মিলারদের সঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তরের আইনি চুক্তি থাকায় তারা চাল দিতে বাধ্য থাকেন। তবে ধান সংগ্রহ করা হয় সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে। যা তাদের মর্জির ওপর নির্ভর করে। তারা যেখানে বেশি পান সেখানেই বিক্রি করেন। এতে ধান সংগ্রহ কম হয়।
রাজশাহী ও তার আশেপাশের জেলায় আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এবারো ব্যর্থ হয়েছে সরকার। কৃষকদের অনীহা, বাজারে ধানের দাম বেশি, পরিবহন খরচসহ নানান করণে ধান সংগ্রহে ব্যর্থ হতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। চলতি আমন মৌসুমে রাজশাহী বিভাগে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১১.৬২ শতাংশ ধান সংগ্রহ করতে পেরেছে। তবে, ধান সংগ্রহে ব্যর্থ হলেও চাল সংগ্রহে সফলতা এসেছে।
আমন মৌসুমেও চাল ও ধান সংগ্রহে প্রাচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে কৃষক শ্রেণিকে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসের। তবুও ব্যর্থ হয়েছে অভিযান। কৃষক ও খাদ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিবহনসহ অন্যসব মজুরি খরচের হিসাব বিবেচনা করলে বাড়ি থেকে পাইকারের কাছে অথবা পাশের বাজারে কাছাকাছি দামে বিক্রি করাই অনেক সুবিধাজনক। এর পাশাপাশি গ্রেডিং, শুষ্কতা, পরিবহন খরচ বিবেচনায় কৃষকরা সরকারি গোডাউনে ধান দিতে ততো বেশি আগ্রহ দেখান না কৃষকরা।
চলতি আমন মৌসুমে সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ২৭ টাকা কেজি দরে (প্রতি মণ ১০৮০ টাকা) ধান কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। রাজশাহী অঞ্চলে চাল সংগ্রহে ৯৯ শতাংশ সফল হলেও ধানে ব্যর্থ আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তর। ধান যা সংগ্রহ হয়েছে তা লক্ষ্যমাত্রার ৯ ভাগের এক ভাগ।
নওগাঁ জেলা উত্তরাঞ্চলের অন্যতম ধান ভাণ্ডার। জেলার ১১টি উপজেলার ১৯টি খাদ্যগুদামে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ১০৮০ টাকা মণ দরে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১০ হাজার ২৪৩ মেট্রিক টন। জেলায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ধান সংগ্রহ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার এক শতাংশের কম। জেলাটিতে মাত্র ৯৭ টন ধান ক্রয় করতে পেরেছে জেলার সরকারি খাদ্যগুদামগুলো। তবে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ চাল সংগ্রহ করতে পেরেছে স্থানীয় খাদ্য বিভাগ।
রাজশাহী আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলে ৪৩ হাজার ৪০৪ টন আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে ৫৫৭৫ টন। লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১১.৬২ শতাংশ পূরণ হয়েছে মাত্র। তবে, রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলায় চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় শতভাগই পূরণ হয়েছে। সরকার নির্ধারিত সিদ্ধ চালের দাম প্রতি কেজি ৪০ টাকা এবং আতপ চাল কেজি প্রতি ৩৯ টাকা। আমন মৌসুমে চাল সংগ্রামের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৬২,৩৭৪ টন। সময় শেষে এক লাখ ৬২ হাজার ৩১২ টন সংগ্রহ হয়েছে।
আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সরকারিভাবে চাল সংগ্রহ করা বেশ সহজ। মিলারদের সঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তরের আইনি চুক্তি থাকে। সে কারণে মিলাররা খাদ্য অধিদপ্তরের কাছে বাধ্য থাকে চাল দিতে। কিন্তু ধান সংগ্রহ করা হয় কৃষকদের কাছ থেকে। সে কারণে এটা নির্ভর করে কৃষকদের মর্জির ওপরে। কৃষকরা যেখানে বেশি পাবেন সেখানেই ধান বিক্রি করেন।
রাজশাহীর তানোর উপজেলা পাঁচন্দর এলাকার কৃষক মিঠু জানান, সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে তার চেয়ে বেশি দামে ধান বিক্রি হচ্ছে বাজারে। সে কারণে ধান নিয়ে গোডাউন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার মতো চিন্তা কৃষকরা করে না।
নওগাঁ পোরশা থানার শুড়িপুকুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কাইয়ুম জানান, সরকারি গোডাউন অনেক দুরে। পাইকারেরা বাড়িতে এসে ধান কিনে নিয়ে যায়। সব হিসেবে করে গোডাউনে ধান নিয়ে যাওয়াটা বেশ কষ্টকর। সরকারি গুদামে ধান সরবরাহ না করে বাড়িতে পাইকার ব্যবসায়ী বা পাশে কোন বাজারে ধান বিক্রি করা যায়।
রাজশাহী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অণির্বাণ ভদ্র জানান, সরকার নির্ধারিত ধানের সংগ্রহ মূল্য ও বাজারে ধানের দামের খুব বেশি পার্থক্য না থাকায় কৃষকেরা গুদামে ধান দিতে আগ্রহী হননি। সরকারের ধান সংগ্রহের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, কৃষক যেন ন্যায্যমূল্য পায়। কৃষক যেহেতু বাজারে ভালো দাম পাচ্ছেন, সে কারণে আমাদের সংগ্রহ কম। তবে সরকারের মূল উদ্দেশ্য সফল হয়েছে বলে দাবি এই কর্মকর্তার।
রাজশাহী জেলা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জি এম ফারুক হোসেন পাটওয়ারী বলেন, সরকারের যে মূল লক্ষ্য তা পূরণ হয়েছে ধান সংগ্রহে। কৃষকরা মাঠ পর্যায়ে যাতে সঠিক মূল্য পায় সেটাই ছিল সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সরকার নির্ধারিত দাম বেঁধে দেয়ার করণে কৃষকরা দাম পেয়েছে।









