করোনাভাইরাসে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে থমকে যাওয়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে চাঙ্গা করতে আসন্ন (২০২০-২১) অর্থবছরের জন্য সাম্ভব্য বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান বাজেটের আকার ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে চলতি বাজেট থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বা ১২ শতাংশ বেশি। তবে আসন্ন বাজেটের সাম্ভব্য ঘাটতি এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি বাজেটের ঘাটতি থেকে ৪৫ হাজার (জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ) কোটি টাকা বেশি। এটি আগের যে কোনো বছরের তুলনায় সবচেয়ে বড় ঘাটতির বাজেট।
নতুন বাজেটে ঘাটতির (অনুদানসহ) পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা, এটি মোট জিডিপির ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অনুদান ছাড়া ঘাটতির পরিমাণ হচ্ছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬ শতাংশ। বৈদেশিক অনুদান ধরা হচ্ছে চার হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে যা রয়েছে তিন হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে বাজেটের মোট ঘাটতি বাড়ছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয়ের সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে সংগৃহীত লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি বাজেটের তুলনায় ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ভ্যাট খাত থেকে আদায় করা হবে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, আয়কর থেকে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং কাস্টমস ডিউটি থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয় ৯৫ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। বাকি রাজস্ব আসবে এনবিআরের বাইরে কর বহির্ভূত রাজস্ব খাত থেকে আসবে ৪৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ কোটি টাকা।
২০২০-২১ অর্থবছরে সরকার অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ১ লাখ ৯ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছে। এরমধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার ঋণ নেবে ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ও অন্যান্য ঋণ নেওয়া হবে আরও ৫ হাজার কোটি টাকার। তবে চলতি অর্থবছরে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে এটি বাড়িয়ে ৮২ হাজার ৪২১ কোটি টাকা করা হয়েছে। চলতি বাজেটে (সংশোধিত) সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হয়েছিল ১৪ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ছাড়াও আগামী বছরে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৬ হাজার ৪ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরে ছিল ৫২ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা।
এদিকে বাজেটে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দের খসড়া থেকে জানা গেছে সর্বোচ্চ ৩১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এর পরিমাণ মোট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ১৫ দশমিক ১৮ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বরাদ্দ পেয়েছে ২৪ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ বরাদ্দ পেয়েছে ২৪ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বরাদ্দ পেয়েছে ১৭ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা। রেলপথ মন্ত্রণালয় বরাদ্দ পেয়েছে ১২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ পেয়েছে ১০ হাজার ৫৪ কোটি টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ বরাদ্দ পেয়েছে ৯ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাদ্দ পেয়েছে ৯ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা। সেতু বিভাগ বরাদ্দ পেয়েছে ৭ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বরাদ্দ পেয়েছে ৬ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা।
তবে বরাদ্দ কম হলেও অর্থমন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এবারের বাজেটটি গতানুগতিক ধারার কোন বাজেট নয়। ‘অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা’ শিরোনামের এবারের বাজেটটি প্রস্তুত হয়েছে সরকারের অতীতের অর্জন এবং উদ্ভুত বর্তমান পরিস্থিতির সমন্বয়ে। এবারের বাজেটে সঙ্গত কারণেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। পাশাপাশি কৃষি খাত, খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা এবং কর্মসংস্থানকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে নানা ধরনের কষি ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণ, ক্ষতিগ্রস্থ শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যকে পুনরুদ্ধার করাসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বাজেটে বিভিন্ন প্রস্তাবনা থাকছে।
বাজেটে জরুরি খাত ছাড়া কোনও অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে না। করোনা পরবর্তী সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও রাখা হবে। শিল্পের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ও করোনা পরবর্তী বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ নজর দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আসন্ন বাজেটে আগামী বছরের জন্য ব্যক্তি আয়কর সীমা বাড়ানো হচ্ছে। তবে করপোরেট কর হার কিছুটা কমানো হতে পারে। নতুন করারোপ হবে না। ঘোষণা না দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্তি করা হবে। এজন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এছাড়া দাতা সংস্থার কাছ থেকে বাজেট সহায়তা হিসেবে ৭০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আশা করছে সরকার।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছেন, কোনও সংকটেই জীবন যেমন থেমে থাকে না, তেমনই সরকারের সামনে এগোনোর পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও থেমে থাকবে না। সবকিছু মোকাবিলা করেই সামনে এগোতে হয়। আমরা সামনে আগানোর চেষ্টা করছি। সেভাবেই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করছি।
মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করছি, আমাদের লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হবে। যে যাই বলুক, জিডিপি প্রবৃদ্ধি আমাদের কাঙ্ক্ষিত হারেই অর্জিত হবে। মূল্যস্ফীতিও ধরে রাখতে পারবো স্বাচ্ছন্দ্যময় হারের মধ্যেই। সবকিছু বাজেট বক্তৃতায় পরিষ্কার হবে। এখনও অনেক কিছু চূড়ান্ত হয়নি।’ শেষ পর্যন্ত সরকার মানুষের জন্য কল্যাণকর একটি বাজেট উপস্থাপন করবে বলে জানান তিনি।
নতুন বাজেট সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, আসন্ন নতুন বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এসব প্রকল্প দ্রুত শেষ করতে বাজেটে বরাদ্দ বেশি রাখা হবে। করের হার নতুন করে বাড়ানো হবে না।
আনন্দবাজার/শহক








