দেশে দ্রুত ফুরিয়ে আসছে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ। জ্বালানি নিরাপত্তায় তাই বিকল্প পথে হাঁটতে হচ্ছে দেশকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাসের নতুন সংযোগ সীমিত করছে সরকার। গত প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এ সময়ের মধ্যে মানুষের আয় যেমন বেড়েছে, তেমনি জীবনযাত্রায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। বিশেষ করে জ্বালানির চাহিদা দিন দিনই বেড়েছে। এর মধ্যে রান্নার কাজে বিকল্প হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)।
বর্তমানে গ্রাম কিংবা শহরে পাল্লা দিয়ে রান্নার কাজে বাড়ছে এলপিজির ব্যবহার। দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পাশাপাশি চাহিদা বাড়ছে ব্যাপকহারে। শুধু বাসাবাড়িই নয় এখন হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে ব্যাপকহারে ব্যবহার হচ্ছে। ১৯৯৯ সালে ব্যবহার শুরু হওয়া এলপি গ্যাসের বাজারও বড় হয়েছে। বহু কোম্পানি এসেছে এই বাজারে। গেল দুই দশকের বেশি সময় ধরে রান্নার কাজে এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। শুধু শহরেই যে চাহিদা বা জনপ্রিয়তা বেড়েছে তা নয়; বরং গ্রামীণ এলাকাতেও সমান জনপ্রিয় এখন এলপিজি।
গ্রামে গ্রামে এখন জ্বালানি হিসেবে লাকড়ির ব্যবহার কমে এসেছে। ধোঁয়া সৃষ্টিকারী জ্বালানি কাঠ, বাঁশ কিংবা পাটখড়ির ব্যবহার আগে যেভাবে হতো এখন আর ব্যবহার হচ্ছে না। মোটামুটি সচ্ছল প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এলপি গ্যাসের ব্যবহার হচ্ছে। এক হিসেবে শিল্প ও আবাসিক মিলিয়ে বছরে ১২ লাখ টনের বেশি এলপিজি ব্যবহার হচ্ছে। এলপি গ্যাস বাজারে নিয়ে আসা কোম্পানিগুলোর মধ্যে বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ওমেরা, সেনা, যমুনা, টোটাল, ওরিয়ন, জি-গ্যাস, নাভানা অন্যতম। প্রথম বাণিজ্যিকভাবে এলপি গ্যাস বাজারে আনে বসুন্ধরা গ্রুপ। ২৫ শতাংশ মার্কেট শেয়ার নিয়ে শীর্ষে বসুন্ধরা এলপি গ্যাস। দ্বিতীয় অবস্থানে ওমেরা গ্রুপ।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) তথ্য বলছে, দেশে এলপিজি ব্যবসার জন্য বর্তমানে লাইসেন্সধারী কোম্পানির সংখ্যা মোট ৫৬টি। এর মধ্যে ২৯টি কোম্পানি বাজারে সক্রিয়। এর মধ্যে ২০টি কোম্পানি সরাসরি এলপিজি আমদানি করছে। এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা।
সূত্রমতে, গত বছর ১২ লাখ টন এলপিজি সরবরাহ করা হয় বাজারে। এর মধ্যে ৯৮ শতাংশের বেশি সরবরাহ করে বেসরকারি খাত। দেশে ১২ কেজি, ৩০ কেজি, ৪৫ কেজিসহ বিভিন্ন মাপের সিলিন্ডারে এলপি গ্যাস বিক্রি হয়। তবে বাসাবাড়িতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ১২ কেজি সিলিন্ডার। অন্যদিকে, বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হয় ৩০-৪৫ কেজির সিলিন্ডার।
বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম বাড়তে থাকায় চলতি বছরের জুনে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ৮৪২ টাকা। গেল নভেম্বর মাসে এলপিজি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৩১৩ টাকায়। তবে চলতি ডিসেম্বরে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮৫ টাকা কমে এক হাজার ২২৮ টাকায় নেমেছে। টানা পাঁচ মাস বাড়তে থাকা এলপিজির দাম চলতি মাসে কমানো হলেও খুচরা বাজারে এখনো কমেনি।
সূত্রমতে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ভোক্তা পর্যায়ে গত ২ ডিসেম্বর ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৩১৩ টাকা থেকে কমিয়ে এক হাজার ২২৮ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। তবে দাম করার এ প্রভাব খুচরা পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না। এলপিজির দাম কমাননি ব্যবসায়ীরা। তারা আগের দামেই বিক্রি করছেন।
অন্যদিকে, নতুন ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে বর্তমানে একটি ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে দুই হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায়। আর ফের গ্যাস ভরতে বা রিফিল করতে লাগে কমবেশি এক হাজার ২৫০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা। এ কারণে নতুন ব্যবহারকারীদের পড়তে হয়েছে বেশি বিপাকে। তাদের দ্বিগুণ দাম পরিশোধ করে এলপি গ্যাস কিনতে হচ্ছে।
বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটিরও বেশি পরিবার এলপিজি ব্যবহার করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে রান্নার কাজের পাশাপাশি শিল্প, বাণিজ্য ও যানবাহন খাতেও এলপি গ্যাসের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে।
এলপিজি ব্যবহারকারীরা বলছেন, মাঝারি আকারের একটি পরিবারে (পাঁচ-ছয়জনের) ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার প্রয়োজন হয় দুটি। এজন্য তাদের গুনতে হয় প্রায় দুই হাজার ৬০০ টাকা। আর ছোট পরিবারে (তিন-চারজনের) রান্নার জন্য মাসে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার হলেই চলে যায়। তাদের জন্য বর্তমানে গুনতে হচ্ছে প্রায় এক হাজার ৩০০ টাকা।
আনন্দবাজার/শহক









