বিশ্বজুড়েই নিত্যপণ্যের বাজার চড়া। বেড়েছে সব ধরণের জিনিসের দাম। বিশেষ করে মাছ-মাংসের বাজারও নিম্নবিত্তদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর ওপর আবার আমিষ উৎপাদনের কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বড় শংকা দেখা দিয়েছে এই খাতে। আসছে কোরবানিতে পশুর দামও বেড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েছেন এখাতের বেশিরভাগ খামারি। ইতোমধ্যে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন অনেকে। এতে আমিষ উৎপাদন কমে গিয়ে জনস্বাস্থ্যে প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশে আমিষের সংকট নিয়ে টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি রেজাউল করিমের বিশেষ প্রতিবেদন- আমিষ উৎপাদনখাত টলমলে।
বাজারে সব ধরণের ফিডের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের আমিষ উৎপাদন। এতে পোল্ট্রি, মৎস্য ও ডেইরি-ক্যাটল উৎপাদন শিল্পে বিরাজ করছে অস্থিরতা। এমনিতেই দেশে প্রধান খাদ্য চালসহ নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে বহুদিন ধরে। এর ওপর বড় ধরনের ধাক্কা হয়ে এসেছে মৎস্য ও প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদনখাত। প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত সয়ামিল, ভুট্টার গুঁড়া, গমের গুঁড়া, চালের কুঁড়াসহ সব ধরনের ওষুধের দাম বেড়েছে। ফলে এই খাতের উদ্যোক্তারা প্রতিনিয়ত লোকসানের দুশ্চিন্তায় ভুগছেন।
খরচ বেড়ে যাওয়ায় মাছ ও মাংস উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে লোকসানের মুখে পড়েছেন লোকসানের মুখে পড়েছেন প্রান্তিক খামারিরা। এদিকে, আসছে কোরবানির ঈদ ঘিরে পশু উৎপাদন সংশ্লিষ্ট ক্যাটল খামারিদেরও বেগ পেতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী কোরবানিতে পশুর চড়া দাম হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সয়ামিল রপ্তানি চালু রাখা ও গম আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাবে কাঁচামালের দাম বাড়ছে। এ অবস্থায় শুধু যে মৎস্য ও প্রাণিজ খাদ্যের দাম বেড়েছে তা নয়, ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য জরুরি উপকরণের দামও বেড়েছে। এ অবস্থা বিদ্যমান থাকলে হুমকিতে পড়বে পুরো মৎস্য ও প্রাণি উৎপাদন খাত। ডিম, দুধ, মাছ ও গোশতের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে হুমকির মুখে পড়তে পারে জনগণের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা।
টাঙ্গাইল প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রমতে, জেলাতে প্রায় দুই হাজার ৯শ ব্রয়লার খামার রয়েছে। এর মধ্যে ৪০৯টি নিবন্ধিত। বাকি দুই হাজার ৫৬৮টি অনিবন্ধিত। জেলায় লেয়ার খামার রয়েছে ৪ হাজার ১৫টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত ৬৩৪টি এবং অনিবন্ধিত ৩ হাজার ৩৮১টি। সোনালি খামারের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও আড়াই হাজারের মতো খামারের কথা জানা গেছে। অধিকাংশ খামারিই প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে হিমশিম খাচ্ছেন।

পোলট্রি খামারের সঙ্গে সম্পৃক্তরা জানান, গত দুই বছরে পোল্ট্রি খাবারের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ৫০ কেজি ওজনের ১৭শ টাকা প্যাকের খাবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১শ টাকায়। সঙ্গে ওষুধের মূল্য ঊর্ধ্বগতি। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অথচ ব্রয়লার বা সোনালি মুরগির দাম বাড়ছে না। উল্টো দাম নিম্নগতি দেখা যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগির পাইকারি দর ১৫০ টাকা থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ১২০ টাকায়। এতে প্রান্তিক খামারিরা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। কেউ কেউ ব্রয়লার মুরগি পাইকারি বিক্রি না করে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশির আশায় মাইকিং করে কেজিতে খুচরা বিক্রি করছেন। অধিকাংশ খামিরি ব্রয়লার উৎপাদন ছেড়ে দিচ্ছেন।
খামার বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় ৫০ থেকে ৫৫ টাকার ব্রয়লারের বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৩ টাকায়। খামারিরা বলছেন, বাচ্চার দাম কমলেও ফিড ও ওষুধের দাম না কমলে এ শিল্প হুমকির মুখে থাকবে। ব্রয়লার মুরগির পাশাপাশি সোনালি ও লেয়ার মুরগির সঙ্গে ডিম উৎপাদনের খরচও বেড়ে যাচ্ছে। মাংস বা ডিমের দাম বাড়লে ভোক্তারা বিমুখ হয়। সেক্ষেত্রে ফিডের দাম কমিয়ে আনা এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র মাধ্যম বলে মনে করছেন প্রান্তিক খামারিরা।
টাঙ্গাইলের প্রান্তিক পোলট্রি খামারি মীর ইয়াকুব আলী ও সোহাগ খানসহ অধিকাংশ খামারিরা জানান, প্রতিনিয়ত মুরগির ওষুধ ও খাবারের দাম বাড়ছে। ১৭০০ টাকার খাবারের বস্তা গত দুবছরের ব্যবধানে এখন ৩১০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। সে হারে মুরগির মাংসের দাম বাড়েনি। উৎপাদন খরচের সঙ্গে মুরগির বিক্রয় মূল্যে মিল না থাকায় অধিকাংশ খামারি মুরগি পালন ছেড়ে দিচ্ছেন। মুরগির বাচ্চার দাম কমলেও খাবারের দাম না কমায় অনেকেই খামারে নতুন বাচ্চা তুলছেন না। এভাবে চলতে থাকলে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে এই পোল্ট্রি শিল্প।
দেলদুয়ার উপজেলা ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রুবেল হাসান বলেন, খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রমশ খামারির সংখ্যা কমছে। যারা টিকে আছেন তারাও খামারে কম বাচ্চা তুলছেন। খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে মুরগির বাজার না বাড়ায় খামারিরা নতুন বাচ্চা তুলছেন না। এতে ৫০/৫০ টাকা দরের ব্রয়লার বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে ১২/১৩ টাকা। এতেও খামারিদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে, বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) তথ্য বলছে, গত দুই বছরে সয়ামিলের দাম বেড়েছে ৮৮ শতাংশ। অন্য কাঁচামালের দাম বেড়েছে ১২৩ শতাংশ পর্যন্ত। কাঁচামালের দাম বাড়ায় বড় ফিড মিলগুলো তাদের উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ কমিয়েছে। এ কারণেই ফিডের মূল্য বৃদ্ধি।
টাঙ্গাইল জেলা পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত মোল্লা জানান, বর্তমানে প্রান্তিক খামারিদের ক্রান্তিকাল যাচ্ছে। পোল্ট্রি খাবারসহ সব ধরনের কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। মুরগির মাংসের দাম কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে এখন খামারিরা। এতে হুমকিতে পড়েছে পোল্ট্রিশিল্প।
টাঙ্গাইল জেলা খামার রক্ষা অ্যাসোসিয়েশনের প্রস্তাবিত সভাপতি খোকন সিকদার জানান, সব ধরণে ফিড ও ওষুধের দামসহ অন্যান্য কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ধ্বংসের মুখে পোল্ট্রি শিল্প। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে খাদ্যসহ সব কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণে এনে উৎপাদন খরচ কমানো জরুরি।
একইভাবে বেড়েছে মৎস্য খাবারের দাম। ভালোমানের মৎস্য খাবার ১১৫০/১২০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৫০ থেকে ১৫০০ টাকা বস্তা। ফলে পুকুরে চাষ করা মাছের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এতে অধিকাংশ মাছচাষি বিপাকে পড়েছেন। ১২০ টাকার পুকুরের পাঙ্গাস বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি। এরপরও লোকসানের মুখে মাছচাষিরা।
পাঙ্গাসের গ্রাম আটিয়ার পাঙ্গাস চাষি ডা. লুৎফর রহমান, জায়েদুর রহমান, আসাদুজ্জামান, বায়েজিদ হোসেন জুয়েল জানান, হুহু করে মৎস্য খাবারের দাম বাড়ছে। বর্তমানে এককেজি ভাসমান খাবারের দাম ৬৩/৬৬ টাকা, প্রতি কেজি ডুবন্ত খাবারের দাম ৪৪/৪৫ টাকা। এ খাবার কয়েক বছরের দ্বিগুণ হয়েছে। খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এতে লোকসানের মুখে রয়েছে মৎস্য চাষিরা। মাছ উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে খাবারের দাম কমানোর দাবি প্রান্তিক মৎস্য চাষিদের।

এদিকে গত ছয় মাসে গো-খাদ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন খামারিরা। পশুখাদ্য কিনতে না পেরে অনেকেই গরু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। লোকসানের আশঙ্কা থাকলেও আসন্ন কোরবানি ঈদে দাম পাওয়ার আশায় কেউ কেউ খামার টিকিয়ে রেখেছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে গরু পালন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
টাঙ্গাইল জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রমতে, জেলাতে ৪৩৯টি নিবন্ধিত ডেইরি ও ক্যাটল ফার্ম রয়েছে। বেসরকারি তথ্যমতে জেলায় ছোট বড় সাড়ে ১২ হাজার ডেইরি ও ক্যাটল ফার্ম রয়েছে। এতে প্রায় দশ লাখের মতো গরু পালন হয়ে থাকে। চলতি বছর ৮৭ হাজার কোরবানির পশু পালন হয়েছে। জেলায় সাধারণত ৮১ হাজার কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে।
ডেইরি ও ক্যাটল খামারিরা জানান, গত ছয় মাস আগে গমের ভুসি প্রতি কেজি ৩১/৩২ টাকার পরিবর্তে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। ৫০ কেজি ওজনের সয়ামিলের বস্তা ১৭৫০-১৮০০ টাকার জায়গায় এখন ৩১৫০-৩২০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। ভুট্টা পাউডার, চালের খুদ, খৈল ও চিটাগুড়েরও দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বাজারে ২০-২২ টাকার ভুট্টা পাউডার এখন ৩৮-৪০ টাকা, ২০-২২ টাকার চালের খুদ ৩৩-৩৪, মাসকলাইয়ের ভুসি ২৮-২৯ থেকে বেড়ে ৪২-৪৩, ২৫-৩০ টাকা কেজির খৈল ৪৫-৫০ এবং ২৫ কেজি বস্তার মিক্স ফিড ৭৮০ টাকা থেকে দাম বেড়ে ৯৮০-১০০০ টাকা হয়েছে। ভালোমানের ফিডের দামও বস্তাপ্রতি এক হাজার থেকে বেড়ে ১২০০-১৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিটাগুঁড়ের দাম প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ৮ টাকা বেড়েছে বলে খামারিরা জানিয়েছেন।
সরকার এগ্রো অ্যান্ড ডেইরি ফার্মেও স্বত্বাধিকারী মাহফুজুর রহমান ও খান ডেইরি ফার্মের স্বত্বাধিকারী হাসমত খান জানান, দেশি জাতের গরু লালন-পালনে একটা সময় খামারিরা দুর্বা ঘাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সেই ঘাস দিয়ে এখন আর হয় না। বাইরে থেকে খাবার সরবরাহ করতে হয়। কিন্ত যেভাবে গো-খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে তাতে গরু পালন করা দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গরুর প্রাকৃতিক খাদ্য ধানের খড়। হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটায় অধিকাংশ জমিতে ধানের আঁটি পড়ে রয়েছে। এতে খড়ের অভাবে দো-খাদ্যে আরও সংকট দেখা দেবে। গবাদি পশুর খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। ফলে ইতোমধ্যে গরুর মাংসের দাম বেড়েছে। এ প্রভাব কোরবানির পশুর ওপর পড়বে। এদিকে গা-খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি গাভীর দুধের ওপর প্রভাব পড়ছে। ফলে ঘিসহ দুগ্ধ জাতীয় পন্যের দামও বাড়ছে।
টাঙ্গাইল জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রানা মিয়া বলেন, টাঙ্গাইলে গতবছরের কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল ৮১ হাজার। এবার জেলায় কোরবানির পশু আছে প্রায় ৮৭ হাজার। জেলার উৎপাদিত পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা পূরণ হবে। সেক্ষেত্রে কোরবানির পশুর মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই। তবে ধাপে ধাপে ফিডের দাম বেড়ে যাওয়ায় খামারিরা বিপাকে পড়েছেন। এটা শুধু টাঙ্গাইলের সমস্যা না। সারাদেশেই গো-খাদ্য ও পোল্ট্রি খাদ্যের দাম বেড়েছে। গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় গরু পালনে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এজন্য খামারিরা কোরবানির পশুর দাম বাড়াতে পারে।
চিকিৎসাবিদরা বলছেন, আমিষ শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধি সাধন ও দেহ গঠন করে। রোগ সৃষ্টিকারী রোগজীবাণুকে প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের দেহে রোগ প্রতিরোধী পদার্থ বা অ্যান্টিবডি তৈরি করা আমিষের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মানসিক বিকাশ বা মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য আমিষ অপরিহার্য। দেহে আমিষের অভাব হলে বর্ধনরত বয়সের শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যে আমিষের ঘাটতি থাকলে কোয়াশিয়রকর রোগ হয়। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মেধা ও বুদ্ধি কমে যায়। তাই আমিষ জাতীয় খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন।
আনন্দবাজার/শহক








