- উচ্ছেদ আতঙ্কে আদিবাসীরা
- ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে আর কতো অপেক্ষা
আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী- আদিবাসীদের দলিল থাকুক বা না থাকুক, ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহারিত জমি তাদের। আইএলও কনভেনশনে অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে তাদের ভূমি মালিকানার বিষয়টি আইনে পরিণত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব
তুই যদি ভালো গোরমেন (গভর্নমেন্ট), তবে আমাদের এত কষ্ট কেন?” মহাশ্বেতা দেবী তাঁর ‘চোট্টি মুন্ডা ও তার তীর’ উপন্যাসে ব্রিটিশ আমলের এক মুন্ডা হেডম্যান পহানকে এ কথা বলেছিলেন। জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে এ মুন্ডা আদিবাসী বুঝেছিলেন, ইংরেজ মানেই শাসক; আর তাঁরা ভালো নয়। সেই সময় বিহার রাজ্যের ছোটলাট রোনাল্ডসনের ভাই মুন্ডাদের গ্রামে বেড়াতে এসে আদিবাসীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেছিলেন। তখন তাঁকে এ কথা বলেছিলেন পহান। ব্রিটিশ চলে গেল, পাকিস্তানি শাসকও নেই, এখন ৫০ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশ।
আজ এত বছর পর আপনাদের সামনে আমি সাধারণ একজন আদিবাসী মানুষ হিসেবে এ প্রশ্ন রাখলাম, ‘তুই যদি ভালো গোরমেন, তবে আমাদের এত কষ্ট কেন?‘ আধুনিকতার দীর্ঘ সময়ে আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব জগত, বসতভূমি, বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অধিকার হারিয়েছে। যে পাহাড় ও বনকে তাঁরা স্বতঃসিদ্ধ বলে তাদের ঐতিহ্যগত অধিকার হিসেবে দেখতো, আধুনিক রাষ্ট্র তাঁদের সঙ্গে কোনোরূপ আলোচনা না করে, সেখান থেকে তাঁদের উচ্ছেদের কথা ভাবছে। ভূমি অধিকার নিশ্চিত হতে আর কতো অপেক্ষা করতে হবে এমন প্রশ্ন সারাদেশের আদিবাসীদের। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আদিবাসীদের ভূমি অধিকার অনিশ্চিত।
বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসীর বসবাস। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামেই দেশের এক-তৃতীয়াংশ আদিবাসী বাস করে। আদিবাসীদের সিংহভাগ জনগণ এখনও জীবিকা নির্বাহের জন্য ভূমি ও বনের ওপর নির্ভরশীল। সেই সূত্রে টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় অঞ্চলেও আদিবাসী রয়েছে। বহু আগে থেকেই মধুপুর উপজেলার ১৩টি গ্রামে বসবাস করে আসছে আদিবাসী গারোরা। স্মরণাতীতকাল থেকে তাদের পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভূমিতে বসবাস করছে। তাদের নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি, রীতি-নীতি, পোষাক-পরিচ্ছদ, অলংকারাদি রয়েছে এবং তাদের নিজেদের সামাজিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় রক্ষণশীল। গারোদের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী থেকে সহজেই আলাদা করা যায়। মধুপুর এ গড়কে ‘সংরক্ষিত বন ঘোষণা’ করায় এ অঞ্চলের গারোরা উচ্ছেদ আতঙ্কে রয়েছে। পূর্ব পুরুষের ভিটে ছাড়তে ওরা নারাজ। বরং ওরা বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা হতে চায়। জমির খাজনা পরিশোধ করে বুঝে নিতে চায় তাদের দখলকৃত ভূমি। কিন্তু না দিতে পারছে খাজনা, না পারছে জমির কাগজপত্র সংশোধন করতে। বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করলে কোথায় উঠবে এ নিয়ে ওরা শঙ্কিত।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার আইএলও কনভেনশন নং ১০৭ র্যাটিফাই করে। এ কনভেনশনে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমির মালিকানা ও অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু এ কনভেনশনের আলোকে জাতীয় পর্যায়ে আইন বা নীতিমালা হয়নি এখনও। আদিবাসীদের ভূমির ওপর চিরায়ত প্রথা সমষ্টিগত মালিকানা আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯-এ স্বীকৃতি পেয়েছে। আইএলও কনভেনশনের মূল কথা- আদিবাসীদের দলিল থাকুক বা না থাকুক, যে জমি ঐতিহ্যগতভাবে তারা ব্যবহার করে আসছে, সে জমি তাদের। বাংলাদেশ সরকার আইএলও কনভেনশন ১০৭-এ অনুস্বাক্ষর করেছে। সুতরাং সে অর্থে আদিবাসীদের কাগজবিহীন সমষ্টিগত ভূমি মালিকানার বিষয়টি দেশের আইনে পরিণত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মনে করেন আদিবাসিরা।
সংবিধানের ১৪৯ ধারায় বলা হয়েছে, 'এ সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে সব প্রচলিত আইনের কার্যকারিতা অব্যাহত থাকবে।' সুতরাং যে বা যারা মধুপুরের বনে কাগজপত্রবিহীন ভূমিতে বাস করেন, বাগানবাগিচা করেন, সেই জমি বংশ পরম্পরায় তাদের। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশের সংবিধানে আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করা এবং 'কমিউনিটি ওনারশিপ'-এর বিষয়টি আসা প্রয়োজন। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিতে এর স্বীকৃতি আছে। সমতলের আদিবাসীদের জন্য ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনে অ-আদিবাসীদের নিকট জমিজমা বিক্রয় বা অন্যবিধভাবে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে রেভিনিউ অফিসার পূর্বানুমোদনের বিধান রয়েছে। সংবিধানে প্রথাগত ও সামাজিক মালিকানার বিষয়টিকে আনা জরুরি। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩ (গ)-তে মালিকানার নীতিতে তিন ধরনের কথা বলা হয়েছে। ১. রাষ্ট্রীয় মালিকানা, ২. সমবায় মালিকানা, ৩. ব্যক্তিমালিকানা। এখানে আদিবাসীদের 'সমষ্টিগত মালিকানার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করলে সামাজিকভাবে ভূমিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে বলেও আদিবাসীরা দাবি করেন।
বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রæয়ারি এক গেজেটের মাধ্যমে মধুপুর গড় এলাকার ৯ হাজার ১৪৫ একর জমিকে চূড়ান্তভাবে সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা করে। এ জমিগুলোর মধ্যেই গারো ও কোচদের গায়রা, জলই, টেলকি, সাধুপাড়া, জালাবাদা, কাকড়াগুনি, বেদুরিয়া, জয়নাগাছা, বন্দরিয়া, কেজাই, আমলীতলা পনামারি ও গাছাবাড়ি এ ১৩টি গ্রাম পড়েছে। এ সব গ্রামের ১ হাজার ৮৩টি গারো ও কোচ পরিবারের ৬ হাজার ৭৭ জনের বসতবাড়ি এবং তাঁদের আড়াই হাজার একর চাষাবাদের জমি রয়েছে। আদিবাসী লোকসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার দুই’শ জন । কয়েক পুরুষ থেকে বসবাসকারী এসব আদিবাসী উচ্ছেদ-আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
এ বনে ‘ইকো টুরিজম’ এলাকা ঘোষণার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বন বিভাগ। এটা বাস্তবায়িত হলে তাদের ভূমি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের পরিকল্পনা বাতিলসহ গারো ও কোচদের রেকর্ডভুক্ত জমি নিয়মিত খাজনা নেওয়া চালু করার দাবি জানান তারা। তবে মধুপুর গড়কে ‘সংরক্ষিত বন’ ঘোষণা করা হলে কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হবে তার সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি মধুপুর বন বিভাগ। অরণখোলা মৌজার প্রকাশ চন্দ্র ধর্মীয়রীতি অনুযায়ী বিয়ে করে শশুর বাড়ি চলে আসেন। তারপর থেকে যোগিন্দ্রনাথ বাহাদুর রাজার কাছে চাং দিয়ে ৩শ ৫০ শতাংশ জমি ভোগ দখল করছেন। বর্তমানে তিনি খাজনা দিতে পারছেন না। পুরনো কাগজপত্রই তাদের সম্বল। স্থায়ী কাগজপত্র তৈরি করতে পারছেননা তারা। নিষেধাজ্ঞা থাকায় পাকা কোন ঘরও তুলতে পারছেননা তাদের দখলকৃত ভূমির ওপর।
অরণখোলা ইউনিয়ন পরিষদের ৪নং ওয়াড সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যার প্রবীর নকরেক জানান, তার বাবা জ্ঞানেন্দ্র নকরেকের নামে রয়েছে ৮১ শতাংশ জমি। তারাও একই সমস্যায় ভুগছেন। নতুন ঘর তৈরি করতে পারছেনা। যেকোন সময় উচ্ছেদ হওয়ার শঙ্কার কথাও জানালেন তিনি। অজয় এমরি নামের এক বৃদ্ধার দখলে রয়েছে ১ একর ২০ শতাংশ জমি। ভোগ দখলে কোন সমস্যা হচ্ছে না। তবে যেকোন সময় উচ্ছেদ হতে পারে বলে অজয়ের আতঙ্ক। নতুন ঘর তুলতে পারছেনা। রয়েছে মাটির ঘরে। ভূমি অফিস খাজনাও নিচ্ছে না।
অজয় এমরি আরও বলেন, কয়েক পুরুষের পুর্বের জমি সরকার তাদের ভোগ দখলে দিলেও ১৯৮৪ সালে কোন শুনানি ছাড়াই তাদের জমি ছেড়ে দেওয়ার প্রাথমিক নোটিশ আসে। এরপর ২০১৬ সালে চূড়ান্ত নোটিশ হয়। তারপর থেকে এখনও তারা উচ্ছেদ আতঙ্কে রয়েছে।
জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, 'বনকে কেন্দ্র করেই আমাদের জীবন। তারপরও আমাদের কেন ভূমি থেকে উচ্ছেদে করা হবে। আমরা এর সমাধান চাই। সম্পত্তির কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়ে নিয়মিত কর, খাজনার আওতায় আনতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।
আনন্দবাজার/এম.আর









