দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে কার্বহাইড্রেট গ্রহণের মাত্রা কমে আসছে। পাল্টে যাচ্ছে খাদ্যাভাসের রীতিনীতিও। খাদ্য হিসেবে চালের পরিবর্তে গম বা আটার ব্যবহার বাড়ছে বাংলাদেশেও। আগে শুধু আটার রুটি খাওয়ার প্রবণতা দেখা গেলেও বর্তমানে গম দিয়ে তৈরি নানা জাতীয় খাবারের বৈচিত্র বেড়েছে। দেশে আটা, ময়দার ওপর নির্ভর করে কারাখানাও গড়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পশুখাদ্য হিসেবে গমের নানামুখী ব্যবহার বেড়েছে। ফলে দেশে গমের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
তবে গমের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উৎপাদন বাড়েনি। বরং নানা কারণে গম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন দেশের চাষিরা। ফলে দেশে উৎপাদিত গম দিয়ে মাত্র ১৩ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে। বাকি ৮৭ শতাংশ চাহিদার জন্য তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে আমদানির ওপর। বিশেষ করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গম উৎপাদনকারী প্রতিবেশী দেশ ভারতের ওপর বেশি নির্ভরশীল বাংলাদেশ। তবে মাস দুয়েক আগে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গম আমদানিকারক দেশ ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় শঙ্কায় পড়তে হয় বাংলাদেশকে। এর মধ্যেই আবার ভারত অভ্যন্তরীণ বাজারে গমের দাম কমাতে রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি শঙ্কায় পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দেশের গৃহস্থালি, রেস্তোরাঁ ও বেকারি শিল্পে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় জুলাই থেকে শুরু হওয়া বিপণন বছরে গমের চাহিদা ৬ শতাংশ বেড়ে হবে ৮৪ লাখ টন হয়েছে। তবে বেড়ে যাওয়া সেই চাহিদার প্রায় ৮৮ ভাগই মেটাতে হবে আমদানির মাধ্যমে। ইউএসডিএ জানায়, কৃষকরা ২০২১-২২ বিপণন বছরে ৩ দশমিক ২০ লাখ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ করেছেন। যা এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ৪ শতাংশ কম। জুনে শেষ হওয়া বিপণন বছরে কৃষকরা ১১ দশমিক ৩ লাখ টন গম পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ২০২১-২২ বিপণন বছরে দেশের গম আমদানি ৩ শতাংশ বেড়ে হবে ৭৪ লাখ টন।
ইউএসডিএর প্রতিবেদনে বলা হয়, গবাদি পশুর খাবার হিসেবেও বর্তমানে প্রচুর গমের দরকার হচ্ছে। প্রাণীর খাদ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনে গমের ব্যবহার ২০২১-২২ বিপণন বছরে বেড়ে হয়েছে ছয় লাখ টন। যা আগের বছরের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। গত বছরের জুলাই-অক্টোবরে উচ্চমূল্য ও জাহাজীকরণ খরচ বাড়ায় দেশের গম আমদানি ছিল অনেক কম। ২০২১-২২ বিপণন বছরের প্রথম চার মাসে আমদানি কম হওয়ায় ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে পরবর্তী আট মাসে আমদানি ব্যাপকভাবে বাড়বে।
বাংলাদেশের কৃষি তথ্য সার্ভিস-এআইএসের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ৭০ লাখ টন বার্ষিক চাহিদার বিপরীতে গমের উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১১ দশমিক ৫৩ লাখ টন। বহুবিদ ব্যবহার ও মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে প্রতিবছর এ চাহিদার পরিমাণ প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও গমের উচ্চফলনশীল নতুন জাত ও আধুনিক উৎপাদন কলাকৌশল গ্রহণের ফলে সম্প্রতি গমের উৎপাদন বেড়ে গেছে। গত ২০১৭-১৮ মৌসুমে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৩ দশমিক ২৮ টনে উন্নীত হয়েছে।
নিম্ন ও মধ্যমআয়ের দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক জনসংখ্যার চাপ এবং মাথাপিছু আয় বাড়ার কারণে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিশ্বে গমের বাণিজ্য বেড়েছে। ইউএসডিএ-এর তথ্য বলছে, গমচাষিরা চলতি মৌসুমে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন একর জমি থেকে গম সংগ্রহ করেছেন, যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যাপক উৎপাদনশীল ফসলে পরিণত করেছে। জাতিসংঘের এফএও-এর মহাপরিচালক কু ডংইউ-এর মতে, গম বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশেরও বেশি মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য।
এফএও-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০টি দেশ তাদের মোট গম আমদানির ৩০ শতাংশেরও বেশির জন্য রাশিয়া ও ইউক্রেনের ওপর নির্ভরশীল। মিশর, তুরস্ক, বাংলাদেশ এবং ইরান তাদের আমদানি করা গমের অন্তত ৬০ শতাংশ এই দুই দেশ থেকেই করে থাকে।
এদিকে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গম উৎপাদক ভারত থেকে গম আমাদানির অন্যতম দেশ বাংলাদেশ। বিগত ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে ২৯৯ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলারের ১১ লাখ ৫৭ হাজার ৩৯৯ টন গম রপ্তানি করেছে ভারত। দেশটির মোট গম রপ্তানির ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশই বাংলাদেশে রপ্তানি হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে বছর ভারতীয় গমের শীর্ষ ১০ ক্রেতা ছিল বাংলাদেশ, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, শ্রীলঙ্কা, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, কাতার, ইন্দোনেশিয়া, ওমান ও মালয়েশিয়া। সম্প্রতি দেশটির ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড (ডিজিএফটি) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে এবং অন্যান্য দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রয়োজন ও তাদের সরকারের অনুরোধের ভিত্তিতে গম রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে।
এফএও এর মতে, বাংলাদেশের চাষিরা গম আবাদ ছেড়ে অধিক লাভের জন্য আলু, সবজি ও বোরো ধানের মতো বিকল্প চাষাবাদে ঝুঁকছেন। সে কারণে গমের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশে গমের মোট চাহিদার প্রায় ১৩ শতাংশ মেটানো সম্ভব হবে স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে।
ইউএসডিএ জানায়, কৃষকরা বাংলাদেশের ২০২১-২২ বিপণন বছরে ৩ দশমিক ২০ লাখ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ করেছেন, যা এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ৪ শতাংশ কম। স্থানীয় গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে ইউএসডিএ জানাচ্ছে, দেশের বিস্কুট ও বেকারি শিল্পে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আটা ব্যবহার করে। চার হাজার ৫০০-এর অধিক গতানুগতিক বিস্কুট কারখানা এবং ১১০টি আধুনিক স্বয়ংক্রিয় কারখানা ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ দশমিক ১০ লাখ টন বিস্কুট ও কুকিজ উৎপাদন করেছে। যার দাম প্রায় ৮২৪ মিলিয়ন ডলার। সংস্থাটির তথ্যমতে, বিশ্ববাজারে গমের ব্যাপক দামের কারণে দেশের খুচরা বাজারেও আটার দাম বেড়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্বে সংকট থাকায় তুলনামূলক কম প্রোটিন সমৃদ্ধ গমও এখন আমদানি করা হচ্ছে। আগে ইউক্রেন, রাশিয়া ও আর্জেন্টিনা থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ প্রোটিন সমৃদ্ধ গম আমদানি হতো। এখন ভারত থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ প্রোটিন সমৃদ্ধ গমও আমদানি করা হচ্ছে। প্রতি টনের দাম প্রায় ৪০০ ডলার।
খাদ্য সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন, গম আমদানি অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে আড়াই লাখ টন গমের ওয়ার্কঅর্ডার দেওয়া আছে। এর মধ্যে ভারত থেকে আগামী ১৫ বা ১৬ মের মধ্যে দেশে এক লাখ টন গম এসে পৌঁছবে। তাছাড়া গম আমদানিতে কোনো শুল্ক্ক না থাকায় বেসরকারিভাবে সবসময় আমদানি হচ্ছে। তিনি বলেন, এতদিন গম আমদানির জন্য শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে চুক্তি ছিল। কিন্তু সম্প্রতি বুলগেরিয়ার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, দেশটি এক লাখ টন গম দিতে ইচ্ছুক। এ ছাড়া বিকল্প দেশ সন্ধান করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নশিপুর, দিনাজপুরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে উদ্ভাবিত গমের ৩৩টি জাতের মধ্যে ২০১০ সাল থেকে অদ্যাবধি যে ৯টি গমের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে সেগুলো পরিবর্তিত আবহাওয়াতেও ভালো ফলন দিচ্ছে। তবে বারি গম ২৬ জাতটি গমের ব্লাস্ট রোগ সংবেদনশীল হওয়ায় ব্লাস্ট প্রবণ এলাকা বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আবাদ না করে বারি গম ৩০ (গমের ব্লাস্ট রোগ সহনশীল) ও বারি গম ৩৩ (গমের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী) জাতের আবাদ করা নিরাপদ ও উত্তম। তা ছাড়া বারি গম ৩৩ জাতটি জিঙ্কসম্মৃদ্ধ ও সহজে হেলে পড়ে না।
আনন্দবাজার/শহক









