পর্যটনের জন্য আদর্শ স্থান দেশের উত্তরপূর্বাঞ্চল সিলেট। ‘প্রকৃতিকন্যা’ খ্যাত সিলেটের দর্শনীয় স্থানগুলো নয়ন ভরে দেখতে দুই ঈদসহ বিভিন্ন ছুটিতে ছুটে আসেন দেশ-বিদেশের পর্যটকরা। সিলেটও তাদের বরণ করে হয় ধন্য। কিন্তু এবার সিলেটের জাফলংয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক কালো অধ্যায়ের। প্রবেশ ফি নিয়ে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে পর্যটকদের ওপর হামলা করে বেধড়ক পিটিয়েছেন উপজেলা প্রশাসনের নিয়োগ করা স্বেচ্ছাসবেকরা। নারীদের করা হয়েছে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা। হামলায় ৬ পর্যটক আহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী ও পুলিশ সূত্রমতে, ঈদ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সিলেটের জাফলংয়ে বেড়াতে আসা লাখো পর্যটকের মধ্যে ছিলো ঢাকার একটি পরিবার। এ দলে ৮ নারী ও শিশুসহ তারা ১২ জন ছিলেন। বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে কাউন্টারে এক শিশুর টিকিট কেনাকে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে কাউন্টারের স্বেচ্ছাসেবকদের বাগবিতণ্ডতা হয়। একপর্যায়ে কাউন্টারে থাকা উপজেলা প্রশাসনের কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক লাঠি, কাঠের টুকরো ও লোহার পাইপ দিয়ে পর্যটকদের বেধড়রক মারধর শুরু করেন। তখন পাশে থাকা এক তরুণী ও কোলে শিশুবাচ্চা নিয়ে এক নারী হামলা থামানোর চেষ্টা করলে তারাও হামলার শিকার হন। এসময় নারীদের শ্লীলতাহানিরও চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন হামলার শিকার পর্যটকরা। হামলায় ৬ নারী-পুরুষ আহত হন। পরে তাদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেয়া হয়। ঘটনার দিন রাতেই হামলার শিকার পর্যটকরা ঢাকায় ফেরেন।
ঘটনার পর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনার ভিডিও এবং ছবি মুঠোফোনে ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিলে বিকেল ৫টার দিকে উপজেলা প্রশাসন ও জাফলং সাব জোনের ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক ঘটনাস্থলে যান। পরে হামলাকারী ৫ স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেপ্তার করে গোয়াইনঘাট থানাপুলিশ। হামলার ঘটনায় আহত সুমন নামের এক পর্যটক বাদি হয়ে গোয়াইনঘাট থানায় মামলা করেছেন।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- গোয়াইঘাটের পন্নগ্রামের মৃত রাখা চন্দ্রের ছেলে লক্ষ্মণ চন্দ্র দাস (২১), ইসলামপুর গ্রামের বাবুল মিয়ার ছেলে মো. সেলিম আহমেদ (২১), নয়াবস্তি এলাকার ইউসুফ মিয়ার ছেলে সোহেল রানা, পশ্চিম কালীনগর গ্রামের মৃত আব্দুল কাদিরের ছেলে নাজিম উদ্দিন ও ইসলামপুর রাধানগর গ্রামের মৃত সিরাজ উদ্দীনের ছেলে জয়নাল আবেদীন।
হামলার শিকার পর্যটকরা অভিযোগ করেন, ঘটনার সময় জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেও সহায়তা পাননি তারা। বৃহস্পতিবার রাতে জাফলং গ্রিন রিসোর্টের সামনে ভুক্তভোগী পর্যটকরা তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন গণমাধ্যর্মীদের কাছে। এসময় তারা বলেন, হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচতে ৯৯৯-এ কল করে পুলিশের সাহায্য চাওয়া হয়। পুলিশ হামলার ছবি মুঠোফোনে তুলে পাঠানোর কথা বলে। পুলিশের কাছ থেকে কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি। তবে হামলার ঘটনার ভিডিও ফেসবুক ও অনলাইন গণমাধ্যমের মাধ্যমে ভাইরাল হলে বিকেলে পুলিশ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়। আটক করে ৫ জনকে।
ঢাকার কদমতলী থানাধীন শ্যামপুর জুরাইন এলাকার সম্রাট সরকার বলেন, টিকিট ছাড়া পর্যটন কেন্দ্রে ঢোকা যাবে না বলেই নারীদের শরীরে হাত দেয় হামলাকারী স্বেচ্ছাসেবকরা। এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা নারী-পুরুষদের ওপর হামলা করে উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক নিযুক্ত স্বেচ্ছাসেবকরা। তিনি বলেন, আমরা ঘটনার পর পরই ৯৯৯-এ কল করে সহযোগিতা চেয়েও পাইনি। আমাদের মেরে মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে জানালে ৯৯৯-এর ফোন রিসিভকারী পুলিশ মাথা ফাটানোর ছবি পাঠাতে বলেন।
হামলায় তাদের অনেকে আহত হলেও সুমন নামে একজনের অবস্থা গুরুতর জানিয়ে সম্রাট বলেন, তাকে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করাবেন। এখানে কোনো হাসপাতাল তাকে ভর্তি করতে চান না। তবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। হামলার শিকার বিথি সরকার বলেন, আমরা মেয়ে হয়েও হামলাকরীদের আটকাতে চেষ্টা করি। হামলার সময় তাদের একটাই কথা ছিলো- ‘মেরেই ফেলবো’। আমাদের জামা-কাপড় খুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছে হামলাকারী। পশুর মতো আচরণ করেছে তারা।
আহত সুমনের স্ত্রী সুমি সরকার বলেন, তারা আমার দেবর ও স্বামীকে মারপিট করছিল। সন্তান কোলে নিয়ে কাকে বাঁচাবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তারপরও হামলাকারীদের আটকানোর চেষ্টা করি। ওরা এসএস পাইপ ও কাঠ দিয়ে আমার স্বামীর মাথায় আঘাত করে। সৃষ্টিকর্তা অল্পের জন্য রক্ষা করেছেন, তিনি মারাই যেতেন।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কমকর্তা (ওসি) কে এম নজরুল ইসলাম গতকাল দুপুরে দৈনিক আনন্দবাজারকে জানান, এ ঘটনায় আক্রান্ত সুমন সরকার বাদি হয়ে ৫ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৪/৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। গ্রেপ্তার ৫ জনকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, আগে থেকেই জাফলং এলাকায় পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিলো। এবার নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে জাফলংয়ে পর্যটকদের জন্য ফি নির্ধারণ, বৃহস্পতিবারের অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধ করতে না পারা, ঘটনার পরপরই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নেওয়াসহ বিভিন্ন দায়িত্বহীনতায় কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে পুলিশ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্নভাবে প্রশাসনের এমন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করছেন সাংবাদিক ও পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। তাদের বক্তব্য, সিলেটের অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসন কোনো সময়ই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেনি। উপরন্তু জাফলংয়ে পর্যটকদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে আদায় করার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। এই টাকায় আদৌ কোনো উন্নয়ন হবে নাকি কতিপয় অসাধুরা এ টাকা লুটেপুটে খাবেন এ নিয়েও প্রশ্ন সচেতন সিলেটবাসীর।
বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের সিলেট অফিসের নিজস্ব প্রতিবেদক শাহ দিদার আলম চৌধুরী নবেল ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে লেখেন- ‘জাফলংয়ে পর্যটকদের কাছ থেকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে টোল আদায়ের এত প্রয়োজনীয়তা কেন দেখা দিয়েছিল? এতদিনের আদায় করা টোলের টাকা দিয়ে কী পর্যটন কেন্দ্রের কোনো উন্নয়ন হয়েছে? আদায় করা রাজস্বের শতভাগ কি সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে? পুলিশের পক্ষ থেকে পর্যটকদের নিরাপত্তায় আগাম ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছিলো। তাহলে এরকম ঘটনার সময় পুলিশ কোথায় ছিলো?
এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া বা না জানা পর্যন্ত হামলাকারী সবাইকে আটক করা হলেও পুলিশ প্রশাসন বা জেলা প্রশাসনকে ধন্যবাদ দিতে পারছি না। এটা তাদের রুটিন ওয়ার্ক হিসেবেই ধরে নেবো। সিলেটের পর্যটন খাতের উন্নয়নে প্রশাসনের কর্তাদের কোনো ভূমিকা অতীতেও ছিল না, এখনো নেই। পর্যটন বিকাশে সবচেয়ে বড় ভূমিকা এ অঞ্চলের সাংবাদিকদের। ব্যবসায়ী ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদেরও অংশীদারিত্ব রয়েছে। তাই পর্যটনের ক্ষতি হলে সবচেয়ে বেশি রক্তক্ষরণ হয় সিলেটের সাংবাদিকদের হৃদয়ে। পর্যটনের চেয়ে বালু-পাথরের মাপজোখ ভালো বুঝেন প্রশাসনের কর্তারা।’ সিলেটের সিনিয়র এই সাংবাদিক ছাড়াও সর্বস্তরের সচেতন মানুষজন এসব বিষয়ে প্রশাসনের সমালোচনায় মেতে উঠেন।
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান কামাল আহমদ বলেন, জাফলং পর্যটনকেন্দ্রে ১০ টাকার টিকিটের জন্য পর্যটকদের ওপর হামলা সিলেটবাসীর জন্য লজ্জার। অবিলম্বে অযৌক্তিক এ টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘জাফলং শুধু গোয়াইনঘাট উপজেলার নয়, এটি বৃহত্তর সিলেটবাসীর সম্পদ। এখানে পর্যটকরা নিরাপত্তা না পেলে আসবেন না। এজন্য আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবো।
উল্লেখ্য, দেশের অন্যতম পর্যটন স্পট সিলেটের নৈসর্গিক ভূমি জাফলংয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ফি নির্ধারণ করে উপজেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের নির্দেশে জনপ্রতি প্রবেশ ফি নির্ধারণ করা হয় ১০ টাকা। এই কার্যক্রমের তদারকি শুরু করে জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটির মাধ্যমে গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন। পর্যটকদের নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে জাফলংয়ে নির্ধারণ করা হয় তিনটি পয়েন্ট। এসব পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করতে গত ৭ মাস ধরে জনপ্রতি ১০ টাকা হারে ফি দিতে হচ্ছে পর্যটকদের। রশিদের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসনের নিয়োগকৃত স্বেচ্ছাসেবকরা গ্রহণ করেন এই ফি। তবে বৃহস্পতিবারের পর্যটক হয়রানির পর গত শুক্রবার থেকে এক সপ্তাহের জন্য এই ফি নেওয়া বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. মজিবুর রহমানের নির্দেশে এই সাতদিন জাফলং পর্যটনকেন্দ্রে ঢুকতে প্রবেশ ফি হিসেবে ১০ টাকা দেওয়া লাগবে না পর্যটকদের।
আনন্দবাজার/শহক









