- চীন-ভারত প্রশিক্ষণে জোর দিলেও পিছিয়ে বাংলাদেশ
- অদক্ষরাই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে পিছিয়ে পড়ছেন
প্রশিক্ষণ নিলে দক্ষতা অর্জন হয়। এতে ব্যবসা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়। ফলে সহজে লাভ করা যায়। - মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, অর্থনীতিবিদ।
দেশের ৬৯ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারিখাতের উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের সুযোগই পায় না। নিজের ও পারিবারিক খচর যোগাতে তারা প্রশিক্ষণ ছাড়াই ব্যবসা শুরু করেন। প্রশিক্ষণের অভাবে লোকসানে পড়ে এক সময় অনেকে তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।
সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিসের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি ২৫০টি ক্লাস্টার (গুচ্ছ প্রতিষ্ঠান) এবং ২৫০টি নন-ক্লাস্টার (বিক্ষিপ্ত প্রতিষ্ঠান) ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে করা হয়। আর নন-ক্লাস্টারের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ নেওয়ার হার মাত্র ৮ শতাংশ। উদ্যোক্তাদের মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশ উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছেন।
গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, উদ্যোক্তারা প্রশিক্ষণ নয়ার সুযোগ না পেলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে যেসব কর্মী কাজ করেন তাদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ কর্মী বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) কিংবা কোনো ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। ৩৫ শতাংশ সুযোগ পাননি। এসব শ্রমিক কারখানায় অন্যদের দেখে দেখে কাজ শিখেছেন।
জিডিপিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অবদান ২৫ শতাংশ। বগুড়ার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প, জামালপুরের হস্ত ও তাঁতশিল্প, সিলেটের মণিপুরি তাঁতশিল্পের মতো বিশেষ শিল্প অঞ্চলে (ক্লাস্টার) খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব এলাকায় গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের খুব অল্প সংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এর ফলে একদিকে উৎপাদন কম হচ্ছে, অন্যদিকে বাইরের বাজার ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা ছাড়াই তারা কাজ করছেন।
এ ব্যাপারে সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আনন্দবাজারকে বলেন, প্রশিক্ষণ নিলে দক্ষতা অর্জন হয়। এতে ব্যবসা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়। ফলে সহজে লাভ করা যায়।
একই মত জানিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন নাসিবের সভাপতি নূরুল গণি শোভন আনন্দবাজারকে বলেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তারা যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সহজে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। তাদের পক্ষে সহজে অর্থনীতিতে অবদান রাখা সম্ভব হয়। এজন্য প্রশিক্ষণ নেওয়া অতি জরুরি।
নারী উদ্যেক্তাদের সংগঠন ওয়েবের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী নাসরিন আওয়াল আনন্দবাজারকে বলেন, বাজারে কী ধরনের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে এবং কীভাবে এর সরবরাহ বাড়ানো যায়, তার জন্য প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। শুধু মালিক নয়, প্রতিষ্ঠানে কাজ করা শ্রমিকদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। কারণ, তারাই প্রধান চালিকাশক্তি।
দেশে অনেক ইনস্টিটিউট এসএমই উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়। তবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প (বিসিক), ইনস্টিটিউট অব এসএমই ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স সেন্টার (বিটাক), যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারসহ আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।
এসএমই ফাউন্ডেশনের উপমহাব্যবস্থাপক মো. আব্দুস সালাম সর্দার আনন্দবাজারকে বলেন, বেশির ভাগ শ্রমিক ও উদ্যোক্তারা প্রশিক্ষণ ছাড়াই গতানুগতিক কাজ করেন। ফলে বাইরের দেশে কী রকম পণ্যের চাহিদা বেশি সেটা ধরতে পারেন না। দীর্ঘ সময় ধরে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন বিআইডিএসের গবেষক ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. কাজী ইকবাল এবং গবেষণা সমন্বয় করেছেন ডেটা এনালিস্ট মোহাম্মদ খাবিরউদ্দীন। তারা জানান, এসব সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সেগুলো অত্যন্ত বেসিক। ফলে দেখা যায় অনেক সময় প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও উদ্যোক্তা-শ্রমিকরা বাস্তবে কাজে লাগাতে পারেন না। এই প্রশিক্ষণগুলো যতো দীর্ঘ হবে এবং নতুনত্ব আসবে উদ্যোক্তা-শ্রমিকরা ততো বেশি জানতে পারবেন এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে খাপ খাইয়ে নিতে সহজ হবে।
নরসিংদী জেলার নুসাবা টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিসের উদ্যোক্তা নাজমুল ইসলাম। এ টেক্সটাইলে দৈনিক তিন হাজার গজ কাপড় উৎপাদন হয়। দক্ষ শ্রমিকের অভাবে পাঁচ হাজার গজ কম কাপড় তৈরি হয় বলে জানান নাজমুল ইসলাম। তাঁর কারখানায় কাজ করেন ১০০ জন শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে কেউ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন।
কিশোরগঞ্জ জেলার উদ্যোক্তা জালাল মিয়া। ২০ বছর ধরে তিনি জুতার ব্যবসা করছেন। তার কারখানায় তিনটি মেশিনে রেক্সিন (এক ধরনের কৃত্রিম চামড়া) দিয়ে আটজন শ্রমিক দৈনিক ১২ টন জুতা তৈরি করেন। তিনি নিজে সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো রকমের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেননি এবং তাঁর কারখানার কর্মীরাও প্রশিক্ষিত নয়। জালাল মিয়া আনন্দবাজারকে বলেন, এখানে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা অন্যদের দেখে দেখে কাজ শিখেছেন।
ভবিষ্যতে প্রবাসে যেসব শ্রমিক পাঠানো হবে তাঁরা যদি প্রশিক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব না দেন তাহলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে পিছিয়ে পড়ার আশংকা প্রকাশ কওে সানেমের গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা আনন্দবাজারকে বলেন, গত ১০ বছরে প্রযুক্তিগত দিক থেকে দেশ অনেকটাই উন্নত হয়েছে। ফলে কারখানায় প্রযুক্তির উৎকর্ষ ঘটেছে।
আবার সময়ের সঙ্গে শ্রমিকের দক্ষতার চাহিদারও পরিবর্তন এসেছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য নতুন নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে শ্রমিকদের জানতে হবে। পুরনো দক্ষতা দিয়ে বর্তমান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলার জন্য সরকারের একটা প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সহসভাপতি মো. নাসির আনন্দবাজারকে বলেন, উচ্চমানের পণ্য তৈরি করার জন্য যে দক্ষতা প্রয়োজন, আমাদের শ্রমিকদের মধ্যে তার অভাব আছে। সে জন্য বিজিএমইএ ও সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। তিনি আরো বলেন, চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার শ্রমিকরা দক্ষতার দিক থেকে অনেক এগিয়ে গেছেন। আমাদের শ্রমিকদেরও দক্ষতা বাড়াতে হবে।
আনন্দবাজার/শহক









