
শ্রমিকের শ্রম ও ঘামে অর্থনীতির চাকা সচল হলেও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বালাই নেই। পোশাকখাত, যানবাহন, নির্মাণ, ট্যানারি, কৃষি, জাহাজভাঙা শিল্পসহ অসংখ্য পেশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে শ্রমিকদের। এতে অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রাণ যাচ্ছে শ্রমিকদের। কেউ কেউ আহত হয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন। ক্ষতিপূরণ না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, ক্ষতিপূরণ পায় না ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের পরিবারগুলো। উল্টো দিকে সরকারের দাবি, ক্ষতির শিকার শ্রমিকদের শতভাগ ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে।
তথ্যমতে, ২০২১ সালের ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাশেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জন শ্রমিক নিহত ও অসংখ্য আহতের ঘটনায় নতুন করে সবার সামনে আসে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তার বিষয়। এর আগে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলে সাভারের রানা প্লাজা ধসে এক হাজার ১৩৮ শ্রমিক নিহত হয়। তারও আগে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে ১১৭ জন পোশাকশ্রমিক নিহত হয়েছিলেন। আহত হয়েছিলেন দুই শতাধিক। এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে কাঁপিয়ে দেয়। শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন থেকে শুরু করে পোশাকক্রেতা দেশগুলো, সাধারণ ক্রেতার চোখ দিয়ে ঝরে অশ্রু। নড়েচড়ে বসে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তৈরি করে নতুন কিছু আইন-কানুন। আন্তর্জাতিক বাজারগুলোও সরব হয়ে উঠে এই বন্দিদশা দেখে।
চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) ‘বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মক্ষেত্র পরিস্থিতি বিষয়ে সংবাদপত্র ভিত্তিক বিলস্ জরিপ-২০২১’ এর তথ্য প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ২০২১ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় এক হাজার ৫৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু ও ৫৯৪ জন আহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৪৭ জন এবং আহত হয়েছেন ১২৫ জন। বিভিন্ন সেক্টরে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে ৪৩১টি। যার মধ্যে ১৭২টি শ্রমিক অসন্তোষ ঘটে তৈরি পোশাক খাতে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করেই জরিপ পরিচালনা করে বিলস।
জরিপে দুর্ঘটনা, নির্যাতন, শ্রম অসন্তোষ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলীর চিত্র তুলে বলা হয়, ২০২১ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহত এক হাজার ৫৩ জন শ্রমিকের মধ্যে পুরুষ শ্রমিক এক হাজার ৩ জন। আর নারী ৫০ জন। পরিবহন খাতে নিহত হয়েছেন ৫১৩ জন, নির্মাণ খাতে ১৫৪ জন, কৃষি খাতে ৮৭ জন। খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পে ৫৫ জন, দিনমজুর ৪৬ জন, মৎস্য ও মৎস্যশ্রমিক ২৭ জন, নৌ-পরিবহন খাতে ২৪ জন, অভিবাসী শ্রমিক ১৮ জন, জাহাজভাঙা শিল্পে ১২ জন, বিদ্যুৎখাতে ১১ জন, তৈরি পোশাক শিল্পে ৪ জন। এ ছাড়া অন্যান্য খাতগুলোতে যেমন স্টিল মিল, মেকানিক, ইট ভাটা, হকার, চাতাল’সহ ইত্যাদি সেক্টরে ১০২ জন শ্রমিক নিহত হন। ২০২০ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় বিভিন্ন খাতে ৭২৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়, এর মধ্যে ৭২৩ জন পুরুষ এবং ৬ জন নারী।
বিলসের মতে, ২০২১ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫৯৪ জন শ্রমিক। তার মধ্যে ৫৭১ জন পুরুষ এবং ২৩ জন নারী। সর্বোচ্চ আহত হয় মৎস্য খাতে ১৭৬ জন। পরিবহনে ৮০ জন ও নির্মাণে ৪৫ জন। জাহাজভাঙা শিল্পে ৪৪ জন, খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পে ৩৫ জন, নৌ পরিবহনে ৩৫ জন, কেমিকেল কারখানায় ২৩ জন, ডাইং ফ্যাক্টরিতে ২২ জন, উৎপাদনশিল্পে ২২ জন, কৃষিতে ১৯ জন, দিনমজুর ১৯ জন, তৈরি পোশাকশিল্পে ৫ জন এবং অন্যান্যখাতে ৫৯ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। ২০২০ সালে বিভিন্ন সেক্টরে ৪৩৩ জন শ্রমিক আহত হয়েছিল, তার মধ্যে ৩৮৭ জন পুরুষ এবং ৪৬ জন নারী। সড়ক দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, বজ্রপাত, অগ্নিকাণ্ড, ওপর থেকে পড়ে যাওয়া, পড়ন্ত বস্তুর আঘাত, বিষাক্ত গ্যাস, নৌ দুর্ঘটনা, দেয়াল/ছাদ ধসে পড়া, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ইত্যাদি কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে চিহ্নিত করা হয় জরিপে।
জরিপের তথ্যমতে, ২০২১ সালে বিভিন্ন সেক্টরে সবমিলিয়ে ৪৩১টি শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা ঘটে। এসব আন্দোলন করতে গিয়ে একজন নারী শ্রমিকসহ ৬ জন শ্রমিক নিহত এবং ১৬৩ জন আহত হয়েছে। বকেয়া বেতনের দাবিতে ১২৬টি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটে। এছাড়া দাবি আদায়ে ১১৫টি, অধিকার আদায়ে ৭৪টি, বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে ২৭টি, লে-অফের কারণে ২৬টি, ভাতার দাবিতে ২২টি, বোনাসের দাবিতে ১৬টি, এবং অন্যান্য দাবিতে ২৯টি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটে। আগের বছর ২০২০ সালে বিভিন্ন সেক্টরে সবমিলিয়ে ৫৯৩টি শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বেশি ২৬৪টি শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা ঘটে তৈরি পোশাকখাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৯টি শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা ঘটে পাটশিল্পে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ‘বাংলাদেশের ৫০ বছরের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা: প্রেক্ষিত কর্মসংস্থান এবং শ্রম পরিস্থিতি’ বিষয়ক সেমিনারে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা ড. রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত কৃষি, শিল্প কিংবা প্রবাসী আয়ে বাংলাদেশের যে মজবুত ভিত্তি, তার পেছনে রয়েছে শ্রমিকরা। তবে শ্রমিকরা ভালো নেই। তাদের মজুরি বৃদ্ধির হার জাতীয় মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। অতিমারি করোনা তাদের আরও চাপে ফেলেছে।
বাংলাদেশ শ্রমিক আইন (সংশোধন)-২০১৮ এ বলা হয়েছে, কর্মরত অবস্থায় শ্রমিকের অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণ দুই লাখ টাকা, আজীবনের জন্য অক্ষম তথা পঙ্গুত্ববরণ করলে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে মালিককে। আগে অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য ক্ষতিপূরণ ছিল ১ লাখ টাকা, পঙ্গুত্ববরণের ক্ষেত্রে ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি মোসাদেক হোসেন স্বপন আনন্দবাজারকে বলেন, দেশে কত শ্রমিক দুর্ঘটনায় নিহত হয়, এমন তথ্যই সরকারি ভাণ্ডারে পাওয়া যায় না। তার ওপর কত শতাংশ ক্ষতিপূরণ পায় তাতো হাস্যকর বিষয়। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সরকার একাধিক তদন্ত কমিটি করে। এসব কমিটি আবার নানান কাজ করে কিন্তু ফলাফলে আশার আলো নেই।
মোসাদেক হোসেন স্বপন বলেন, সরকার কোনো জনকল্যাণ ও শ্রমিকবান্ধব কাজ করতে চাইলেও সেখানে ঘাপটি মেরে বসে থাকা লোকগুলো ভালো কাজ করতে দেয় না। হয়তো কিছু কাজ হয়েছে তবে শ্রমিকদের কার্যকর অধিকার আদায় হয়নি। মালিকদের বিশাল একটি অংশই সংসদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সদস্য হওয়ায় কাজে বাধা দিয়ে থাকে।
সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সিকদার বলেন, আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ পায় না শ্রমিকরা। জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো সুবিধা জাহাজ ভাঙা শ্রমিকরা পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. এহছানে এলাহীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন শ্রমিকবান্ধব। তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশে এসে রেসকোর্স (সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) ময়দানে বলেছিলেন, আমার দেশের কামার-কুমার-শ্রমিক তথা সাধারণ মানুষ যদি পেট ভরে খেতে না পায় তবে এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে। তিনি বলেছিলেন, আমার পাট আছে, চা আছে, আছে চামড়া। অতএব এই দুর্দিন থাকবে না। এইদিন পাল্টাবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু এক ভাষণে শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ে বলেছেন, শ্রমিকদের আয়ের টাকায় আমরা আপনাদের বেতন দেই, আমি গাড়িতে চড়ি সেইসব শ্রমিকদের সম্মান দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের কথা বলতে হবে।
নিহত শ্রমিকদের ডাটাবেজ সরকারের নেই এমন অভিযোগের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেখানেই কোনো দুর্ঘটনা ঘটে আমরা তা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে আহত-নিহতের তালিকা প্রণয়ন করে থাকি। এসব ক্ষেত্রে কোনোক্রমেই অবহেলা করা হয় না। আর নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবার কত শতাংশ ক্ষতিপূরণ পেয়ে থাকে এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, আমরা শতভাগ ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকি শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ত্রাণ তহবিল থেকে। তা ছাড়াও সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরাও ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকে। তবে আমাদের এখানে আবেদন করতে হয়। পরে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে সঠিক ব্যক্তিদেরকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়ে থাকে। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হলো শ্রমিকবান্ধব, শ্রমিক কল্যাণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রমিকদের সার্বিক উন্নতির ব্যাপারে কাজ করছে এবং করে যাবে।
আনন্দবাজার/শহক








