নরসিংদীতে অবাধে ফসলি জমির উর্বর মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। স্থানীয় দালাল ও ইটভাটার মালিকরা কৃষকদের ভুল বুঝিয়ে নামমাত্র মূল্যে কিনে নিয়ে যাচ্ছে এসব মাটি। এতে মাটির উর্বরা শক্তি কমে গিয়ে শত শত হেক্টর কৃষিজমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশংকা স্থানীয়দের। ফসলি জমি রক্ষায় অবাধে মাটি কাটা বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান সচেতন কৃষকরা।
নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, নরসিংদী জেলায় ইটভাটার সংখ্যা ১৮৩টি, এরমধ্যে চালু রয়েছে ১৫০টি। উর্বর মাটি কেটে নেয়ার কারণে মাটিতে ফসলের প্রধান খাদ্য নাইট্রোজেন, ফসফরাস, আয়রন, জিংক, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়ামসহ বিভিন্ন জৈব উপাদানের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়ে ফসল উৎপাদন কমে। আগামীতে কৃষি জমি অনাবাদি হয়ে দেশে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে বলে জানান কৃষি বিভাগ।
সরেজমিনে দেখা যায়, ‘ইট’ তৈরির জন্য প্রতিবছরই এ মৌসুমে জেলার ৬ উপজেলায় কৃষি জমির উপরিভাগের ৫ থেকে ১০ ফুট উর্বর মাটি অবাধে কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইটভাটাগুলোতে। ইটভাটা মালিক ও ভাটা কর্তৃপক্ষের নিয়োজিত দালালরা কৃষকদের ভুল বুঝিয়ে নামমাত্র মূল্যে কিনে নিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমির এ উর্বর মাটি। ইটভাটা ছাড়াও ভিটি ভরাটসহ অন্যান্য কাজেও প্রতিনিয়ত ভেকু মেশিনে কেটে নেয়া হয় এ মাটি। বিশেষ করে জেলার সদর উপজেলার মাদবদীর পাইকারচর, বালাপুরসহ শিবপুর, মনোহরদী ও পলাশ উপজেলায় বেশি চলে মাটি কাটার মহোৎসব। এছাড়া চলাচলে নিষেধ থাকলেও ইটভাটার মাটি বহনকারী ট্রাক, মিনি ট্রাক, ট্রলি চলাচল করায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক।
কৃষকরা জানান, এভাবে অবাধে মাটি কাটা অব্যাহত থাকায় জমির উর্বরশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাশের অন্যান্য ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট। বহুলাংশে কমে যাচ্ছে ইরি-বোরো ধান ও শাকসবজিসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন। বিভিন্ন জৈব উপাদানের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেওয়ায় চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে শত শত হেক্টর কৃষিজমি। প্রলোভনে পড়ে কেউ কেউ কৃষি জমির মাটি বিক্রি করলে ভাঙ্গনের আশংকায় মাটি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন পাশের জমির মালিকরা। আশেপাশের ইটভাটার বেশিরভাগ কৃষিজমি থেকে মাটি নিয়ে ইট তৈরি করে থাকে বলে জানান স্থানীয় কৃষকরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাটি বিক্রেতা একাধিক ব্যক্তি জানান, বেশি টাকা পাওয়ার কারণে ফসলি জমির মাটি বিক্রি করে দিয়েছেন জমির মালিকেরা। বিঘা প্রতি জমির মাটির দাম ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। ধান চাষ করে লাভ হয় না। তাই তাঁরা মাটি বিক্রি করছেন। এতে করে আমাদেরও লাভ, কৃষকেরও লাভ।
ইটভাটার মালিকদের দাবি, কৃষি জমি থেকে ইটভাটায় মাটি নিতে কোনো কৃষককে বাধ্য কিংবা প্রলোভন দেখানো হয়না। যেসব জমি চাষ করে কৃষক লোকসানের মুখে পড়েন সেসব জমির মালিকরা ইটভাটার ঠিকাদারদের কাছে মাটি বিক্রি করেন কৃষকরা। তবে আমরা এখন ইটভাটার ঠিকাদারদের মাধ্যমে পুকুর, ডোবা ও নদীর কাটার মাটি কিনে ইটভাটা চালাচ্ছি, কোনো কৃষি জমির মাটি নয়।
নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের উপ পরিচালক ড. মো: ছাইদুর রহমান বলেন, জমির মূল উর্বরতা শক্তি থাকে মাটির উপরিভাগে। আর এ মাটি (টপ সয়েল) কেটে নিলে তার উর্বরতা শক্তি সঞ্চয় করতে সময় লাগে ১০-১২ বছর। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০-১২ বছর পর কৃষি জমি অনাবাদি হয়ে দেশে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। অবাধে মাটি কাটা বন্ধে কৃষকদের সচেতন করার পাশাপাশি প্রয়োজনে প্রশাসনিকভাবে আইনী পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানান এই কৃষি কর্মকর্তা।
নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন,সরকারি নিদর্শনা আছে কোন কৃষি জমি থেকে ইটভাটার জন্য মাটি নিতে পারবে না। পুকুর, ডোবা কিংবা মরা নদীর মাটি নিয়ে ইটভাটার ইট তৈরী করতে হবে। তবে অভিযোগ পেলে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মোবাইল কোট পরিচালনার কথা জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা।









