কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদনের জন্য কমপক্ষে ২১টি মৌলিক উপাদানের প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ এসব উপাদানের ঘাটতি হলে জমির উর্বরতা হ্রাস পেতে থাকে। কৃত্রিমভাবে সার প্রয়োগের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে দৃশ্যত উৎপাদন বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ফলে কৃষিজমির স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে মৌলিক উপাদানের ঘাটতি যেন না হয় সেজন্য আবাদে বৈচিত্র আনাসহ নানা পরিকল্পনা করতে হয়। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে গেল কয়েক দশক ধরেই ফসল উৎপাদনের ওপর জোর দেয়ায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। উৎপাদন যেহারে বাড়ছে ঠিক একইহারে জমির উর্বরতা শক্তি ক্ষয়ে যাওয়াসহ মৌলিক উপাদানে ঘাটতি হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিগত ১৯৫১ সাল থেকে দেশের মাটিতে নাইট্রোজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। বছর ছয়েক পর ১৯৫৭ সাল সেই তালিকায় যুক্ত হয় মাটির মৌল উপাদান ফসফরাস। মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৬০ সাল এসে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের সঙ্গে যুক্ত হয় পটাশিয়াম। এর দুই দশক পর ১৯৮০ সাল থেকে সালফারও যুক্ত হয় ঘাটতির তালিকায়। এর দুই বছর পর ১৯৮২ সালে কৃষিজমিতে জিঙ্কের ঘাটতি দেখা দেয়। মাটির মৌলিক এসব উপাদানের ঘাটতি মেটাতে কৃত্রিম সার প্রয়োগ শুরু হয়। প্রায় এক যুগের বেশি সময় পর ১৯৯৫ সালে এসে মাটিতে ঘাটতির তালিকাভুক্ত হয় বোরোন।
মূলত, চলতি শতকের শুরু থেকেই কৃষিজমির মৌলিক উপাদানের ঘাটতির তালিকা আশঙ্কাজনকহারে দীর্ঘ হতে থাকে। বর্তমানে আটটি মৌলিক উপাদান নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিঙ্ক, বোরোন, ম্যাগনেশিয়াম এবং মলিবডেনামের ঘাটতি নিয়েই চলছে দেশের কৃষি উৎপাদনের ধারা। এর ওপর আবার কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি ভয়াবহ আকার ধারন করেছে। এভাবে ফসলি জমিতে যে হারে মৌলিক উপদান আর জৈব পদার্থে ঘাটতি বাড়ছে ঠিক একইহারে বাড়ছে কৃত্রিম বা রাসায়নিক সারের ব্যবহার। সেই সঙ্গে নানা ধরনের কীটনাশকের প্রয়োগ। এতে প্রভাব পড়ছে ফসল উৎপাদনে।
বাংলাদেশের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট আয়তনের ৫৬ শতাংশ জমিতে ফসলের আবাদ হয়। আর আবাদি এসব জমির প্রায় ৮০ শতাংশে জৈব উপাদান কমে গেছে। এসব ঘাটতি পুরণে জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে আরো বেশি উর্বরতা হারাচ্ছে কৃষি জমি। অপরদিকে মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ছে নানান অসুখ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব জমিতে চাষ করা হয় সেগুলোতে ৫ শতাংশ জৈব উপাদান থাকা প্রয়োজন। তবে, দেশের বেশিরভাগ জমিতে তা কমে ২ শতাংশের নিচে নেমেছে। অনেক জমিতে এক শতাংশের নিচে জৈব পর্দাথের পরিমাণ।
কৃষিবিদদের মতে, জমির ভালো গুণাগুণের জন্য সাধারণত ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা দরকার হলেও আমাদের মতো দেশে যেখানে উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে জৈব পদার্থ বেশি বিয়োজন হয়। এ পরিস্থিতিতে জমিতে জৈব পরিমাণ সাড়ে তিন শতাংশ থাকলেও হয়। জৈব পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে ফসল উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। সেজন্য মাটিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের পরিমাণও বাড়ছে। ফসলের জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে কৃষিবিদ ও বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন।
বেশিরভাগ কৃষক না জেনেই জমিতে বেশি করে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছেন। বিধিনিষেধ বা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় এসব রাসায়নিকের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। দেশে বছরে ৫৫ হাজার টনেরও বেশি রাসায়নিক সার এবং ৪০ হাজার টন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। তবে জৈব পদার্থের ঘাটতি যত থাকবে ততো বেশি রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হবে ফসল উৎপাদনে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ফসলি জমির পরিমাণ প্রায় এক কোটি ৫২ লাখ হেক্টর। আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ সাড়ে ৮৫ লাখ হেক্টর। বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, একটি আদর্শ জমিতে জৈব পদার্থের মাত্রা ৩.৫ শতাংশ থাকা আবশ্যক হলেও এ দেশের বেশির ভাগ জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ থেকে ১ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং কিছু কিছু জমিতে এর পরিমাণ ১ শতাংশের চেয়েও কম। এর মধ্যে ৩৭ লাখ হেক্টর জমিতে ফসফরাস, ২৭ দশমিক ২ লাখ হেক্টর জমিতে পটাশিয়াম, ৩৩ দশমিক ১ লাখ হেক্টর জমিতে গন্ধক, ২৭ দশমিক ৫ লাখ হেক্টর জমিতে দস্তা, ২৪ দশমিক ৯ লাখ হেক্টর জমিতে বোরন, ৩৫ দশমিক ৬ লাখ হেক্টর জমিতে অত্যাধিক থেকে অধিক অম্লের অভাব রয়েছে। এছাড়া অনেক জমিতে রয়েছে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের অভাব।
বাংলাদেশ জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ ফেডারেশনের (বিসিসিএফ) সহসভাপতি মিজানুর রহমান আনন্দবাজাকে বলেন, মাটির ভেতর অনেক ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র প্রাণি থাকে। অতিমাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ করার কারণে ওইসব ক্ষুদ্র প্রাণিগুলো মারা যায়। এতে মাটির ভিষণ ক্ষতি হচ্ছে। আগামীতে এর প্রভাব আরো বেশি পড়বে। তিনি আরো বেশি বলেন, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক নদী-নালা, হাওর-বাঁওড়ে গিয়ে মাছের মৃত্যুর কারণ ঘটাচ্ছে। শুধু মাছ নয়, অনেক পাখি ও প্রাণিও হারিয়ে যাচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিকের কারণে।
রিসার্চ ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড ডায়গনস্টিক সেন্টারের ফিজিও থ্যারাপিস্ট শামীম মোক্তাদির আনন্দবাজারকে বলেন, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে বিকল হয়ে পড়ে। ব্রঙ্কাইটিসসহ শ্বাসযন্ত্রে নানা জটিলতা দেখা দেয়। অনেকেই কিডনি ও লিভারের রোগে আক্রান্ত হয়। এমনকি গর্ভবতী মায়েরা ত্রুটিযুক্ত বা অসুস্থ সন্তান জন্ম দেন। দ্বিতীয়ত, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর।
রাজশাহীর তানোর উপজেলা উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সমশের আলী দৈনিক আনন্দবাজাকে বলেন, জৈব পদার্থ কমে যাওয়ার কারণে কমে যাচ্ছে জমির উর্বরতা শক্তি। মরে যাচ্ছে ফসলের জন্য উপকারী পোকা। কাজেই রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অবাধ ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি। কৃষক তার জমিতে অধিক ফলন চাইবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সেই ক্ষেত্রে জৈব সার ব্যবহার করা উত্তম। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদের যেসব পদ্ধতি রয়েছে, তা কৃষকদের মাঝে ব্যাপক প্রচলনের পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া তাড়া করে ফিরছে আমাদের। যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত ভীতিকর। গবেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রক্রিয়ায় ২০৬০ সালের মধ্যে দেশের প্রধান ফসলগুলোর ফলন ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য টেকসই মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনার জন্য বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সুপারিশকৃত নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে টেকসই মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পণা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা গেলেই কেবল বৈশ্বিক পরিবর্তিত জলবায়ুর বিরূপ প্রক্রিয়া মোকাবেলা করে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
তবে মাটির উর্বরতা ধরে রাখার জন্য বেশকিছু সুপারিশমালা প্রদান করেছে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা। তার মধ্যে কনজারভেশন পদ্ধতিতে (ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে রেখে সর্বনিম্ন চাষের মাধ্যমে জমি ব্যবহার) জমি চাষ, ফসল পরিবর্তন এবং মাটিতে পুষ্টি উপাদান ধরে রাখতে সক্ষম (লিগিউম ফসল) ফসলের আবাদ, অধিক পরিমাণে ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে সংরক্ষণ, জৈব সারের প্রয়োগ বাড়ানো, সঠিক মাত্রায় এবং সঠিক সময় রাসায়নিক সার প্রয়োগ ইত্যাদি অন্যতম। মাটির টেকসই উর্বরতা ব্যবস্থাপনার জন্য এসব সুপারিশমালা অনুসরণ করে ফসল আবাদ করা একান্ত জরুরি। তবে এসব সুপারিশমালা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।
আনন্দবাজার/শহক









