- বিশেষ দিনে বিক্রির জন্য বিশেষ কায়দায় ফুল সংরক্ষণ
- পাঁচ টাকার গোলাপ ২০-৫০ টাকায় বিক্রির আশা
- করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধসহ অনুষ্ঠানে বিধি-নিষেধ থাকায় শঙ্কায় ফুলচাষিরা
বাগান মালিক যেন কানে কানে বলছেন ‘হে গোলাপ ভালোবাসা দিবসের আগে তুমি ফুটিও না।’ মালিকের এই আকুতি গোলাপ শুনুক আর নাই শুনুক, পহেলা ফাগুনের আগে গোলাপ যেন ফুটে ঝরে না যায় সেজন্য ফুটন্ত কুঁড়িতে পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক ধরণের বিশেষ ক্যাপ। এভাবে একমাস পর্যন্ত গোলাপ সংরক্ষণ করা যায়
দরজায় কড়া নাড়ছে পহেলা ফাগুন, বসন্তের প্রথম দিন। এদিনেই আবার বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। একে অপরের প্রতি আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য বাড়ছে অকুতি। মাঝখানে আর কয়েকঘণ্টা। বসন্তের প্রথম দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি ঘিরে প্রস্তুতি চলছে ফুলবাগানেও। প্রেম-ভালোবাসার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে একাকার হয়ে আছে ফুল। সেই সঙ্গে ফুলের ছোঁয়া, ফুলেল ভালোবাসা। ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলের বিভাগীয় জেলা রংপুরের ফুল চাষিরা বাগান থেকে ফুল সংগ্রহ করছেন। বাজারে সরবরাহ করতে প্রস্তুতিও শেষ করেছেন।
প্রতিবছর বেশি আয় করার আশায় বিশেষ এই দিন ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি থাকে বাগান মালিকদের। নানা কৌশলে ফুল সংরক্ষণ করেন তারা। পহেলা ফাগুন, বিশ্ব ভালোবাসা ছাড়াও একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পর্যন্ত ফুল বেচাকেনা চলে। তবে এবারের ফুলবাণিজ্য নিয়ে তাদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধসহ বিভিন্ন ধরনের সভা-সমাবেশ-অনুষ্ঠানে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এতে ফুলচাষিসহ ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
তারপরও রংপুরের সব গোলাপ যেন তুলে রাখা হয়েছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের জন্যই। কয়েকদিন আগে থেকেই নগরীর কোথাও গোলাপের দেখা মিলছিল না। ফুল ব্যবসায়ীরা জানান, বাগান মালিকরা ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে গোলাপ সংগ্রহ বন্ধ করে দিয়েছেন। বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে বাগানে ওইদিনের জন্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে গোলাপ। কারণ হিসেবে তারা জানান, অন্যান্য সময়ে যেখানে প্রতিটি গোলাপ পাঁচ টাকায় বিক্রি হয় সেখানে ভালোবাসা দিবসে একেকটি গোলাপ বিক্রি হবে কমপক্ষে ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকায়।
রংপুর নগরীর মডার্ন মোড়, খটখটিয়া, সাতমাথাসহ বিভিন্ন এলাকার ফুলের বাগানগুলোও প্রস্তুত ভালোবাসা দিবসের জন্য। গোলাপের পাশাপাশি থোকায় থোকায় ফুটে আছে গাঁদা, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাসসহ দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফুল। বাগান থেকে এসব ফুল আজ তোলা হবে। বাগান মালিকরা জানান, পরিচর্যায় ফুলের বৃদ্ধি ঘটে। দিন-তারিখ হিসেব করে বাগানের পরিচর্যা করা হয়েছে যাতে নির্ধারিত সময়ে ফুল উত্তোলন করা যায়।
গেল কয়েক ধরে সারাদেশেই পহেলা ফাগুন আর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালনের উৎসব মুখরতা দেখা দেয়। এদিনে সব বয়সের মানুষ ভালোবাসা বিনিময়ে আনন্দ-আড্ডায় মেতে ওঠেন। আর এই আনন্দের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে ফুল। পহেলা ফাগুন আর ভালোবাসা দিবসে ফুল ছাড়া যেন চলেই না। এই সুযোগে ফুলচাষি, বাগান মালিক আর ব্যবসায়ীরা মিলে বিক্রি করেন কোটি কোটি টাকার ফুল।
চলতি বছরে রংপুরের ফুল বাগান মালিকরা বেশি দামে ফুল বিক্রি করতে শুধু বাগানের গোলাপ সংগ্রহই বন্ধ করেননি, বিশেষ কৌশলে বাগানেই সংরক্ষণ করছেন। রংপুর পুলিশ লাইন্স সংলগ্ন ফুল কর্নারের স্বত্বাধিকারী হাফিজুল আলম বাবু আনন্দবাজারকে জানান, ফুলের দোকানগুলোতে বর্তমানে সব ধরণের ফুল পাওয়া গেলেও গোলাপ মিলছে না। রংপুরে বেশ কয়েকটি গোলাপের বাগান থাকলেও ভালোবাসা দিবসকে সামনে রেখে মালিকরা আগে থেকেই ফুল উত্তোলন বন্ধ করে দিয়েছেন। আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকেই বাজারে গোলাপ পাওয়া যাবে। তবে সেসব গোলাপ বেশি দামে কিনতে হবে।
নগরীর সাজঘর নামের ফুলের দোকানের মালিক শাহীন আলম আনন্দবাজারকে জানান, বছরের অন্যান্য সময় বিশেষ প্রয়োজনে ক্রেতারা প্রতিটি গোলাপ পাঁচ টাকায় কিনতে পারেন। তবে ভালোবাসা দিবসসহ আগে পরে সেই গোলাপ ২০ টাকার কমে পাওয়া যাবে না। কখনো কখনো গোলাপের দাম বেড়ে ৪০ থেকে ৫০ টাকাতেও বিক্রি হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রংপুরে ছোটবড় মিলে শতাধিক ফুলবাগান থাকলেও নগরসহ আশপাশের এলাকায় রয়েছে ২০টির মতো বাগান। সরেজমিনে রংপুর নগরের বীরভদ্র বালাটারি এলাকায় একটি বাগানে গিয়ে দেখা যায়, গোলাপ সংরক্ষণের অভিনব কৌশল। বাগান মালিক যেন কানে কানে বলছেন ‘হে গোলাপ ভালোবাসা দিবসের আগে তুমি ফুটিও না।’ মালিকের এই আকুতি গোলাপ শুনুক আর নাই শুনুক, পহেলা ফাগুনের আগে গোলাপ যেন ফুটে ঝরে না যায় সেজন্য ফুটন্ত কুঁড়িতে পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক ধরণের বিশেষ ক্যাপ। এতে গোলাপের কুঁড়ি বড় হবে কিন্তু ফুল ফুটে পাঁপড়ি ঝরে পড়ার সুযোগ পাবে না। এভাবে একমাস পর্যন্ত গোলাপ সংরক্ষণ করা যায়।
সৌদি প্রবাসী বাগান মালিক আনিসুর রহমান জানান, তার এক একর জমির ফুল বাগানে বিশেষ সময়ে ফুলের চাহিদা মেটাতে এভাবেই গোলাপ সংরক্ষণ করেন। প্রবাস জীবনে বিষয়টি তাঁর নজর কাড়ায় দেশে ফিরে তিনি বাগান করেন। তিনি বলেন, কুঁড়ি বের হওয়ার বিশেষ ক্যাপ পরিয়ে দিলেই ফুলটি বড় হবে কিন্তু ফুটে নষ্ট হওয়ার সুযোগ পায় না। এভাবে বাগানে ১৫ দিন থেকে একমাস পর্যন্ত গোলাপ সংরক্ষণ করা যায়। এক ধরণের টিস্যু কাগজের তৈরি এই ক্যাপ যশোর জেলা থেকে আনা হয়।
আনিসুর রহমান আরো জানান, এমন সময়ে বাজারে প্রতিটি গোলাপ পাঁচ টাকায় বিক্রি হলেও বাগান থেকে ফুল ব্যবসায়ীরা পাইকারি দামে প্রতি একশ’ গোলাপ ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় কেনেন। অর্থাৎ প্রতিটি গোলাপের দাম পড়ে দুই থেকে তিন টাকা। ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে প্রতিটি গোলাপের দাম গড়ে ১০ টাকা পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। প্রতিটি ক্যাপ সংগ্রহে দুই টাকা খরচ হয় উল্লেখ করে আনিসুর রহমান জানান, একসঙ্গে সব ফুল ফোটে না। তাই প্রতিদিন সকালে নিজের হাতেই গোলাপে ক্যাপ পরানো সম্ভব।
অন্যদিকে নগরের পাণ্ডারদিঘি শিরিন পার্ক এলাকায় একটি গোলাপের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন শ্রমিক গোলাপের কুঁড়িতে রাবার ব্যান্ড পরিয়ে দিচ্ছেন। ফুটন্ত গোলাপগুলোতে এমনভাবে ব্যান্ড পরিয়ে রাখা হচ্ছে যাতে ফুল ফুটে ঝরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ পদ্ধতি সম্পর্কে বাগান মালিক আব্দুল কাদের বলেন, ‘ব্যবসা করলে তো বছরের বিশেষ দিনে বেশি লাভের আশা করতেই হবে। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে বাগানে ফুটন্ত গোলাপে রাবার ব্যান্ড পরিয়ে তাই গোলাপ সংরক্ষণ করা হচ্ছে।’
আব্দুল কাদের জানান, ওই এলাকায় প্রায় এক একর জমির ওপর তার দু’টি গোলাপের বাগান আছে। বিশেষ দিবসের আগে ১৫ থেকে ২০ দিন আগে ফুটন্ত গোলাপে রাবার ব্যান্ড পরিয়ে দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে খুব বেশিদিন ফুল সংরক্ষণ করা যায় না। তবে বিশেষ ক্যাপ ব্যবহার করে একমাসের বেশি গোলাপ সংরক্ষণ করা গেলেও এ পদ্ধতিতে খরচ বেশি পড়ে যায়। সেক্ষেত্রে প্রতি কেজি রাবার ব্যান্ড কিনতে খরচ পড়ে মাত্র এক হাজার টাকা। যা দিয়ে তিন থেকে চার হাজার গোলাপ বেঁধে রাখা সম্ভব।
এবারের পহেলা ফাগুন আর ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে এই পদ্ধতিতে তিন হাজারের বেশি গোলাপ সংরক্ষণ করেছেন তিনি। করোনার কারণে শঙ্কা প্রকাশ করে আব্দুল কাদের জানান, এই ফুল বিক্রি না হলে লাভ তো দূরের কথা, পূঁজি হারিয়ে পথে বসতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, বিধি-নিষেধ থাকায় ইদানিং তেমন কোনো অনুষ্ঠানও হচ্ছে না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে ফুলচাষিদের ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় থাকবে না বলেও জানান তিনি।









