বাবু চন্দ্র দাস। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে মুচির কাজ করছেন। বসেনে রাজধানীর বাংলা মোটরের সিআর দত্ত রোডের ঢালে। সূর্যদয় হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলে পরিশ্রম। তবে তিনি একা নন, বড় ভাইসহ যাত্রাবাড়ী থানার গোপীবাগ ঋষিপাড়া মহল্লার হাজারখানেক লোক এই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। সামান্য পুঁজি নিয়ে সিআর দত্ত রোডের ঢালে বাবুর দোকান শুরু।। কয়েকটি পুরানা ব্রাশ, জুতা পরিষ্কারের ব্রুস, ক্রিমের কয়েকটি কৌটা, কিছু সুতা ও সলিউশনের ডিব্বা- এই তার সম্বল। সব মিলে চার হাজার টাকার পুঁজি।
বাবু চন্দ্র জানান, যাত্রাবাড়ী থেকে আগে বিশ টাকা ভাড়া দিয়ে কর্মস্থলে আসতেন। বাজারে পণ্যের দাম বাড়ায় এই ভাড়া আরও ১০ টাকা বেড়ে গেছে। মাসে সাড়ে ৫শ টাকার জায়গায় এখন খরচ হবে সাড়ে ৭শ টাকা। তার দৈনিক উপার্জন চার হতে ৫শ টাকা। কোনোদিন আরও কম। ঝড়-বৃষ্টিতে দোকান খোলাই যায় না। তখন অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয়।
বাবা-মা, বড় ভাই ও ভাবি, নিজের স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, ভাতিজা-ভাতিজিসহ পরিবারে তাদের সদস্য সংখ্যা ১২। প্রতিদিন দুই ভাইয়ের খাবার ও আনুষঙ্গিক খরচ প্রায় চারশ টাকা। বাবু আরো জানালেন, দুই ভাই একটি বাসায় থাকেন, যার ভাড়া ৫ হাজার টাকা। দুই জনের খাবার মিলে খরচ হয় ৬ হাজার টাকা। সবমিলে দুজনের খরচ প্রায় ১২ হাজার টাকা।
নারায়ণগঞ্জে থাকা পরিবারের সদস্যদের জন্য চাল, ডাল তরিতরকারি, ওষুধ কিনতে সবমিলে সাড়ে ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ। দুইভাই ও পারিবারিক খরচ মিলে সাড়ে ২২ বা ২৩ হাজার টাকা। তিনি বলেন, দুই ভাই মিলে ২৪-২৫ হাজার টাকা উপার্জন করতে পারেন। তাতে কোনো রকমে সংসার চলে যায়। তবে এখন এই খরচ বেড়ে যাবে আরও অন্তত তিন হাজার টাকা। সে ক্ষেত্রে আয়ের পথ তো বাড়েনি। কারণ ইচ্ছা করলেই এক জুতায় পাঁচ টাকা বাড়ানো যায় না। কাস্টমার দেবে না। বাবু জানান, সরকারি কোনো সহযোগিতা তাদের ভাগ্যে জোটেনি। করোনায় দোকান বন্ধ ছিল তখন ঋণ করে চলতে হয়েছে। বাবার সামান্য এক টুকরা জমিতে বাড়ি। ক্ষুদ্রঋণ তাদের ভাগ্যে জুটে না। পায় না কোনো ধরনের অনুদানও।
পাভেল নামের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলেন, এসব ক্ষুদ্রব্যবসায়ীদের সরকার সুদবিহীন স্বল্পঋণ দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে। তাদের ভোটার আইডি কার্ডের নাম্বার ও ছবি নিয়ে ডাটা তৈরি করতে পারে। তাদের ২০ হাজার টাকা ঋণ দেবে। সেসব ঋণ তারা দুই বছরে পরিশোধ করবে। বাবু জানালেন, অনেকবার তাদের নাম নেয়া হলেও অনুদানের কোন টাকা আর পাননি। জুতার রং, সুতা, চামড়া ও অন্যান্য সামগ্রী কিনতে হয়। এসব কিনতে কিছু টাকা জমা করেন তিনি।
সরকারি ক্ষুদ্রঋণ সম্পর্কে বলেন, সব ঋণ তো বড় লোকেরা নিয়ে যায়। এই দেখুন জুতার সোল্ডার কেনার জন্য অগ্রিম টাকা নিলাম কাস্টমারের কাছ থেকে। আমাদের ঋণ দিলে তো মেরে দিয়ে চলে যাব না। জীবন থাকতে ঋণ শোধ করে দেবই আমরা। সরকার আমাদের জন্য কিছু একটা করুক। উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ দিক। সত্যি বলতে কি গরীবের ভাগ্যে কিছুই নাই।
আনন্দবাজার/শহক








