বিগত ছয় দশকেও পানির বিতরণ মূল্য উৎপাদন মূল্যের সমান হয়নি। এতে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এমনকি গরীবদের টাকায় ধনীদের ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। এটি কেন করা হবে? বরং প্রত্যেকেই ২০-৫০ টাকা বেশি দিলে দেশ ৫০ হাজার কোটি টাকার ঋণ থেকে বেঁচে যায় বলে জানান মো. তাজুল ইসলাম এমপি। তিনি বলেন, দেশকে ভালোবাসলে সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। সেখানে কিছু নিন্দা থাকতেই পারে। সেটি করতে গিয়ে কখনো বিপক্ষেও যেতে হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, এখন সবাই ঢাকায় থাকতে চায়। সাধারণত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে থাকতে চায় না। এ জন্য প্রয়োজন ঢাকায় ব্যয় বাড়িয়ে জেলা ও উপজেলায় সেবার মান বাড়িয়ে দিতে হবে।
ওয়াসা কেন ভর্তুকি দেবে এমন প্রশ্ন রেখে মন্ত্রী বলেন, সরকার যদি ভর্তুকি দেয় তা হলে না হয় হবে। তবে সেটি সবাইকে কেন দেবে? গরীবের টাকায় ধনীদের কেন ভর্তুকি দেব আমরা? ভর্তুকির জন্য বিদেশ থেকে ঋণ নিতে হয়। আমরা ৫০ বা ১০০ টাকা বেশি দেই তবে দেশ ৫০ হাজার কোটি টাকা ঋণ থেকে বেচে যাবে।
তিনি বলেন, মন্ত্রীর কথাই শুনতে হবে বিষয়টি তা নয় বরং বোর্ড আলোচনা করে বাস্তব সম্মত সিদ্ধান্ত নেবে।
গতকাল রবিবার রাজধানী ঢাকার হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে ঢাকা ওয়াসার এলাকাভিত্তিক পানির মূল্য নির্ধারণ বিষয়ক টেকনিক্যাল স্টাডির (কারিগরি গবেষণা) ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী, ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা, ওয়াটার এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান।
তাকসিম এ খান বলেন, আমরা এই আলোচনাটি অনেক আগে থেকেই শুরু করেছিলাম। পরবর্তীতে বর্তমান স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আমাদের বলেন কেন একই দামে সবাই পানি কিনবে? গুলশান আর যাত্রাবাড়ির সাধারণ মানুষতো এক রকম দাম দিলে যুক্তিযুক্ত হয় না। পরবর্তীতে আমরা এইরকম একটি স্টাডি করার দরকার মনে করেছি। আমরা যে কোনো পরিবর্তন এবং সিদ্ধান্ত গবেষণার মাধ্যমে করে থাকি। এই বিষয়ে আমরা আরো আলোচনা করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।
তাকসিম এ খান বলেন, প্রতিদিন ওয়াসা ২১০ কোটি থেকো ২২০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে থাকে। সেখানে প্রতিদিন ৫০ কোটি লিটার পানি অপচয় হয়। অথচ এই পানি অন্তত ১০-২০ লাখ মানুষকে দিতে পারতাম। এসব বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সকল ক্ষেত্রে একই ধরনের পানি কেন? পান করা ও ধোয়া পরিষ্কারে ভিন্ন ধরনের পানি সরবরাহ করতে হবে।
গোলাম মোস্তফা বলেন, ঢাকা ওয়াসার পানির উৎপাদন ব্যয় বিক্রয় মূল্যের চেয়েও বেশি। অথচ ওয়াসা এ্যাক্টে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি চলবে বাণিজ্যিকভিত্তিতে। আমরা পানির মূল্য বৃদ্ধির প্রয়োজন অনুভব করলেও করোনাকালীন অর্র্থনৈতিক ক্ষতিগ্রস্তের কারণে বোর্ড তা বাড়াতে রাজি নয়।
হাসিন জাহান বলেন, যিনি বেশি আয় করেন তিনি বেশি টাকা দিবেন। মৌজার রেট, আয়ের রেট কি হবে তা বিবেচনায় আনা হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় ২৫ টাকা হিসেবে ধরা হয়েছে। অতি দরিদ্র ও ধনী লোক কত টাকা দিবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়াটার এইড বাংলাদেশের টেকনিক্যাল পরিচালক তাহমিদুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় প্রায় ২ কোটি মানুষের বসবাস। প্রতিবছর ৪ লাখ মানুষ যুক্ত হয়। ২৮ শতাংশ দরিদ্র ও ১২ খুবই দরিদ্র। জলবায়ু পরিবর্তন বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে।
হাসিন জাহান বলেন, ঢাকা ওয়াসার ৪০১ কিলোমিটার পার স্কয়ার এলাকাতে সেবা দিয়ে থাকে। রয়েছে ১১টি জোন। দুই ধরনের ট্যারিফে চলছে ওয়াসা। ডমেস্টিক ৮৮ শতাংশ ও ১২ শতাংশ বাণিজ্যিক। ১ হাজার লিটারে ডমেস্টিকে দিতে হয় ১৫.১৮ টাকা ও বাণিজ্যিকে ১ হাজার লিটারে ৪২ টাকা।
ফ্ল্যাট ট্যারিফ সম্পর্কে বলেন, ধনীরা বেশি পানি ব্যবহার করলেও অর্থ বেশি দিচ্ছে না। আর গরীবদের জন্য ভর্তুকি দিলেও সেটি সবাই ভোগ করছে। মৌজা রেট, হোল্ডিং ট্যাক্স, ইনকাম ক্যাটাগরি এই তিনভাগে ৯৫টি এরিয়ায় ১০টি জোন করা হয়েছে। করা হয়েছে ৭টি ভাগ। হাই ইনকামের লোক আছে ০.৮ শতাংশ ও তারা দিবে ৩৭.৫০ টাকা, আপার মিডল ১.৩ শতাংশ দিবে ৩১.২৫ টাকা, মিডল ৪ শতাংশ দিবে ২৫ টাকা, লোয়ার মিডল মানুষ আছে ৭৯.৪ শতাংশ। লো ইনকাম ২.৯ শতাংশ মানুষ দিবে ১২.৫০ টাকা। বাণিজ্য ও শিল্পাঞ্চলে ১১.৫ শতাংশ আছে তারা দিবে ৫০ টাকা করে। সরকারি ও সাধারণ মানুষ আছে ০.১ শতাংশ ও তারা দিবে ২৫ টাকা করে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা না হলে এই ট্যারিফ কাজ করবে না। সাবেক লেফটেনেন্ট জেনারেল আনোয়ার হোসেন বলেন, সাড়ে ৪ লাখ গাড়ি প্রতিদিন ধোয়া হয়। এখানে কিছু পানি বাঁচানো হলে ট্যারিফ বাড়াতে হবে না। পানির অপচয় রোধে গবেষণা করা দরকার। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বিষয়ে যে আইন হয়েছে সেটি নিয়ে কাজ করা যেতে পারে।
আনন্দবাজার/শহক









