আর্থিক সহায়তা পেলে বৃহৎ আকারে ডিজেল তৈরির মেশিন স্থাপন ও বাজারজাত করা সম্ভব: জিয়াউর রহমান
পলিথিন থেকে ডিজেল তৈরি কতটা পরিবেশবান্ধব তা যাচাই করে পদক্ষেপ নেব: ইউএনও, সুন্দরগঞ্জ
পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিনকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে জ্বালানি তেল ডিজেল ও বায়োগ্যাস তৈরির কারখানা স্থাপন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন গাইবান্ধা জেলার লেদমিস্ত্রি জিয়াউর রহমান জিয়। কারখানায় উৎপাদিত ডিজেল বিক্রি করে প্রতিদিন হাজার টাকা আয় করছেন তিনি। এতে একদিকে তার পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে, অন্যদিকে তার কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে ডিজেল কিনে দিব্বি চলছে স্থানীয় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। জিয়ার আশা, সরকারের সহায়তা পেলে তিনি পরিবেশ ধ্বংসকারী পলিথিন থেকে ডিজেল ও বায়োগ্যাস তৈরির কৌশল ছড়িয়ে দিতে পারবেন। তাতে দেশের জ্বালানি চাহিদার কিছুটা যেমন পূরণ হবে, তেমনি ক্ষতিকর পলিথিন থেকে রক্ষা পাবে পরিবেশ।
সরেজমিনে জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাংগা ইউনিয়নের রামভদ্র গ্রামের ওয়ার্কশপে গিয়ে কথা হয় লেদ মিস্ত্রি জিয়াউর রহমান জিয়ার সঙ্গে। তিনি রাস্তায়, জমিতে ও পরিবেশ নষ্ট করে এমন পলিথিনকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভাবছিলেন করছিলেন। শেষ পর্যন্ত বিগত ২০১৯ সালের শুরুর দিকে পরিত্যাক্ত ও পরিবেশ বিনষ্টকারী পলিথিন কুড়িয়ে জমা করতে থাকেন তার বাড়িতে। তারপর তিনটি ড্রাম দিয়ে তৈরি করেন পলি রি-সাইক্লিং মেশিন। এতে তার ব্যয় হয় ৮০ হাজার টাকা।
জিয়াউর রহমান জিয়া সেই মেশিনে বা ড্রামে পলিথিনের মন্ড ভরিয়ে নিচে আগুন লাগিয়ে গরম করতে থাকেন। এতে পলিথিন গলে গিয়ে তৈরি হয় ডিজেল ও বায়োগ্যাস। ড্রাম ফুটো করে পাইপ লাগিয়ে অন্য ড্রামে উৎপাদিত ডিজেল সরিয়ে নেন। অন্য আরেকটি পাইপে জ্বালানি ও বায়োগ্যাস। এই জ্বালানি স্থানীয় স্যালো মেশিন, ট্রাকটর, ভটভটিতে লাগানো ইঞ্জিনে ব্যবহার উপযোগী।
জিয়াউর রহমানের রি-সাইকিলিং মেশিন থেকে প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ২০ লিটার ডিজেল তৈরি হয়। বাজারে প্রতিলিটার ডিজেল ১১২ টাকা হলেও তিনি বিক্রি করেন ৮০ টাকা করে। এতে প্রতিদিন তার বিক্রি হয় ৮শ থেকে ১৬শ টাকা পর্যন্ত। খরচ বাদে জিয়ার মাসে গড়ে ৩০ হাজার টাকা আয় হয়।
জিয়াউর রহমানের উৎপাদিত ডিজেল কিনে নিচ্ছেন চাষিরা। সেচ পাম্পে ব্যবহার হচ্ছে। এতে সাশ্রয় হচ্ছে তাদের। পলিথিন থেকে ডিজেল তৈরির ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের সফলতার গল্প এখন মুখে মুখে। তার সংসারেও যেমন সচ্ছলতা ফিরেছে তেমনি হাতের কাছেই স্বল্প দামে ডিজেল মেলায় খুশি এলাকার মানুষও। তার ডিজেলেই চলছে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বহু যানবাহন। তাছাড়া বাড়িতে ব্যবহার হচ্ছে বায়োগ্যাস। জিয়ার বলেন, আর্থিক সহায়তা পেলে তার স্থাপন করা ডিজেল ও বায়োগ্যাস তৈরির মেশিন সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পারবেন।
গ্রামবাসী ও ডিজেল ক্রেতা সরফ উদ্দিন, মজনু মিয়া, আব্বাস আলী, বদর উদ্দিন বলেন, এই ডিজেল দিয়ে সুন্দরগঞ্জের অধিকাংশ ভাটার যানবাহনগুলো চলাচল করে । শুধু তাই নয় তার এই আবিষ্কারের জন্য আমরা গর্বিত। ডিজেল ক্রেতা তবিবর রহমান বলেন, পলিথিন থেকে তৈরি ডিজেলের দামও কম। তাছাড়া বাজারে জ্বালানি তেলের চাহিদা বেশি থাকায় দামও বেশি। তবে বাজারে দামের চেয়ে অনেকটা কম দামে পাওয়া যায় জিয়ার ডিজেল।
জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম পরিবেশ ধ্বংসকারী পলিথিন কীভাবে কাজে লাগানো যায়। সেই ভাবনা থেকেই হাটবাজারসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে পরিত্যাক্ত পলিথিন সংগ্রহ করে পরীক্ষামূলকভাবে নিজ বাড়ির উঠোনে কাজ শুরু করি। তিনটি ড্রামে পলিথিনের কুণ্ডলি বানিয়ে নিচে আগুন দিয়ে জ্বালানি তেল ও বায়োগ্যাসের উপস্থিতি দেখি। এরপর উৎপাদন প্রক্রিয়া আরও উন্নত করি। তিনি মনে করেন, আর্থিক সংকট না থাকলে বৃহৎ আকারে ডিজেল তৈরির মেশিন স্থাপন ও বাজারজাত করা সম্ভব। এব্যাপারে তিনি সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে সহায়তা চেয়েছেন।
সুন্দরগঞ্জের সর্বানন্দ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম বলেন, পলিথিনের বর্জ্য ব্যবহার করে ডিজেল তৈরি করেছে জিয়াউর। মানুষ তার কাছ থেকে কমদামে ডিজেল সংগ্রহ করে ব্যবহার করছে। তার এই আবিষ্কার আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।
সুন্দরগঞ্জের ইউএনও আল মারুফ বলেন, শুনেছি জিয়াউর রহমান একজন লেদমিস্ত্রি। অনেক চেষ্টার পর পরিত্যাক্ত পলিথিন আগুনে পুড়িয়ে ডিজেল তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। এই তেল বিভিন্ন যানবাহনে ব্যবহার হচ্ছে। আর্থিক সাহায্য ও অনুমতির জন্য আবেদন করেছেন। তবে বিষয়টি কতটা পরিবেশবান্ধব তা যাচাই করে পদক্ষেপ নেব।









