কৃষি সমৃদ্ধ উত্তরজনপদের বিভাগীয় নগরী রংপুরে হাতছানি দিচ্ছে ভারী শিল্পের। পাইপলাইনের মাধ্যমে জেলায় প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। আজ থেকে এক দশক আগে ২০১১ সালে রংপুর সফরে এসে সেই দাবি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকেই রংপুর বিভাগের তিনটি জায়গায় পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরপর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে একনেক সভায় ‘রংপুর, নীলফামারী, পীরগঞ্জ শহর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় গ্যাস বিতরণ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সেই প্রকল্প ঘিরে এখন প্রাকৃতিক গ্যাস পেতে স্বপ্নে বিভোর রংপুরবাসী।
উত্তরাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের কাজ ইতোমধ্যে ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। যদিও এ গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনটির প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) ২০২১ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য ছিল। পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বর করা হয়। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও করোনার কারণে আগামী ২০২৩ সালের জুনের আগে প্রকল্পটির কাজ শেষ করা সম্ভব না হলেও ইতোমধ্যে গ্যাস লাইন স্থাপন কাজ শুরু হয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি হওয়ায় অনেকটাই হতাশ স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা। যাদের মধ্যে অনেকে রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত প্লট কিনে গ্যাসের জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় প্রাচীন এ জেলায় ভারী শিল্প ও কলকারখানা গড়ে ওঠেনি। তবে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে এ অঞ্চলে শিল্প বিপ্লব ঘটবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের পাশ দিয়ে গ্যাস সংযোগ সম্প্রসারণে পাইনলাইন স্থাপনের জন্য জমি চিহ্নিতকরণের কাজ চলছে। প্রকল্পের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই উপজেলার ভবানীপুর ও বলদিপুকুর এলাকায়ও দেখা গেছে গ্যাস সরবরাহ পাইপলাইন স্থাপনের কর্মযজ্ঞ।
এরমধ্যে গতকাল বুধবার সকালে ভবানীপুর অংশে গ্যাস লাইন সংযোগ স্থাপন কাজের উদ্বোধন করেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (অপারেশন) জাহাঙ্গীর আলম। এ সময় পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) প্রকৌশলী আলী ইকবাল মো. নূরুল্লাহ, মিঠাপুকুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাকির হোসেন সরকার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমাতুজ জোহরা উপস্থিত ছিলেন। অতিথিরা বলেন, উত্তরবঙ্গের মানুষ অনেক দিন পর আরেকটি স্বপ্ন পূরণের পথে একধাপ এগিয়ে গেল।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের আওতাধীন পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (পিজিসিএল)। বগুড়া থেকে পীরগঞ্জ হয়ে রংপুর ও সৈয়দপুর পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের কাজ শুরু হয়েছে ২০১৮ সালের অক্টোবরে। এক হাজার ৩৬৮ কোটি ৫২ লাখ ব্যয় হবে এ প্রকল্পে। জিটিসিএল এখানে ১০ কোটি তিন লাখ টাকা খরচ করবে। বাকি টাকা দেবে সরকার।
প্রকল্পের আওতায় (বগুড়া থেকে রংপুর হয়ে সৈয়দপুর) ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ১৫০ কিলোমিটার সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপন কাজ চলছে। ১০০ এমএমএসসিএফডি সিজিএস (সিটি গেট স্টেশন) ৫০ (রংপুর) এবং ২০ (পীরগঞ্জ) এমএমএসসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন টিবিএস (টাউন বর্ডার স্টেশন) স্থাপন করা হবে। এর জন্য ৩০৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
রংপুরবাসীর স্বপ্নের এই সঞ্চালন পাইপ লাইনের পাশপাশি বিতরণ লাইন নির্মাণের পৃথক একটি প্রকল্পও হাতে নিয়েছে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। প্রকল্পের আওতায় ১০০ কিলোমিটার থাকবে বিতরণ লাইন। এর মধ্যে রংপুর শহরে ৪৪ কিলোমিটার, পীরগঞ্জে ১০ কিলোমিটার এবং নীলফামারী ও উত্তরা ইপিজেড এলাকায় ৪৬ কিলোমিটার অংশ রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক খন্দকার আরিফুল ইসলাম জানান, কোভিড-১৯ এর কারণে মালামাল শিপমেন্টে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। মাঠে হয়তো দৃশ্যমান না হলেও পাইপ আনাটাও বড় একটি কাজ। যা সফলভাবে শেষ হয়েছে। ইতোমধ্যে বগুড়া থেকে রংপুর হয়ে সৈয়দপুর পর্যন্ত গৃহীত প্রকল্পের কাজ ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে। আগামী বছরের জুন নাগাদ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে তিনি আশাবাদী। তবে প্রাথমিক অবস্থায় কারা কারা গ্যাস পাবেন এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহে পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শুরু হওয়ায় খুশি রংপুরবাসী। স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাসহ ব্যবসায়ী মহলের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন ছিল এ অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের। এজন্য বহুবার হরতাল, মিটিং মিছিলও হয়েছে। এখন সবার দাবি, বারবার প্রকল্পের মেয়াদ না বাড়িয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ কার্যক্রম শুরু করা হোক।
রংপুর চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী টিটু বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে। দারিদ্র্যতার বৈষম্য দূর হবে। পীরগঞ্জ থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত মহাসড়কের পাশে অনেক দেশি-বিদেশি শিল্পোদ্যোক্তা প্লট ক্রয় করে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন।
রংপুর মেট্রাপলিটন চেম্বারের সভাপতি রেজাউল ইসলাম মিলন বলেন, গ্যাস এলেই এ অঞ্চলে শিল্পবিপ্লব ঘটবে। এছাড়া প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ রংপুরের গঙ্গাচড়ার মহিপুর এলাকায় এক হাজার একর জমির ওপর বিসিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ও সব উপজেলার শিল্পকারখানায় পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে আর্থ সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে। তবে কবে নাগাদ রংপুরে গ্যাস আসবে তা বলা যাচ্ছে না। কারণ গ্যাস সরবরাহের মূল কাজ এখনও শুরু হয়নি। আমরা চাই দ্রুত রংপুরে গ্যাস সরবরাহ করা হোক।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, রংপুর এবং নীলফামারী ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হওয়া সত্ত্বেও প্রাকৃতিক গ্যাসপ্রাপ্তির সুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে বর্তমানে জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার ১৭৬ এমএমসিএফডি, যা মোট প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। দেশের মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় গ্যাস ব্যবহারের এই বৈষম্য দূরীকরণ এবং শিল্পের উন্নয়নের জন্য রংপুর ও নীলফামারী জেলায় প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের জন্য জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক স্থাপন করা প্রয়োজন।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আবদুল ওয়াহাব ভূঞা জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে, এখন হস্তান্তর প্রক্রিয়া বাকি। আগামী বছরের মধ্যে রংপুরে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।









