পটুয়াখালীর বাউফলের চরাঞ্চলে আমন ধানের ভালো ফলন হয়েছে। তবে ধানের কাঁচা-সোনার রং আসতে না আসতেই শীষ কাটা লেদা পোকা আর ফলস স্মার্ট রোগের অক্রমন দেখা দিয়েছে। পোকার আক্রমনে আধা-পাকা ধান কেটে ঘরে তুলছে কৃষক। এর ফলে কৃষকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের ছোটডালিমা গ্রামের কৃষক রহুল আমিন জানান, তিনি এ বছর সাড়ে ৩ কানি (৯৪০ শতাংশ) জমিতে ইরি-৫২ জাতের ধান চাষ করেছেন। কিন্তু শীষকাটা লেদা পোকার আক্রমনে আধাপাকা ধানকেটে ঘরে তুলেছেন। কেবল রুহুল আমিনই নয়, আধাপাকা ধানকেটে ঘরে তুলেছেন একই গ্রামের বারেক আকন, সুলতান ফরাজী, নিজাম খান, জসিম খানসহ আরও অনেক কৃষক। পোকার আক্রমন ঠেকাতে কেউ কেউ আবার ক্ষেতের আধাপাকা ধানে ঔষুধ ছিটাচ্ছেন।
বাউফল উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, জেলায় ৩৪ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। অনুকুল আবহাওয়া বিরাজ করায় বাউফলের চরাঞ্চলের দিগন্তজুড়ে এখন বিস্তৃর্ণ আমনের চোখ জুড়ানো সোনালি-হলুদাভাব। কয়েক দিন পরেই মাঠে ধুম পড়বে আমন ধান কাটার। স্বপ্ন পূরণে কৃষক-কৃষাণী ঘরে তুলবে সোনার ধান। কিন্তু এই মুহুর্তে শীষকাটা লেদা পোকা আর ফলস স্মার্ট রোগের আক্রমনে দিশেহারা অনেক কৃষক।
সুলতানাবাদ গ্রামের হারুন দেওয়ান, ইউনুচ মৃধা, মাহবুব দেওয়ান, সেরাজ মাতবর, ধানদী গ্রামের আ. রহিম, শাহজাহান মাতবর, ভরিপাশা গ্রামের আলমগীর গাজীসহ অনেক কৃষক জানান, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে আমন ধান পাকার এই মুহুর্তে শীষকাটা লেদা পোকা আর ফলস স্মার্ট রোগের আক্রমন দেখা দিয়েছে। নানা বিপর্যয় কাটিয়ে আগাম জাতের আমন ধান কাটার পর কেউ কেউ বাজারে প্রতিমন ৯৭০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন।

কিন্তু আমন কাটার ভরা মৌসুমে গাছের গোড়ার দিকে লুকানো লেদা পোকা ধানের শীষ কেটে সর্বনাশ করছে। দিনের বেলায় পোকা গাছের গোড়ায় লুকিয়ে থাকে আর রাতে শীষকাটে। পোকা ধান খায় না। তবে শীষ ও শীষের কানা কেটে ধান ঝড়িয়ে বিনস্ট করছে।
সরেজমিন ক্ষনিকাটা (শীষ কাটা) লেদা পোকার আক্রমনে স্থানীয় মাপের প্রায় ৮০ শতাংশ জমির আধাপাকা ইরি ধানের ক্ষেতে কীটনাশক স্প্রে করতে দেখা যায় সুলতানাবাদ গ্রামের হারুন দেওয়ানকে। জানেত চাইলে স্প্রে করা বন্ধ করে ধান গাছের গোড়ায় খুঁজে কয়েকটি লেদা পোকা তুলে হাতের তালুতে রেখে দেখান। তার ধান ক্ষেতের লেদা পোকায় কাটা আধা-পাকা ঝড়া ধান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
আবার দক্ষিন সুলতানাবাদ গ্রামের অনেকের ক্ষেতে ধানের শীষে ফলস স্মার্ট নামে ল²ীর গু বা ভূয়াঝুল নামে কালো কালো গুটি দেখা গেছে। কোন কোন ক্ষেতে আছে এর ব্যাপকতা। যে শীষে এ রোগের আক্রমন দেখা যায় সেই শীষের ধানের চাল নস্ট হয়েছে।
এক ধরণের ছত্রাক ধানের বাড়ন্ত চালকে নস্ট করে বড় বড় গুটিকা সৃষ্টি করে আছে। গুটিকার ভেতরে হলদে কমলা রং এবং বহিরাবরণ সবুজ অথবা কালচে। সহজে ও কম খরচে আলোর ফাঁদ, আক্রান্ত জমিতে গর্তকরে পাতা জমিয়ে রেখে সেখানে এগুলোকে আশ্রয় নিতে দিয়ে, পাকা শুরু হওয়ার আগে কেরশিনে ভিজিয়ে ধানের ওপর রশি টেনে দিয়ে ও আক্রান্ত ক্ষেতের অংশের চারপাশে ছাঁই ছিটিয়ে দিয়ে পোকাগুলো মেরে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লান্ট ফাইটোলোজির এসোসিয়েট প্রফেসর ড. শাহ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘অতি বৃষ্টিপাতের মতো আবহায়ার বিরুপ প্রভাব, রোদ, তাপমাত্রা, শীত, গাছের শক্তিমত্তা এসব কারণে বংশবৃদ্ধি ঘটে পোকার আক্রমন হতে পারে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পোকা দমন ও চাসবাসে কৃষক-কৃষাণীর সচেতনতা সৃষ্টি খুবই জরুরী হয়েছে।’ প্রাথমিক স্টেজে সচেতন থেকে কৃষদের উচিত এ মথগুলো মেরে ফেলা বা কন্টোলে নিয়ে আসা। কৃষি বিভাগেরও উচিত এ শীষ কাটা মথটিকে কৃষকদের চিনিয়ে দিয়ে সচেতন করা।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যানটোমোলোজির প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দক্ষিনাঞ্চলে এ ধরণের অবস্থা প্রায়ই হয়ে থাকে। ১০-১২ বছর আগে একবার পাতা মোড়ানো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল। গত তিন বছর আগে একবার কারেন্ট পোকা বা ধানের বাদামি পোকার আক্রমন হয়। লেদা পোকার আক্রমনের কথা গত বছরেও জানা গেছে। পরিমিত মাত্রায় বৃষ্টিপাত না হওয়া, তাপমাত্রা কিংবা গাছ থেকে গাছের দূরত্বের কারণে পাতার সংখ্যাা বেড়ে গিয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ধানের শীষকাটা লেদা পোকার আক্রমন হতে পারে। শীষ যখন বের হয়ে আসে তখন শীষ কাটা এই লেদা পোকা আক্রমন করে।
বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘চন্দ্রদ্বীপ, ধুলিয়া, নাজিরপুর এলাকায় লেদা পোকার আক্রমনের কথা জানা গেলেও তা আগের বছরের মতো বড় ধরণের কোন সমস্যা সৃষ্টি করবে না। কৃষকের ক্ষেতের ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেছে। পাকা ধান কেটে নেয়াসহ আমরা সার্বক্ষনিক নজর রেখে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। ফলস স্মার্ট সম্পর্কে কৃষকদের ভ্রান্ত ধারণা আর প্রতিকারে বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।’
আনন্দবাজার/শহক








