আগামী ৫০ বছরের মধ্যেই বিলীন হবে পৃথিবীর ফুসফুসখ্যাত আমাজন অরণ্য:
-অধ্যাপক জেম্স্ এল্কক, পরিবেশ বিজ্ঞানী, পেনিসিলভেনিয়া স্টেট ইউনির্ভাসিটি
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপ আর আমেরিকা জুড়ে বইতে থাকা তাপপ্রবাহ বিশ্বকে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ফেলছে। উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে প্রাণহানি। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে তাপদাহ থেকে শুরু হওয়া দাবানল। যা বনভূমির পর বনভূমি গ্রাস করছে তাপদাহে পুড়তে থাকা দেশগুলোতে। এতে বনভূমি যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি দাবানলের ধোঁয়া থেকে বিষাক্ত কার্বন-ডাই অক্সাইড মিশে যাচ্ছে বায়ুমণ্ডলে। যা পরিবেশের বিপর্যয় সৃষ্টি করছে।
মূলত, এভাবে তাপদাহ আর দাবানলের যৌথ বিপর্যয় বিশ্বঅর্থনীতির জন্য বড় বিপদ ডেকে আনছে। এমনিতেই করোনাভাইরাস মহামারি আর ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। তার ওপর এই নতুন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় অর্থনীতিতে গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে দেখে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ভয়াবহ এই বিপর্যয়ে পৃথিবীতে প্রাণ ধারনের স্বাভাবিক পরিবেশ যেমন ভেঙে পড়ছে, তেমনি কৃষি আর শিল্পখাতের উৎপাদনে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য গবেষণা সংস্থা মুডির তথ্য তুলে ধরে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন বলছে, বিগত ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় যে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতে শুধু অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতিই ছিল ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। যা দেশটিতে ২০০৯ সালের দাবানলের রেকর্ড ক্ষয়ক্ষতিও ছাড়িয়ে গেছে।
মুডির অর্থনীতিবিদ ক্যাটরিনা ইলের মতে, সেই দাবানলে অস্ট্রেলিয়ার মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতি দেশটির ভোক্তাদের আস্থাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর দাবানলে সৃষ্ট ধোঁয়ায় দেশটির নগরাঞ্চলের জনজীবনকে যেমন বিপর্যস্ত করেছে, তেমনি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কৃষি ও পর্যটনখাতে ব্যাপক ধস নামিয়েছে। ক্যাটরিনা ইল আরও বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলে অতীতের তুলনায় প্রাণহানি কমলেও সম্পদ আর অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে।
বিশ্বব্যাপী তাপদাহের ভয়াবহতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। যার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত গেল বছরে দেখা গেছে প্রবল শীত ও তুষারপাতে অভ্যস্ত দেশ কানাডাতে। সেখানে স্মরণকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের পোর্টল্যান্ড এয়ারপোর্টেও রেকর্ড তাপমাত্রা ৪৬ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছে। অস্বাভাবিক সেই তাপদাহে দেশ দুটিতে শত শত প্রাণহানী ঘটছে।
তবে গেল বছরের দাবদাহ বা হিটডোম শুধু কানাডা বা আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছোবল দিয়েছে ইউরোপ, অষ্ট্রেলিয়া, ভারত, পাকিস্তানসহ আরও বহু দেশ ও অঞ্চলে। পাশাপাশি হিমশিতল মেরু অঞ্চলের তাপমাত্রাও অনেক আগে থেকে বেড়েছে উদ্বেগজনকহারে। যে কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বেড়ে চলেছে। গত ২০২০ সালে দক্ষিণ মেরুর অ্যান্টার্কটিকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠে যায়। ক্রমাগত এসব বিপর্যয়ে টিকতে না পেরে প্রাণিজগতের বহু প্রজাতি এখন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
গত দুই বছরের মতো এবারও তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে চীন, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বড় অংশে। বেশ কিছু শহরকে অসহনীয় তাপমাত্রা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। চীনের অন্তত ৮৬টি শহরে তাপসংক্রান্ত সতর্কতা জারি করতে হয়েছে। অসহনীয় তাপমাত্রার জন্য বয়স্কদের বিশেষভাবে সতর্ক করতে হয়েছে বড় বড় শহরগুলোতে। চীনের কিছু প্রদেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রিতে পৌঁছার আভাস আগেই দিয়েছিল আবহাওয়া বিভাগ। কিছু প্রদেশে সরকার আগেই বনে আগুন লাগতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছিল। প্রায় দেড়শ বছরের রেকর্ড ভেঙে সাংহাইয়ের তাপমাত্রা ৪০ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়।
অন্যদিকে, তীব্র তাপদাহে পুড়তে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, কলোরাডো, ওকলাহোমা, আরকানসাসসহ কয়েকটি শহর। যেখানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে যায়। আবার ইউরোপে যে তাপদাহ শুরু হয় মাসের শুরুতে মাঝামাঝি গিয়ে স্পেনকে দ্বিতীয় দফায় তাপপ্রবাহের মুখে পড়তে হয়। স্পেনের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক শহরে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরিয়ে যেতে পারে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে সেই আশঙ্কার মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে দাবানল। গোটা ইউরোপ জুড়েই তাপদাহের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া দাবানল বনের পর বন, এমনকি বসতবাড়িও পুড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি গোটা ইউরোপের সেই ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দাবানলের কারণে ইউরোপে ঠিক কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা না গেলেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি যে পড়তে হয়েছে তা নিশ্চিত।
গত দুদিন ধরে গোটা ইউরোপ জুড়ে তাপমাত্রা কিছুটা কমে আসায় দাবানল কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে আলবেনিয়ায় ছড়িয়ে পড়া দাবানলে প্রায় ৩০ হাজার একর বনাঞ্চল পুড়ে গেছে। যদিও এখানকার প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দাবানলের ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে, ঝুঁকি বেড়েছে আমেরিকায়। অন্তত ১০ কোটি মার্কিনি দাবানলের ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সমভূমি, মিসিসিপি উপত্যকা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল তাপদাহে বিপর্যস্ত হতে পারে। অবশ্য, ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে গত ২২ জুলাই থেকে শুরু হওয়া দাবানল আরও বেশি এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার দমকল বিভাগ বলেছে, দাবানলে ১৫ হাজার ৬০৩ একর জমির গাছপালা ও স্থাপনা পুড়ে গেছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে ওই এলাকার ৬ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদে সরানো হয়েছে। ১০টি স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে। মারিপোসা কাউন্টিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। দমকল বিভাগ বলেছে, দাবানলের কারণে ঘরবাড়ি ও ব্যবসায়িক অবকাঠামো মিলিয়ে আরও ৩ হাজার ২৭১টি অবকাঠামো হুমকির মধ্যে আছে।
চলমান করোনাভাইরাসের তাণ্ডবের মধ্যেই বিশ্বউষ্ণায়নের নগ্নরূপ সভ্যতাকে আরেক মহাবিপদের সংকেত দিচ্ছে। মেরু থেকে শুরু করে শীতপ্রধান অঞ্চলে ‘হামলে’ পড়ছে ভয়াবহ তাপদাহ (হিটওয়েব) বা হিটডোম। সেই সঙ্গে অনেক শান্ত অঞ্চলেও দেখা দিচ্ছে ঘন ঘন প্রবলমাত্রার ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডব। চরিত্র বাদলাচ্ছে ভূমিকম্পও। এসব বিপর্যয়ে ইতোমধ্যে মৃত্যু অথবা উদ্বাস্তুর সংখ্যা রেকর্ড ভাঙছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী প্রবলমাত্রার তাপপ্রবাহ আর দাবানলের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি ঘটছে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক মন্দা শুরু হয়েছে। এতে দেশে দেশে মুদ্রাস্ফীতি যেমন বেড়েছে তেমনি ক্রয়ক্ষমতা হারাচ্ছেন কোটি কোটি মানুষ। এমন পরিস্থিতির মধ্যে দাবানলের তাণ্ডব বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও নাজুক অবস্থায় ফেলে দিতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশের বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। যাতে তাপদাহ-দাবানল চক্রবৃদ্ধিহারে বেড়ে যেতে পারে।
এর ওপর গত কয়েক দশক ধরেই মানবজাতির চাহিদার ২০ শতাংশ অক্সিজেন সরবরাহ করা পৃথিবীর ফুসফুসখ্যাত আমাজন বন উজার করার আগ্রাসন চলছে। পেনিসিলভেনিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক জেম্স্ এল্ককের আশঙ্কা আমাজান অরণ্য আগামী ৫০ বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, শিল্প, চাষাবাদ আর বিশ্ববাজারে মাংসের যোগান দিতে ব্রাজিল প্রেসিডেন্ট আমাজনের বিপদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন।
স্ট্যান্ড ডট আর্থ নামের একটি সাপ্লাই চেইন রিসার্চ ফার্মের গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী জুতা আর মানিব্যাগ-হ্যান্ডব্যাগ সরবরাহ করতে যে কোটি কোটি গবাদি পশুর চামড়ার দরকার পড়ে, সেসব পশু লালন পালন করা যেতে পারে আমাজন অরণ্যেই। আর এজন্য পৃথিবীর ফুসফুস পুড়িয়ে দিয়ে গবাদি পালনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত গবেষণাভিত্তিক সেই প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ভোক্তাদের মানিব্যাগ, হ্যান্ডব্যাগ ও জুতা সরবরাহ অব্যাহত রাখতে, বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন শিল্পকে ২০২৫ সালের মধ্যে ফি বছর ৪৩ কোটি গরু জবাই করতে হবে।
গবেষণায় প্রমাণিত, বিশ্বের ৮৪টি ফ্যাশন কোম্পানির মধ্যে ২৩টিরই আমাজন বন উজাড়ের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নীতি রয়েছে। এভাবে বন উজার করায় পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে তাপপ্রবাহ যদি বাড়তে থাকে, একই হারে যদি দাবানলের প্রকোপ ভয়াবহ হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় বিপদ হবে।
আনন্দবাজার/শহক









