্ল্যামস, শেলফিশ, ডেট্রিটাস, মলাস্কস, ব্যাকটেরিয়া, কৃমি, মাছ এবং অন্যান্য ক্রাস্টেসিয়ানের মতো বিভিন্ন ধরণের খাবার খেতে পারে।
কাকড়ার আবাস
নীল কাঁকড়ার আসল জন্মভূমি উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার আটলান্টিক উপকূল। ইউরোপে এই প্রজাতিটি প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল ১৯০০ সালে। আজ এটি বাল্টিক এবং উত্তর সমুদ্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চলগুলিতে পাওয়া যাবে। এটি ভূমধ্যসাগর এবং অ্যাড্রিয়াটিক সমুদ্রগুলিতেও পাওয়া যায়। কাঁকড়াগুলি ৫০০ মিলিয়ন বছর আগে প্রথম দেখা গেলেও এরা এখনও শক্তিশালী অবস্থায় টিকে আছে।
নীল কাঁকড়া মূলত অভিবাসী প্রাণী। হাজার বছরের পুরনো রহস্যের আঁতুরঘর হিসেবে চিহ্নিত কৃষ্ণ সাগরে বিশ থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত নীল কাঁকড়া দেখা যেত। সেই সঙ্গে এদের বসবাস ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে। সেখান থেকে বিশ শতকে ষাটের দশকের গোড়ার দিকে জাহাজের ব্যালাস্ট পানির সঙ্গে প্রাণীটি প্রথম ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করে। এরপর সারাবিশ্বেই ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে নীল কাঁকড়ার প্রজাতি অনেকটা বিলুপ্তির পথে। তবে কানাডার উপকূলবর্তী প্রদেশ নোভা স্কোটিয়া ও আর্জেন্টিার সমুদ্রিক পানিতে এটা পাওয়া যায়।
হুমকিতে কাঁকড়া
পর্যটন মৌসুমে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে চলাচল করা বাইকের চাপায় প্রতিদিন অন্তত ছয় হাজার কাঁকড়ার মৃত্যু হচ্ছে। এছাড়া অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের প্রভাবে প্লাস্টিক দূষণ ও পশুপাখি বিলীন হয়ে সৈকতটি তার সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলছে। এমন তথ্য উঠে এসেছে সমুদ্র পরিবেশ বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন মেরিন জার্নালিস্টস নেটওয়ার্কের এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যটন মৌসুমে কুয়াকাটায় প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৫০-৬০ হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেন। পর্যটন মৌসুমে কুয়াকাটায় প্রতিদিন অন্তত ২০০টি মোটরসাইকেল চলে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রতিবার একটি মোটরসাইকেলের চাপায় অন্তত ১০টি করে কাঁকড়ার মৃত্যু হয়। হিসাব করে দেখা যায়, বাইকচাপায় প্রতিদিন অন্তত ছয় হাজার কাঁকড়ার মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও অতি আহরণ থেকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং দেশের সুনীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উন্নয়ন, পুষ্টির চাহিদা পূরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য নীল কাকঁড়ার বাণিজ্যিক প্রজনন কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।









