বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির কারণে গত দুই বছর বন্ধ থাকার পর এবার প্রাণের উৎসবে মেতে উঠেছে বাঙালি। ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো… গানে মুখরিত হচ্ছে বাংলার মাঠঘাট-প্রান্তর। আজ পহেলা বৈশাখ। ১৪২৯ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। বাংলার এই বর্ষবরণকে ঘিরে প্রাণের যে মহা উৎসবে মেতে ওঠে সব বয়সী মানুষ তার পেছনে থাকে অর্থনীতির হাওয়া। প্রাণের এই উৎসবেই আর্থিক লেনদেন বেড়ে যায় বহুগুণ। দেশীয় পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে বেচাকেনাও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে সরকারি আর বেসরকারি পর্যায়ে চালু হওয়া উৎসব ভাতা বেগবান করে পহেলা বৈশাখের পুরো অর্থনীতিকে।
কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের জন্য সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত ‘ফসলি সন’টি কালের পরিক্রমায় বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতিকে উৎস হিসেবে শুরু করা সেই সনটি কালের খেয়ায় রূপ নিয়েছে বাঙালির সর্বজনীন প্রাণের উৎসবে। অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংস্কৃতিক কর্মপরিসরও। আবার সেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের হাত ধরেই ফিরে এসেছে অর্থনীতির প্রবাহ। তবে উৎসবের সেই অর্থনীতি ফিরে এসে খানিকটা ভিন্নভাবে। বলা যায়, আগে ছিল প্রজাদের কাজ থেকে রাজা বা জমিদারদের খাজনা আদায়ের অর্থনীতি। আর এখন স্বেচ্ছায় অর্থনীতির লেনদেন।
বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারিতে সশরীরে নববর্ষ উদযাপন বন্ধ ছিল দুই বছর। স্থবির হয়ে পড়েছিল লেনদেনসহ অর্থনীতির প্রবাহ। বেকার হয়ে পড়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। দেশীয় পণ্য উৎপাদনসহ হস্তশিল্পে নেমে এসেছিল নীরবতা। থেমে গিয়েছিল প্রান্তিক অর্থনীতির গতি। তবে দুই বছর পর করোনা মহামারির সংক্রমণ কমে আসায় আবারও জেগে উঠেছে মানুষ। আবারো গতি পাচ্ছে অর্থনীতি। সেই সঙ্গে নানা উৎসবে মুখর হয়ে উঠছে চারপাশ। এর মধ্যেই চলে এসেছে বাংলা নববর্ষ। অতীতের ভুলত্রুটি, জরাজীর্ণতে ধুয়ে মুছে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় আজ উদযাপিত হচ্ছে বাংলা নববর্ষ। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকছে। বাঙালির প্রাণের এই উৎসবে অর্থনীতির দুয়ারও খুলে যাচ্ছে।
মুগল সম্রাট আকবরের সময়ে বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করতেন। পরদিন নববর্ষে ভূ-স্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে যায় পহেলা বৈশাখ। তবে সেই সাংস্কৃতিক বলয়ে পহেলা বৈশাখের আনন্দ প্রসারিত হলেও অর্থনীতির বিষয়টাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং প্রাণের এই উৎসব অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পা রেখেছে। আগের সেই খাজনা আদায়ের অর্থনীতি পাল্টে গেছে সত্য, তবে উৎসবমুখী অর্থনীতির পালে দারুণ হাওয়া দিয়েছে পহেলা বৈশাখ বা বর্ষবরণের মতো সর্বজনীন আয়োজনগুলো।
সূত্রমতে, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির আওতায় দেশব্যাপী ছোট-বড় প্রায় ২৬ লাখ দোকান রয়েছে। রাজধানীসহ সারাদেশে প্রায় সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার বুটিক ও ফ্যাশন হাউস রয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনের তথ্যে জানা যায়, প্রতিবছর বৈশাখকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার দেশীয় বাঁশ, বেত, কাঠের তৈরি জিনিস, মাটির তৈজসপত্র, খেলনা, প্লাস্টিকের খেলনা, বিভিন্ন ধরনের মুড়িমুড়কি, নাড়ু বিক্রি হয়। এর বাইরে বিভিন্ন প্রকার পোশাক বিক্রি হয় প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার। বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে ইলিশের বেচাকেনা হয় আরও প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। নববর্ষের দিন মিষ্টির দোকানগুলোতে বিক্রির পরিমাণ চার হাজার কোটি টাকার বেশি। পোশাক বিক্রি হয় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার। সব মিলিয়ে বাংলা নববর্ষকে ঘিরে অর্থনীতির পরিমাণ ৪০ থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতিবছরই এটার আকার বাড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলা নববর্ষকে ঘিরে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রতিবারই কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এ সময় বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে তাদের এটিএম কার্ড, ক্রেডিট কার্ড ও ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থের জোগান রাখে। এ সময় মোবাইল ব্যাংকিং ও পোস্ট অফিসের মাধ্যমেও লেনদেন বাড়ে। তবে গত দুই বছর পহেলা বৈশাখকে সারাদেশে ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য হয়েছে।
পহেলা বৈশাখের অর্থনীতি বিষয়ক তথ্য পাওয়া যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষের প্রবন্ধে। তিনি লেখেন, নববর্ষ এখন শুধু ঐতিহ্যিক-সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গই নয় আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়েরও অন্যতম শক্তি-উৎস। সাংস্কৃতিক পরিচয়, জাতিসত্তার ঠিকানা এবং প্রতিবাদের শক্তি-উৎস হিসেবে নববর্ষের যেমন ভূমিকা রয়েছে, তেমনি রয়েছে তার অর্থনৈতিক গুরুত্ব। বাঙালির অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে নববর্ষের রয়েছে একটি নিবিড় সংযোগ।
অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ আরো লেখেন, দূর অতীতে নববর্ষের প্রথম দিন থেকেই বাঙালির অর্থনৈতিক জীবনের বার্ষিক নতুন পথচলা শুরু হতো-এখনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রচলিত আছে এই ঐতিহ্য। সাংবাৎসরিক হিসাব-নিকাশ চলে এই দিনে, ব্যবসা-বাণিজ্যের লাভ-ক্ষতি মিলিয়ে দেখা হয় পহেলা বৈশাখে। ব্যবসায়ীদের কাছে এ অনুষ্ঠান ‘হালখাতা’ নামে পরিচিত। ‘হালখাতা’ নতুন বাংলা বছরের হিসাব পাকাপাকিভাবে টুকে রাখার জন্য ব্যবসায়ীদের নতুন হিসাব খোলার এক আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ। হালখাতায় কাজ-কারবারের লেনদেন, বাকি-বকেয়া, জমা-খরচ সবকিছুর হিসাব লিখে রাখার ব্যবস্থা হয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির গবেষক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলা নববর্ষের বড় অংশ ঘিরেই রয়েছে অর্থনীতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বৈশাখী অর্থনীতির বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি। গ্রামীণমেলা ও গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য যত বেশি বিক্রি হবে, ততই গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হবে। পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়া এখন আর নাগরিক মধ্যবিত্তের রীতি নয়। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও পান্তা-ইলিশকে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অনুষঙ্গ হিসেবে নিয়েছেন। তাই এখন বৈশাখ ঘনিয়ে এলেই বাজারে ইলিশের দাম বাড়তে থাকে। অসাধু ব্যবসায়ীরা গড়ে তোলে অবৈধ ইলিশের মজুদ। উৎসবকে ঘিরে এ অনৈতিক বাণিজ্য বন্ধে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, বাঙালির জীবনে বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখকে ঘিরে যে উৎসব আয়োজন সেটা অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। প্রতিবছর নববর্ষকে ঘিরে যে ধরনের পণ্যের কেনাবেচা, উৎপাদন এবং উৎসবের আয়োজন হয় তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট হচ্ছে এগুলো মূলত দেশীয় পণ্য। একইসঙ্গে দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশের জন্য আয়োজন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মনজু আরা বেগম লেখেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে দেশজুড়ে ২৪৫ থেকে ২৭০টি মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এসব মেলায় প্রচুর কেনাবেচা হয়। যা দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান বলেন, বাংলা নববর্ষ মানে বৈশাখীমেলা, উৎসবের আয়োজন, হালখাতা তৈরি, মিষ্টান্ন বিতরণ, ভালো ভালো খাবার পরিবেশন। এ সবই বাংলার লোকায়ত ঐতিহ্যের অংশ। নববর্ষ বাংলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও বড় প্রভাব ফেলে।
আনন্দবাজার/শহক









