ফুলকপির গল্প----------- শনিবারের বিশেষ
- লালমনিরহাটে কেজি ১০ টাকা, মৌলভীবাজারে ৬০
- মাংস দিয়ে বরিশালে, সিলেটে ভাজিতে
- ৫০ দেশে ৫০ প্রকার সবজি রফতানি
- সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়
- ৪৫ বছরে উৎপাদন বেড়েছে ৫ গুণ
পোড়া পোড়া বা অর্ধসিদ্ধ ভাজি হিসেবে ফুলকপি আপনার পাতে আসলে স্বাদই যাবে বদলে। আর সামান্য ডিম দিয়ে ভাজি করলে তো কথাই নেই। আবার মাছ, মাংসে তরকারি, ঝুল, সালাদ, পাকুরা, শিশুদের খাবার, খিচুড়িসহ নানাভাবে খাবার টেবিলকে সমৃদ্ধ করে ফুলকপি। ফুলের পাপড়িতে ভরপুর থাকলেও ফুলকপি মূল এক ধরনের শীতকালীন সবজি। দেশের প্রায় সব জায়গাতেই এটির আবাদ রয়েছে। দেশে কবে থেকে ফুলকপি চাষ এই তথ্য পাওয়া না গেলেও এটি যে সাইপ্রাসে প্রথম উদ্ভব হয় তা জানা যায় বাংলা পিডিয়ার মাধ্যমে।
ফুলকপির দাম নিয়ে দেশের ৮টি বিভাগে রয়েছে বিশাল পার্থক্য। কোথাও কোথাও এটি কেজি ধরেও বিক্রি হয়ে থাকে। যদিও এটি নতুন ব্যবস্থা। সাধারণত দেশে পিস বা আকার অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। ঢাকায় সোহাগ নামের একজন ক্রেতা জানান, এখানে মাঝারি ধরনের ফুলকপির দাম ২০ টাকা। কেজি ধরে হিসাব করলে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। তবে আকার-আকৃতি ছোট-বড়র কারণে দামেও বেশ পার্থক্য দেখা যায়। আবার এলাকাভিত্তিক কারণেও দাম কম-বেশি হয়।
রাজশাহী বিভাগের ইলিয়াস আরাফাত জানান, সেখানে কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে সবজিটি। প্রতিকেজি ফুলকপির জন্য ক্রেতাদের দিতে হয় ৪০ টাকা। ফুলকপি দিয়ে মাংস রান্না করে বেশি খায় বরিশাল অঞ্চলের মানুষ। এদিকে দামটিও কিছুটা চড়া। বরিশালের হাসিবুল ইসলাম জানান, ৪৫ টাকা প্রয়োজন এককেজি ফুলকপি ক্রেতার ব্যাগে তুলতে হলে। বরিশালে নদীর সংখ্যাও বেশি। মাছ ও মাংসের সাথে সেখানে খাবারটি বেশি পছন্দ করেন বলে জানান কামাল নামের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ঢাকাতে সাধারণত ভাজি ও মাছের সঙ্গে ফুলকপি খেলেও বরিশালে মাংসের তরকারিকে সমৃদ্ধ করে ফুলকপি। ফুলকপির ডাঁটা ও সবুজ পাতায় প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। সুতরাং ফুলকপির ডাঁটা ও কচি সবুজ পাতা খেয়ে দেহের ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণ করা সম্ভব বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অভিমত। খনিজ পদার্থের মধ্যে মানবদেহে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
খুলনা বিভাগের যশোরে ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয় ফুলকপি। তবিবুর রহমান নামের এক ক্রেতা জানান, দামটি অনেক উঠা নামা করে। তবে সাধারণত ২৫ বা ৩০ টাকার মধ্যেই থাকে। রেজাউল হক ডালিম জানান, সিলেটে সাধারণত ভাজি আর তরকারিতে ফুলকপির ব্যবহার। এখানে প্রতিকেজির জন্য গুনতে হয় ৫০ টাকা। তিনি বলেন, সিলেটে অন্য কাজে খুব কমই ফুলকপি ব্যবহার হয়। মৌলবীবাজারে বিক্রি হয় সর্বোচ্চ ৬০ টাকা দামে। সবচেয়ে কম দামে ফুলকপি বিক্রি করেন রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট জেলার কৃষকরা। মো. রবিউল হাসান নামের এক ক্রেতা বলেন, জেলাটিতে ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হয় সবজিটি। তবে এখানে সাধারণত পিস হিসেবেই কেনাবেচা হয়। ময়মনসিংহ বিভাগে ফুলকপি বিক্রি হয় পিস হিসেবে। আকার-আকৃতির ওপর দাম কম বেশি হয়। রাকিবুল হাসান রুবেল জানান, ময়মনসিংহ শহরে ২৫ টাকা পিসে কেনা যায় একটি ফুলকপি।
বাংলাদেশ কৃষিতথ্য সার্ভিসের মতে, ফুলকপি শীতের প্রধান জনপ্রিয় সবজি। তরকারি বা কারি ও স্যুপ তৈরি করে, বড়া ভেজে ফুলকপি খাওয়া হয়। তবে শীতের সবজি হলেও ফুলকপি এখন গ্রীষ্মকালেও উৎপাদিত হচ্ছে। দেশে এখন পঞ্চাশটিরও বেশি জাত পাওয়া যাচ্ছে। শীতকালেই আগাম, মধ্যম ও নাবী মৌসুমে বিভিন্ন জাতের ফুলকপি আবাদ করা যায়। এ ছাড়া গ্রীষ্মকালে চাষের উপযোগী জাতও আছে। ফুলকপি এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। বাংলাদেশ সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ১২.৫২ লক্ষ হেক্টর জমি থেকে ২৬৮.১৬ লক্ষ টন সবজি উৎপাদিত হয়েছে। দেশে প্রায় ১০০টি জাতের সবজি উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে ৫০টি সবজি বিশ্বের ৫০টি দেশে রফতানি হচ্ছে। তার মধ্যে ফুলকপি অন্যতম।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-ইপিবির দেয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১৩ কোটি ডলারের শাকসবজি রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রফতানি হয়েছে ১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এর আগের অর্থবছরে রফতানি আয় ছিল ৯ কোটি ৯৭ লাখ ডলার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে রফতানি ছিল চার কোটি ৬৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার। দশ বছরে রফতানি আয় বেড়েছে প্রায় চার গুণ। ২০২০-২১ অর্থবছরে সারাদেশে ৯ লাখ ২১ হাজার হেক্টর জমিতে শীত ও গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেয়া হয়।
ইপিবির তথ্য আনুযায়ী, ২০১৭ সালে বৈশ্বিক সবজি রফতানির পরিমাণ ছিল ৭২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ওই সময়ে চীন ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সবজি রফতানি করে শীর্ষস্থান দখল করে। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান দখল করে নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও মেক্সিকো। দেশ চারটির রফতানির পরিমাণ যথাক্রমে যেখানে ১১ দশমকি ২, ৭ দশমিক ৫, ৬ দশমিক ৮ ও ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে বাংলাদেশের রফতানি মাত্র ৭৭ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৮ এর তথ্যে দেখা যায়, অর্থনৈতিক খাত হিসেবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপিতে স্থির মূল্যে কৃষি খাতের অবদান শতকরা ১৪.২৩ ভাগ তার মধ্যে কেবল শস্য ও শাকসবজি উপখাতের অবদান শতকরা ৭.৫১ ভাগ। দেশের মোট শ্রমশক্তির শতকরা ৪০.৬২ ভাগ কৃষিতে নিয়োজিত। অপরদিকে দেশের মোট ফসলি জমির প্রায় ৫ ভাগ অর্থাৎ আবাদযোগ্য জমির প্রায় ১০ ভাগ সবজি উৎপাদনে ব্যবহৃত।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশে সবজি উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫ গুণ। বর্তমানে দেশটিতে বছরে এক কোটি ৭২ লাখ টন সবজি উৎপাদন হচ্ছে। দেশের ১ কোটি ৬২ লাখ কৃষিপরিবার সবজি চাষের সাথে সম্পৃক্ত। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার স্যাটিসটিক্যাল ইয়ার বুক -২০১৩ অনুযায়ী ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি হারে সবজি আবাদী জমির পরিমাণ বেড়েছে বাংলাদেশে। বৃদ্ধির এহার শতকরা ৫ ভাগ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে দেশে ৬০ ধরনের ও ২০০টি জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। এসব সবজির ৯০ শতাংশ বীজই দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। দেশের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উন্নত জাত এবং সরকারের বিভিন্ন সহায়তার সঙ্গে কৃষকের শ্রম যুক্ত হয়েই এসেছে আজকের সফলতা।
বাংলা পিডিয়ার তথ্য মতে, ফুলকপি সম্ভবত সাইপ্রাসে প্রথম উদ্ভব। পরে বিস্তার গোটা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। বিশেষত ইতালিতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৩০ দিনের চারা রোপণ করা হয় অক্টোবর-নভেম্বরে। বাংলাদেশে তিন জাতের ফুলকপির চাষ হয়। আগাম জাত কার্তিকা, পাটনাই, ট্রপিক্যাল-৫৫ ইত্যাদি। মধ্য-মৌসুমি জাতের মধ্যে রয়েছে অগ্রহায়ণী, পৌষালি ও স্নোবল এবং নাবি জাতের মধ্যে রয়েছে হোয়াইট মাউন্টেন, মাঘী ও নাবি-রাক্ষসী। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘রূপা’ নামের একটি উচ্চফলনশীল মধ্য-মৌসুমি ফুলকপি উদ্ভাবন করে। দেশের সর্বত্র চাষ হলেও টাঙ্গাইল জেলায় সবচেয়ে বড়জাতের ফুলকপি জন্মে। হেক্টর প্রতি ফলন ২০-২৫ টন। বারি ফুলকপি-১-এর ফলন হেক্টর প্রতি ২৫-২৮ টন এবং বীজের ফলন ৪৫০-৫০০ কেজি।
পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম ফুলকপিতে পুষ্টি উপাদানের মধ্যে রয়েছে আমিষ ২.৬ গ্রাম, শর্করা ৭.৫ গ্রাম, চর্বি ০.১ গ্রাম, খনিজ লবণ ০.৮ গ্রাম, খাদ্য আঁশ ২ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৪১ মিলিগ্রাম, লৌহ ১.৫ মিলিগ্রাম, খাদ্যশক্তি ৪১ কিলোক্যালরি, ফসফরাস ৫৭ মিলিগ্রাম, পটাসিয়াম ২৯৯ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ১৫ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ৫৩ মিলিগ্রাম, নিকোটিনিক এসিড ১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-১০.০২ মিলিগ্রাম, বি-২০.০৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৯১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ই ০.০৮ মিলিগ্রাম, ভিটামিন কে ১৫.৫ মাইক্রোগ্রাম, ফলেট ৫৭ মাইক্রোগ্রাম।
চিকিৎসকদের মতে, ফুলকপিতে কোলাইন নামের একটি যৌগ থাকে। কোলাইন ভিটামিন-বি। এটি মস্তিষ্কের উন্নয়নে সাহায্য করে। প্রেগনেন্সির সময়ে ফুলকপি খেলে ভ্রুণের মস্তিষ্কের গঠনে সাহায্য করে। জ্ঞান, শিক্ষা এবং স্মৃতির উন্নয়নে সাহায্য করে কোলাইন। সুস্বাস্থ্যের জন্য শরীরে নির্দিষ্ট পরিমাণ দহন হওয়া জরুরি। তবে দহনের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সেক্ষেত্রে ক্যান্সার বা এ ধরনের রোগের আশঙ্কা বেড়ে যেতে পারে। ফুলকপিতে রয়েছে ‘অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি নিউট্রিয়েন্টস’, যা শরীরের দহন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
আনন্দবাজার/এম.আর









