উত্তর আমেরিকার শুষ্ক ও উষ্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম সোনোরান মরুভূমিতে গরমকালে তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে উঠানামা করে। শীতকালে নেমে আসে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। বছরের গড় বৃষ্টিপাতও তেমন ভালো নয়। সোনোরান মরুভূমির সঙ্গে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমির তুলনা করতে গিয়ে আঁতকে উঠেছেন অনেক বিজ্ঞানী। ১৯৭২ সালে এই বরেন্দ্রভূমিতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। গত পাঁচ দশকে রেকর্ড না ভাঙলেও তাপমাত্রা প্রতিবছর ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার করেছে। গত দুই দশকের ব্যবধানে সম্প্রতি সেখানে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
সাহারা মরুভূমির মরুকরণের সূত্রপাত্র নিয়ে গবেষণা করা মার্কিন ভূবিজ্ঞানী ড. নারম্যান ম্যাকলিয়ের মতে, যেভাবে সাহারায় মরুকরণ হয়েছে ঠিক একই ঘটনা ঘটছে বরেন্দ্রভূমিতে। সাহারা মরুভূমির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো আগুনের ফুলকির প্রবণতা বরেন্দ্র অঞ্চলের বাতাসেও বাড়ছে। তার মতে, কোনও এলাকা মরুকরণের জন্য বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাই যথেষ্ট। অথচ বরেন্দ্র অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। এরপর ৩৮ থেকে ৪২ ডিগ্রির মধ্যে উঠানামা করছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মরুকরণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর প্রক্রিয়ায় ঘটে। সেটা হতে পারে অর্ধশতক ধরেও। সোনোরানের প্রবণতা বরেন্দ্র অঞ্চলে পরিলক্ষিত হলেও শুধু খানিকটা বৃষ্টিপাত আর বনজসম্পদ বেশি থাকার কারণেই মরুকরণ প্রক্রিয়ায় কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তন জনিত প্রভাবের ধাক্কায় দেশের বরেন্দ্র অঞ্চল মহাবিপদ সংকেত বহন করছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতিমিনিটে ৪৪ হেক্টর আবাদি ভূমি এবং ২০ হেক্টর বনভূমি মরুকরণ হচ্ছে। সে হিসাবে বছরে ৭০ লাখ হেক্টর জমি মরুকরণ হচ্ছে। শুধু পানি সংকটের কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
দেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণে দীর্ঘদিন ধরে বড় অবদান রেখে চলেছে তীব্র পানি সংকট। উত্তরের জেলাগুলোতে এমনিতেই মৃত্যুপথযাত্রী বহু নদী, তার ওপর তিস্তায় পানি প্রবাহের হেরফেরে মরুকরণে সহায়কা হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া ফারাক্কা বাঁধের কারণে প্রয়োজনীয় পানি উত্তরের নদ-নদীতে প্রবাহিত না হওয়ায় নদীগুলো মরে যাচ্ছে। মৌসুমে শুকিয়ে চৌচির হয়ে চালুচরে পরিণত হচ্ছে। গেল কয়েক দশক ধরেই এভাবে মরুকরণের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে উত্তরাঞ্চল।
আবহাওয়া বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আক্কু ওয়েদারের পর্যবেক্ষণ বলছে, বরেন্দ্রভূমির তাপমাত্রা ৩৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে স্থানীয় ব্যক্তিদের অনুভূতি হয় ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো। বিশেষ করে সেখানকার অধিবাসীরা রীতিমতো মরুভূমির মতো লু হাওয়ার অনুভূতি পাচ্ছেন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে গত রবিবার সারা দিন পারদ যন্ত্রের হিসাবে ঢাকার তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও মানুষের কাছে এর অনুভূতি ছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার হিসাবে মরুভূমিতে দিনের গড় তাপমাত্রা সাধারণত ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। তবে রাতে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।
অবশ্য বরেন্দ্রভূমিসহ বিভিন্ন এলাকায় রাতের তাপমাত্রা ২৬ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকায় দিন ও রাতের গরমের অনুভূতি রেহাই দিচ্ছে কাউকেই। মাঝেমধ্যে আকাশে মেঘ আর দমকা বাতাস থাকছে। তাতে অল্প সময়ের জন্য গরম কমলেও আবারও তীব্র গরমের অনুভূতি ফিরে আসছে। গত দুই দিন ধরে তাপমাত্রা সামান্য কয়েক ডিগ্রি কমলেও গরমের অনুভূতিতে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম, নদী-নালাগুলোও শুকিয়ে গেছে, ভুগর্ভস্থ পানি নেমে গেছে। এসব দীর্ঘদিন ধরেই বরেন্দ্র অঞ্চলের সঙ্গি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র তাপদাহ।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের লালমাটি খ্যাত বরেন্দ্র অঞ্চল ভয়াবহ পরিণতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। মরুকরণ প্রক্রিয়া সংঘটিত হতে আগামী অর্ধশতকও লাগতে পারে বলে বলা হচ্ছে। তবে তার আগেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। বাস্তুচ্যুত হতে থাকবে জনপদের মানুষ। তবে বরেন্দ্র অঞ্চল কতো দ্রুত মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাবে তা পুরোটাই নির্ভর করছে পরিবেশ বিপর্যয়ের মাত্রার ওপর। যা ঠেকাতে না পারলে বিপদ ঘনিয়ে আসবে দ্রুত।
আনন্দবাজার/শহক









