সিলেটে ভারী বর্ষণ শুরু হয় গেল সপ্তাহের মঙ্গলবার রাত থেকে। পরদিন থেকেই নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যেতে শুরু করে। সাতদিন ধরে বন্যায় প্লাবিত সিলেটের সদর উপজেলাসহ, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ ও জৈন্তাপুরে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গত সোমবার নতুন করে প্লাবিত হয়েছে দক্ষিণ সুরমা ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা। বর্তমানে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি।
বন্যাকবলিত উপজেলাগুলোর রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, কমিউনিটি ক্লিনিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন মানুষ। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট। ভারী বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি ঢলে জেলার ১৩ উপজেলার ৮টি-ই এখন ভয়াবহ বন্যায় কবলিত। বাকি ৫ উপজেলায় আংশিক পানি ঢুকেছে। বিভাগীয় নগরীর প্রায় অর্ধেক রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। পানি উঠেছে বাসাবাড়িতে।
এ অবস্থায় বিপর্যস্ত জনজীবনে ভয়াবহ দুর্ভোগ নিয়ে এসেছে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা। দক্ষিণ সুরমা ও নগরীর শাহজালাল উপশহরসহ কয়েকটি এলাকার বিদ্যুতের সাবস্টেশন পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে এসব এলাকায় গত মঙ্গলবার থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। গতকাল বুধবার স্টেশনের চারপাশে বালির বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল করার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আজ থেকে দেড় যুগ আগে ২০০৪ সালে এমন বন্যার কবলে পড়তে হয়েছিল সিলেটবাসীকে। এবারের বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা সেই স্মৃতিই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। গত দেড় যুগের রেকর্ড বন্যায় নিম্নাঞ্চলের পাশাপাশি ডুবেছে বিভাগীয় শহরের অর্ধেক রাস্তাঘাট। বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে নগরজীবন বিপর্যস্ত। বিশেষ করে সুরমার তীরবর্তী এক কিলোমিটারের মধ্যের সব বাসাবাড়িতে ঢেউ খেলছে পানি।
শাহজালাল উপশহর, সোবহানীঘাট, কালীঘাট, ছড়ারপাড়, শেখঘাট, তালতলা, মাছিমপুর, পাঠানটুলা, লন্ডনি রোড, সাগরদিঘির পাড়, সুবিদবাজার, শিবগঞ্জ, মেজরটিলা, মদিনা মার্কেট, দক্ষিণ সুরমার বঙ্গবীর রোড, মোমিনখলাসহ বিভিন্ন এলাকা এখন বন্যাকবলিত। উজানে বৃষ্টি না থামলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতির ঘটনায় সিলেটে ছুটে এসেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের এমপি ড. এ কে আব্দুল মোমেন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান। গতকাল বুধবার দিনভর তারা সিলেটের বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন এবং বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। সিলেটের বানভাসিদের জন্য নগদ ২৫ লাখ টাকা, দুশ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) দৈনিক আনন্দবাজারকে জানায়, সিলেটে চতুর্থ দিনের মতো সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বুধবার কানাইঘাট পয়েন্টে পানির প্রবাহ ৬ সেন্টিমিটার কমলেও সিলেটে বেড়েছে ২ সেন্টিমিটার। নগরে ও গ্রামে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রমতে, বন্যার্তদের জন্য ২৭৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৮টিতে মানুষ অবস্থান করছেন। সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্রমতে, মহানগরীতে এ পর্যন্ত ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টিতে বন্যার্তরা আশ্রয় নিয়েছেন। এসব কেন্দ্রে ১২৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। প্রতি প্যাকেটে চিড়া ৫০০ গ্রাম ও গুড় ২৫০ গ্রাম। এছাড়াও বিতরণ করা হচ্ছে রান্না করা খাবার। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের সমন্বয়ে বন্যার্তদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।
এদিকে, সিলেট বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ার খবর পেয়েই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে সিলেট এসে পৌঁছেন। দিনভর তারা মহানগরীসহ সিলেটের বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন এবং বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সুপারিশে বন্যাকবলিত উপজেলাগুলোর বন্যার্ত মানুষের মাঝে নগদ টাকা, চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দিয়েছে ত্রাণ মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা সিলেট সদর উপজেলার বন্যার্তদের জন্য আলাদাভাবে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণসমাগ্রী ইতোমধ্যে সিলেট এসে পৌঁছেছে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এসব নগদ অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ শুরু হয়েছে।
এদিকে, ভারতের মেঘালয় রাজ্য আরও ভারি বৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছে আবহওয়া অধিদপ্তর। বিশেষ করে শিলং ও ডাউকিতে আরও কয়েকদিন ভারী বৃষ্টিপাত হবে। এছাড়া সিলেটেও আগামী কয়েকদিন ভারী বৃষ্টি হতে পারে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর সিলেটের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী দৈনিক আনন্দাবাজারকে জানান, আগামী ২৩ জুন পর্যন্ত সিলেটে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করা যাচ্ছে।
আনন্দবাজার/শহক









