উত্তরে গাছিরা বেকায়দায়
‘বাঁদুরে খায় বলে মাইনষে খেঁজুরের রস খাবার চায় না।’ শীতকালের প্রধান আকর্ষণ খেঁজুরের রস বাজারে বিক্রি না হওয়ায় আক্ষেপ করে এমন কথা বলেন রংপুর নগরীর সাতমাথা বাজারের রস বিক্রেতা ইসমাইল হোসেন। নিপাহ ভাইরাস আতংকে বাজারে খেঁজুর রসের চাহিদা কমে যাওয়ায় চরম বেকায়দায় পড়েছেন রংপুরের হাজারো গাছি।
জানা যায়, ২০১১ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি উত্তরাঞ্চলের লালমনিরহাটের হাতিবান্ধায় প্রথম ধরা পড়েছিল নিপাহ ভাইরাস। ৯ দিনের মাথায় এক এক করে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ২৪ জন। ২০১৫ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই নওগাঁয় সেই নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে শিশুসহ তিনজনের প্রাণহানি ঘটে। এরপর ২০১৮ সালে বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় খেজুরের রস পানে দুই বোনের মৃত্যু হয়। এছাড়া ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ২০ দিনের ব্যবধানে ঠাকুরগাঁওয়ে একই পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যুর কারণও নিপাহ ভাইরাস। এতে ‘নিপাহ’ আতংক ছড়িয়ে পড়ে গোটা উত্তরাঞ্চলে।
সর্ব প্রথম লালমনিরহাটের হাতিবান্ধায় সামান্য জ্বর, মাথাব্যাথা ও শ্বাসকষ্টে একেবারেই অজান্তেই প্রাণ ঝরে যায় সুদীপ্ত, সাগর, অরণ্য আর অনণ্যা’র মত বেশ কয়েকটি তাজা প্রাণ। অজানা রোগ হিসেবে সর্বত্র আতংক ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ দল ছুটে আসে। এ সময় তাঁরা রোগের কারণ হিসেবে যখন ঘাতক ‘নিপাহ ভাইরাস’ আবিস্কার করেন তখন সরকারিভাবে ওই এলাকায় মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯-এ। ১ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাতিবান্ধায় এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ২৪ জন। এরপর ওই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে রংপুরের গঙ্গাচড়ার স্কুলছাত্রী লুবনা আক্তারসহ কাউনিয়া, পীরগাছা এবং রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য এলাকায় আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়।
সে সময় বিশেষজ্ঞরা জানান, শীতের সময় এ নিপাহ নামক ভাইরাসটি বাঁদুরই বহন করে থাকে। ভাইরাস বহনকারী বাঁদুর যখন শীতকালে খেঁজুরের রসের হাড়িতে বসে রস খায় এবং বিভিন্ন ফল খায় তখন তার লালার মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাস ছড়ায়। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা খেঁজুরের রস ও বাঁদুর কিংবা অন্য কোন পাখি কামড়ানো ফল না খাওয়ার পরামর্শ দেন। নিশাচর ও স্তন্যপায়ী প্রাণী বাঁদুড় নিপাহ ভাইরাস বহন করায় ওই বছর কয়েকদিনের ব্যবধানে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা, রাজশাহী, জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। খেঁজুরের কাঁচা রস খেয়ে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এমন ঘটনা ঘটে বলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হয়েছিলেন। বাঁদুড় নাকি দিনে তেমন দেখে না। অথচ রাতের বেলায় চষে বেড়ায় সর্বত্র। শীতের সময়ে খেজুরের রস কিংবা অন্যান্য ফল খেয়ে সাবাড় করে দেয়। বাঁদুড়ের লালা থেকেই মানুষের দেহে সংক্রমিত হয় নিপাহ ভাইরাস। সে কারণে খেজুর রসসহ বাঁদুড়ে খায় এমন ফলমূল খাওয়া প্রায় ছেড়েইে দিয়েছে লোকজন।
রংপুরের গ্রামাঞ্চলে সহস্রাধিক গাছি রয়েছেন। যারা বাপ-দাদার পেশাকে আঁকড়ে ধরে প্রতিবছর শীত মৌসুমে খেঁজুর গাছের রস নামিয়ে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। লালমনিরহাটের হাতিবান্ধায় নিপাহ ট্রাজেডির পর বাঁদুরকে ওই ভাইরাসের অন্যতম বাহক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেই থেকে বাঁদুরে খায় এমন খাবার থেকে বিরত থাকার প্রচারণায় চাহিদা কমে যায় শীতের আকর্ষণ খেঁজুর রসের।
এলাকা ঘুরে দেখা যায়, খেঁজুর গাছগুলোতে ঝুঁলছে রসের হাঁড়ি। মৌসুম শুরু হওয়ায় গাছিরা রসের আশায় গাছ ছিলিয়ে হাঁড়ি বসিয়েছেন। প্রচুর রস নামলেও বাজারে চাহিদা না থাকায় হতাশ হয়ে পড়েছেন তারা। কাউনিয়া উপজেলার শহীদবাগ গ্রামের গাছি একরামুল হকের পেশাই হলো খেঁজুর গাছ থেকে রস নামিয়ে বাজারে বিক্রি করা। তিনি জানান, প্রতিবছর শীত মৌসুমের জন্য ৫০ থেকে ৬০ টি খেঁজুর গাছ লিজ অথবা চুক্তিতে নেওয়া হয়। কিন্তু বিগত কয়েক কয়েক বছর রস বিক্রি না হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি।
তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালি ইউনিয়নের ওকরাবাড়ি এলাকার গাছি সৈয়দ আলী শীতকালে প্রতিদিন সকালে রস বিক্রি করেন রংপুর নগরের সিও বাজার এলাকায়। তিনি বলেন, ‘পাঁচ টাকায় এক গ্লাস রস বেচাইলে (বিক্রি করলে) লাভের মুখ দেখা যায়। কিন্তু এ্যালা বাজারে দুই টাকাতেও মানুষ খেঁজুরের রস খাবার চায় না।’









