বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির গেল দুই বছরের প্রবল ধাক্কায় এমনিতেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধাক্কা সামলাতে হয়েছে। কর্মসংস্থান হারানোয় হাহাকার ছিল শহর থেকে গ্রামে। তবে সম্প্রতি করোনা মহামারির দাপট কমে আসায় অর্থনীতির চাকা আবারো ঘুরতে শুরু করেছে। দু’বছর পর এবারই প্রথম উৎসবে ফিরছে দেশ। সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ব্যবসাবাণিজ্যও সচল হয়েছে।
অর্থনীতির পালে হাওয়া দিতেই সামনে চলে এসেছে পবিত্র রমজান মাস ও সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদুল ফিতর। রমজান আর ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর বিপনিবিতানগুলোতে ইতোমধ্যে কেনাকাটা জমে উঠেছে। বিশেষ করে রাজধানীর মধ্যবিত্তদের জনপ্রিয় নিউমার্কেট, গাউছিয়ায় রমজানের শুরু থেকেই ক্রেতাদের ঢল নেমেছে। রাতভর চলছে কেনাকাটা। আর কয়েকদিন পরেই ঈদকে সামনে রেখে দুই বছরের করোনার ক্ষতি পোষাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
তবে ঈদের কেনাকাটার এই ভরা মৌসুমেই হঠাৎ ধাক্কা হয়ে এসেছে মার্কেটের ব্যবসায়ী আর স্থানীয় কলেজের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘসময় ধরে চলা সংঘর্ষ। তুচ্ছ ঘটনায় তর্কাতর্কি থেকে বড় সংঘর্ষে রূপ নিয়ে তা চলে বহু সময় ধরে। যাতে রাজধানীর সবচেয়ে ব্যস্ত ব্যবসাকেন্দ্র হয়ে পড়ে রণক্ষেত্র। গত সোমবার রাত ১২টা থেকে শুরু হয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত চলে ধাওয়া, পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষ, গুলি, অগ্নিসংযোগ। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কর্মচারীরা নেমে আসেন রাস্তায়। অন্যদিকে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরাও তাদের পড়াশোনা ক্লাস, পরীক্ষা রেখে যুদ্ধে নেমে পড়ে। দু’পক্ষের এই অঘোষিত যুদ্ধ আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর চোখের সামনেই চলতে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। শেষ অবধি উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি খানিকটা শান্ত হয়ে আসে।
তবে তুচ্ছ ঘটনায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আর কাজ ফেলে ব্যবসায়ী আর কর্মচারীরা পবিত্র রমজান মাসে যে আত্মঘাতি সংঘর্ষে জড়িয়েছেন তাতে কতটা ক্ষতি আর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে ঠিকঠাকভাবে সে হিসাবে তারা এখনও নামেননি। অন্যদিকে পড়ালেখা, ক্লাস আর পরীক্ষা রেখে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা যে প্রতিষ্ঠানের সামনেই রণক্ষেত্র সময় কাটালো তার খেসারত কীভাবে দিতে হবে তারা বিষয়ে এখনও ভাবতে শুরু করেনি।
দুই পক্ষের দীর্ঘসময় ব্যাপী সংঘর্ষ আর অগ্নিসংযোগের কারণে ঠিক কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে না পারলেও ব্যবসায়ী নেতারা বলছিলেন, সোমবার বিকেল অবধি তাদের দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলতে না পারলে শতকোটি টাকার ক্ষতি হবে। সাধারণ মানুষ ও নিউমার্কেটে আগত ক্রেতারা বলছেন, তুচ্ছ ঘটনায় দুই পক্ষ নিজেদের সামলে নিয়ে আত্মসম্মান বজায় রাখতে পারলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে দুই পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো তাহলেও এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখতে হতো না।
নিউ মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি আমিনুল ইসলাম শাহীন দাবি করেছেন, সোমবার রাতে ঘটনার সময় নিউ মার্কেটের একাধিক দোকানে লুটপাট হয়েছে। পুলিশ আসায় তা রক্ষা হয়। এই এলাকায় নিউ মার্কেট, গাউছিয়া সুপার মার্কেট, চন্দ্রিমা সুপার মল, চাঁদনী চক, হকার্স মার্কেট, নিউ ম্যানশনসহ আরও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানও এখানে। গেল দুই বছরে করোনার কারণে দোকানপাট বন্ধ ছিল। এবার ঈদকে কেন্দ্র করে ক্ষতি পুষিয়ে নেবার চেষ্টা চলছে। তবে সংঘর্ষের এই ঘটনায় ঈদ কেন্দ্রিক বাণিজ্যে বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী এই নেতা।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন জানান, নিউমার্কেট কেন্দ্রিক ২০টি মার্কেট রয়েছে। ব্যবসায়ীর সংখ্যা হবে দেড় লাখের বেশি। সামনে ঈদ, তাই এখন ব্যবসার ভরা মৌসুম। বেচাবিক্রি একদিন বন্ধ থাকায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১০০ কোটি টাকা। তবে সার্বিক ক্ষতির বিষয়ে সঠিক তথ্য দেয়া কঠিন।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
দোকানে খাবারের বিল পরিশোধ নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এরপর তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। গত সোমবার মধ্যরাতে দোকান কর্মচারীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রায় আড়াই ঘণ্টা সংঘর্ষ চলে। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে রাত আড়াইটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে সারাদিন থেমে থেমে চলে এ সংঘর্ষ। দুপুরের পর পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া শুরু করলে শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। সংঘর্ষে প্রায় অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে।
আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর একজনকে স্কয়ার হাসপাতালের আইসিউতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ২৯ জন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন। দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মানের তুলনায় অতিরিক্ত দাম হাঁকানো, খারাপ আচরণ, পণ্য দেখলেই দাম বলতে বাধ্য করাসহ নানাভাবে ক্রেতাদের হয়রানীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে নিউমার্কেটসহ এর আশপাশের মার্কেটের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে কেনাকাটা করতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের অসদাচরণের শিকার নুর হোসেন শরিফ নামে একজন দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, সেখানে আমার শপিংয়ের অভিজ্ঞতা খুবই বাজে ধরণের। কোনো পণ্য দেখলেই তার দাম চাওয়া হয় ১০-২০ গুণ। ব্যবসায়ীদের আচরণ এতটাই খারাপ যে একবার কিছু কিনতে গেলে দ্বিতীয়বার আর যাওয়ার ইচ্ছে জাগে না। প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের কাছে হতে হয় নাজেহাল। আর যদি পরিবারের নারী সদস্যদের নিয়ে যান তাহলে এতটাই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় যা বলার ভাষা নেই।
ঢাকা কলেজ সাংবাদিক সমিতির (ঢাকসাস) সভাপতি আনাস ভূঁইয়া দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, ঘটনার সূত্রপাত মূলত কী নিয়ে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে দুটি তথ্য আমাদের কাছে এসেছে। এর মধ্যে একটি হলো- হোটেলে ছাত্রদের খাওয়া নিয়ে। আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি তা হলো তিনজন ছাত্র একটি হোটেলে খেতে গিয়েছিলো। সেখানে খাবারের বিল নিয়ে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে হোটেল ব্যবসায়ী ছাত্রদের ছুরি দিয়ে কুপিয়েছে। পরে ঢাকা কলেজের অন্য সহপাঠিরা এসে তাদের উদ্ধার করে। আর এখান থেকেই সংঘর্ষের শুরু হয়।
আনাস ভূঁইয়া আরো বলেন, অন্য ঘটনার সম্পর্কে জানা যাচ্ছে, জামা কিনতে গিয়ে দাম বেশি চাওয়ায় সমস্যার শুরু হয়। তবে এর সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সমস্যা শুরু হওয়ার পরপরই পরিবেশ শান্ত করতে পারতো প্রশাসন। আমরা দেখেছি আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা শুরু থেকেই ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিয়ে ছাত্রদের ওপর হামলা চালিয়েছে। তারা উভয় পক্ষকে শান্ত না করে ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিয়েছে। যে কারণে সংঘর্ষ এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে। হল বন্ধ ঘোষণার বিষয়ে ডাকসাস সভাপতি বলেন, এর বিরুধ্যে ছাত্ররা আন্দোলন গড়ে তুলেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ছাত্ররা। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত পাল্টে কি না তা বলা যাচ্ছে না।
এদিকে নিউমার্কেট, ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেট, নূরজাহান মার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনীচক মার্কেট থেকে বিশাল অংকের চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে দীর্ঘদিনের। যে চাঁদা তোলার দায়িত্বে আছেন লাইনম্যান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কিছু ব্যবসায়ী জানান, নিয়মিত চাঁদা দিয়েই এসব এলাকায় ব্যবসা করতে হয়। এখানে এমন অনেক দোকান আছে যেখানে প্রভাবশালী নেতারা টাকা না দিয়ে পণ্য নিয়ে চলে যান। তাদের অত্যাচারে ব্যবসায়ীরা অতিষ্ট। চাঁদা দেয়ার পরও এভাবে মালামাল নিয়ে যাওয়ার কারণে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দাম বাড়িয়ে দিতে হয়। যে কারণে ক্রেতাদের সঙ্গে সমস্যা তৈরি হয়।
এদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় গতকাল বিকেল চারটার দিকে দ্রুতগতির মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়। দফায় দফায় সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি নির্দেশনায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মোবাইল অপারেটরগুলো। নিউমার্কেট এলাকায় অবস্থানকারী কয়েকজনের সাথে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা জানিয়েছেন, বিকেল থেকে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা পাচ্ছিলো না তারা।
এদিকে, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা দুঃখজনক। আমাদের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। আহত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে আমরা দেখছি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সকাল থেকে থাকলে হয়তো পরিস্থিতি আরেকটু ভালো হতে পারতো। তবে তারাও চেষ্টা করেছেন, এখনো তারা চেষ্টা করছেন থামানোর। আমি ছাত্র-ব্যবসায়ী সকল পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানাই। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০ এপ্রিল থেকে ঈদের ছুটি শুরু হলেও ঢাকা কলেজে যেহেতু ক্লাসের পরিবেশ নেই, তাই আজ থেকে এই কলেজে ঈদের ছুটি শুরু হয়ে যাবে। আগামী ৫ মে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঢাকা কলেজও খোলা হবে।
আনন্দবাজার/শহক









