ধানের অভাবে উত্তরাঞ্চলের প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার মিল চাতাল একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। অটোরাইস মিলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারা, উৎপাদন খরচ বেশি, শ্রমিক সংকটসহ নানা কারণে বন্ধ হয়েছে এসব মিল চাতাল। হাতেগোনা দু-একটি খোলা থাকলেও সেগুলো থেকে উৎপাদিত চাল একশ্রেণির ফড়িয়ার মাধ্যমে চলে যাচ্ছে অটোরাইস মিলে। সেখানে চাতালের ভাঙানো চাল পরিষ্কারের নামে চিকন করে বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে। এসব তথ্য পাওয়া গেছে মিল চাতাল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে।
ক্ষুদ্র চাতাল মালিকরা বলছেন, আমরা চরম অসহায়। কীভাবে ব্যবসা করি, কীভাবে বাঁচি? একথাগুলো আবেগঘন পরিবেশে দৈনিক আনন্দবাজারকে বলছিলেন রংপুর সদর উপজেলা মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সামছুল আলম। তিনি আরও বলেন, গোটা চালের বাজার ৬টি কোম্পানির কাছে জিম্মি। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে চালের লাগাম টানা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
মিল চাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে অটোরাইস মিলগুলোর মজুদের পাহাড় গড়ে তোলাকে দায়ি করলেন রংপুর ধান চাতাল মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ কাসেম। দৈনিক আনন্দবাজারকে তিনি জানালেন, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী পাবনা, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জে হাতেগোনা কয়েকজন লাখ লাখ মণ ধান মজুদ রেখে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। কারসাজি করে তারা ধান-চালের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছেন। প্রশাসনের সুষ্ঠু মনিটরিং না থাকায় এ অঞ্চলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। মিলারদের দাবি, মজুদদার ও অটোরাইস মিলগুলোর সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলতে পারলে বাজারে ধান-চলের সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
আগে রংপুরের মাহিগঞ্জ, দিনাজপুরের পুলহাট, বগুড়া, নওগাঁ রাজশাহী থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক চাল ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেত। চাল ব্যবসাকে ঘিরে এসব এলাকায় গড়ে ওঠে হাজার হাজার মিল চাতাল। কয়েক বছর আগেও শত শত মানুষের হাঁকডাকে মুখর থাকতো এসব মিল চাতাল এলাকা। এখন ধানের অভাবে মিল চাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক স্থানকে মনে হয় ‘মৃতএলাকা’।
বন্ধ হয়ে যাওয়া চাতাল মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন, ছাত্তার মিয়া, আলহাজ মকবুল হোসেন, সামছুজ্জামান, আজগার আলী, আবু হেনা, ফারুক হোসেন, সফিউলসহ অনেকেই দৈনিক আনন্দবাজারকে জানান, ধানের অভাবে তারা ইতোমধ্যেই চাতালের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে ভিন্ন পেশায় গিয়ে জীবিকা নির্বাহ করার কথা ভাবছেন। তারা আরও জানান, পুরো উত্তরাঞ্চল হাতেগোনা ৩০০ থেকে ৪০০ বড় ব্যবসায়ী ও অটোরাইস মিল মালিক ধান-চালের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। বড় ব্যবসায়ীদের কাছে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বাধ্য হয়ে তারা তাদের মিল চাতাল বন্ধ করে দিয়েছেন।
মাঝারি মিল মালিকরা আরও জানান, অটোরাইস মিল মালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা ধানের জন্য আগাম বেপারিদের টাকা দিয়ে রাখে। ফলে বেপারিরা ছোটখাটো মিল চাতালগুলোর কাছে ধান বিক্রি করতে আগ্রহ দেখায় না। তারা জানান, খাদ্য অধিদপ্তর থেকে মিল চাতালগুলোতে বরাদ্দ কমিয়ে দিয়ে তা অটোরাইস মিলগুলোকে দেওয়া হয়েছে। যদিও-বা দু-একজন বরাদ্দ পায় তাদের চালও অটোরাইস মিলে নিয়ে গিয়ে নতুন করে পরিশোধিত করতে হয়। এ ছাড়া উৎপাদন খরচও কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় অটোরাইস মিলগুলোর সঙ্গে তারা প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে পারছে না।
অপরদিকে লেবার সংকটও প্রকট। কয়েক বছর আগে এক মৌসুমে একজন চাতাল শ্রমিকের পেছনে সর্বোচ্চ খরচ পড়তো দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। এখন তা ১০ হাজার টাকাতেও হচ্ছে না। তারা আরও জানান, ধানের অভাবে বছরে তিন মাসও মিল চাতালগুলো চালু রাখা সম্ভব হয় না। মৌসুমে টুকটাক কাজ থাকলেও বাদ বাকি সময় তাদের অলসভাবে বসে থাকতে হয়। অথবা অন্য কোনো পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।
আবু পাটোয়ারি, লিখন চৌধুরী, রহিম পাঠান, মহিদ চৌধুরীসহ কয়েকজন আড়তদার দৈনিক আনন্দবাজারকে জানান, তারা বিভিন্ন মোকাম ঘুরেও অটোরাইস মিলগুলোর কারণে চাল সংগ্রহ করতে পারছেন না। অটোরাইস মিলের মালিকরা বাজার থেকে এক তরফাভাবে ধান সংগ্রহ করে নিজেদের ইচ্ছামতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর মহানগর শাখার সভাপতি ফখরুল আনাম বেন্জু দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, সঠিক মনিটরিং না থাকায় আর সরকারের মন্ত্রী আমলারা মাসোহারা খাওয়ায় চালের বৃহৎ সিন্ডিকেট ভাঙছে না। সরকারের উচিত দারিদ্রপীড়িত মানুষের কথা চিন্ত করে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে তছনছ করা। অন্যথায় কেউই শান্তিতে খেয়ে ঘুমাতে পারবে না।
খাদ্য বিভাগের রংপুর অঞ্চলের আঞ্চিলিক কর্মকর্তা আশরাফুল আলম দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, আমরা অসহায়। কিছু মনিটরিং ছাড়া আমাদের আর কী করার আছে। জনবল সংকটের কারণেই আমরা বাজার তদারকি করতে পারি না।









