দীর্ঘ চার দশক পরে অবশেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের চরবাসীর বিদ্যুৎ না পাওয়ার কষ্ট লাঘব হতে যাচ্ছে। সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে এইচডিডি প্রযুক্তিতে গেশনা নদীর তলদেশ দিয়ে চরে বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবি) চুক্তিবদ্ধ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ড্রিলটেক ইন্টারন্যাশনাল।
স্থানীয় বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের দাবি, চুক্তির সময়সীমা ১২০ দিন হলেও নদীর উভয় পাড়ে ওভারহেড সংযোগের কাজ সম্পন্ন থাকায় আগামী এক মাসের মধ্যে-ই চরসোনারামপুরে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান সম্ভব হবে। এদিকে বিদ্যুৎ সংযোগের খবরে যেমন চরবাসীর মাঝে বইছে আনন্দের বন্যা।
সরেজমিনে চরসোনারামপুরে গিয়ে জানা যায়, হাতের কাছে বিদ্যুতের এতো আয়োজন-সমারোহ থাকলেও প্রযুক্তিগত ও যথাযথ উদ্যোগের অভাবে চরবাসী পায়নি বিদ্যুতের সুবিধা। এ নিয়ে চরবাসীর মাঝে ছিল চাপা কষ্ট ও ক্ষোভ। বর্তমান সরকারের ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ কর্মসূচির আওতায় ও মুজিব জন্মশতবর্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে চরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্যোগ নেয় বিদ্যুৎ বিভাগ।
এর আওতায় চরে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য চরের চারপাশে বিদ্যুতের খুঁটি ও তাতে তার টানানোর কাজ শুরু করে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগ। আশায় বুক বাঁধে চরবাসী। কিন্ত সাবমেরিন ক্যাবল না আসায় প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিদ্যুতের সংযোগ পায়নি তারা।
এদিকে চরে বিদ্যুৎ সংযোগ না দিলেও ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে আশুগঞ্জ উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করেন। এ খবরে চরে বসবাসকারী জনগণ চরমভাবে মর্মাহত হন। তাদের মাঝে তৈরি হয় চরম হতাশা। তারা মেনে নেয় যেহেতু চরসোনারামপুর বাদ দিয়ে-ই উপজেলাকে ‘শতভাগ’ বিদ্যুতায়িত উপজেলা ঘোষণা করা হয়েছে তাই কোনো দিন আর বিদ্যুৎ সংযোগ মিলবে না।
এদিকে একাধিকবার সাবমেরিন ক্যাবল দরপত্র জটিলতায় স্থানীয় বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগও কোনো কথা বলছিল না। নানান জটিলতা কাটিয়ে চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি দরপত্র প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলে শুরু হয় চরে বিদ্যুৎ সংযোগের দৃশ্যমান কাজ।
স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য মতে, তিন কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সিঙ্গাপুরের জয়েন্ট ভেনচার দেশীয় ড্রিলটেক ইন্টারন্যাশনাল নামক একটি প্রতিষ্ঠান। এইচডিডি টেকনোলজি পদ্ধতিতে মেঘনা নদীর তলদেশ দিয়ে ভূমি সমতল থেকে ৭০-৭৫ ফুট নিচ দিয়ে ১১ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ হবে। ইতোমধ্যে সাবমেরিন ক্যাবলসহ প্রয়োজনীয় মালামাল আসতে শুরু করেছে। প্রাথমিক ভাবে এ সংযোগের আওতায় চরে ৫-৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে এবং পরবর্তীতে চাহিদার ভিত্তিতে বাড়ানো হবে। এদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চরে বিদ্যুৎ সংযোগের খবরে উৎফুল্ল চরবাসী।
চরের বাসিন্দা স্থানীয় হাজি আব্দুল জলিল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র উজ্জ্বল চন্দ্র সরকার বলেন, খুব কষ্ট করে পড়াশুনা করা লাগে। আলোর অভাবে রাতে পড়া যায় না। তাছাড়া রাতের বেলায় অন্ধকারের চলাচলও সম্ভব হয় না। দিনের বেলা গরমকালে ফ্যান না থাকায় অনেক কষ্ট হয়। বিদ্যুতের সুবিধা পেলে এসব কষ্ট আর থাকবে না।
এব্যাপারে আশুগঞ্জ সদর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ও চরের বাসিন্দা ইব্রাহিম মোল্লা বলেন, চরে তিনি ছোট পরিসরে একটি বাগানবাড়ি করেছেন। প্রতিদিন এখানে স্থানীয় লোকজন ঘুরতে গেলে বসেন, চা-নাশতা খান। বিদ্যুৎ সংযোগ পাবার সঙ্গে তিনি একটি ডক এবং উন্নত মানের পিকনিক স্পট ও আবাসিক কটেজ করবেন।
চর পালকী দোকানের মালিক কালাম মিয়া বলেন, শুকনা মৌসুমে এমনিতে প্রতিদিন শত শত স্থানীয় পর্যটক চরে ঘুরতে আসেন। বিদ্যুৎ সংযোগ পেলে দৃষ্টি নন্দন কিছু করা হলে পর্যটকও আসবে স্থানীয় লোকজনের অর্থনৈতিক উন্নতি হবে।
এব্যাপারে চরে বিদ্যুৎ প্রদান প্রকল্পে দায়িত্বে নিয়োজিত সহকারি প্রকৌশলী জাফর আহমেদ বলেন, সাবমেরিন ক্যাবলসহ মালামাল আসতে শুরু করেছে। খুব শিগগিরই চরবাসীর মনের আশা পূরণ হবে।
এব্যাপারে আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সুলতান মাহামুদ বলেন, দরপত্রের শর্ত মোতাবক আগামী ১২০ দিনের মধ্যে চরে বিদ্যুৎ সংযোগের যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষে করার কথা। তবে পূর্বে অনেক কাজ সম্পন্ন থাকায় সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী এক মাসের মধ্যে-ই চরে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্ভব।
ড্রিলটেক ইন্টারন্যাশনাল এর প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানা বলেন, দরপত্রের চুক্তিমোতাবেক আগামী মে মাসের (১২০ দিন) মধ্যে চরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার কথা থাকলেও আগামী এক মাসের মধ্যে-ই চরে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্ভব প্রদান সম্ভব হবে।
আনন্দবাজার/শহক









