বিদায়ী শীতের কড়া রোদ। দুপুরের তেজ ছড়ানো রোদ মাথায় রাস্তার পাশে বসে আছেন কয়েকজন নারী। সবার হাতেই বাজারের ব্যাগ। দূরের রাস্তার মোড় পর্যন্ত তাদের দৃষ্টি প্রসারিত। কারো আসার জন্য অপেক্ষা। চোখে মুখে তাদের অসহায়ত্ব। খানিকটা দূরে মার্কেটের দোকানের পাশে রোদ এড়িয়ে কয়েকজন বসে আছেন। তাদের চোখে মুখেও চঞ্চলতা। দূরের রাস্তার মোড়ের দিকে দৃষ্টি।
দৃশ্যটি রাজধানীর রামপুরা সুপার মার্কেটের সামনের সড়কের। গতকাল শনিবার সকাল ৯টায় এসে সড়কে ও মার্কেটের পাশে বসে অপেক্ষা করছেন কয়েকজন নারী। তাদের অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না। তখন বেলা ঠিক ১১টা। কাছে গিয়ে কথা বলতে চাইলে কিছুটা বিরক্ত হন। বলেন, ‘ট্রাক আসতাছে, আপনিও বসেন। যা নিতে চান পাবেন’।
অপেক্ষমাণ নারীদের একজন সাহিদা বেগম। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। রাস্তার পাশে খররোদে বসে টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) ট্রাকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কয়েক ঘণ্টা কেটে গেছে। এখনও ট্রাকের দেখা পাননি। জানেনও না কখন আসবে। তবুও আশায় আছেন, এক সময় ট্রাক আসবে। বাজারের চেয়ে কম দামে কিনবেন চাল-ডাল-তেল-লবণ। যাতে কিছুটা সাশ্রয় হবে পরিবারের খরচের।
কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে সাহিদা জানান, রামপুরায় এক রুমের ভাড়া বাসায় মেয়ের সঙ্গে থাকেন তিনি। নাতি-নাতনি আর মেয়ে জামাইসহ চারজনের সংসার। বাসাভাড়া দিতে হয় সাড়ে চার হাজার টাকা। রিকশা চালানো আয়ের টাকায় কষ্ট করে কোনোমতে দিন পার করছেন। তবে সব জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় ছোট্ট পরিবারে দুশ্চিন্তা বেড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে গ্রামেরবাড়ি পিরোজপুরে ফিরতে হতে পারে আবার। এমন আশঙ্কা আর চাপা ক্ষোভ নিয়ে সাহিদা জানান, কিছুই করার নাই। কেউ তাদের নিয়ে ভাবে না।
নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে গেছে আগের চেয়ে বেশি। করোনা মহামারির ধাক্কা সামলে যারা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন তারা আবার রাজধানীতে টিকে থাকার সংগ্রামে নেমেছেন। টিসিবির ট্রাকের জন্য দুপুর একটা অবধি অপেক্ষা করে অনেক লোকজন চলে যাচ্ছিলেন। সেই সকাল থেকে আর কতক্ষণ বসে থাকা যায়- এমন হতাশার মধ্যেও সহিদা বেগম বলেন, ‘আল্লাহর দিকে চাইয়্যা.. থাকি বাইসা।’ তবে ট্রাক আদৌ আসবে কিনা তা জানেন না সাহিদা বেগম। তারপরও অপেক্ষা যদি আসে।

স্থান: রামপুরা সুপার মার্কেটের সামনে
ছবি: ইয়াহইয়া নকিব
শুধু সহিদা বেগমই নয়, ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ায় সম্প্রতি কম দামে পণ্য বিক্রি করা টিসিবি ও ওএমএসের ট্রাকের সামনে সব শ্রেণির মানুষেরই দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। কম দামে পণ্য কিনতে মধ্যবিত্তরাও আসছেন ট্রাকের সামনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা সমালোচনা চলছে।
সহিদা বেগমের মতো পরিস্থিতিতে পড়েছেন মধুবাগ বাজারে বুটিকের দোকানি মতিন (ছদ্মনাম)। দুই মেয়ে শিশু নিয়ে ছোট বাসা নিয়ে থাকতেন। তবে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি আর জীবনযাপনের ব্যয় বাড়ার কারণে বড় বাসা ছেড়ে এক রুমের সাবলেট নিতে বাধ্য হয়েছেন। এক যুগের বেশি সময় ধরে এলাকায় দর্জির কাজ করলেও এমন সংকটে আগে পড়তে হয়নি তাকে। দুই মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানোর খরচও বেড়েছে। তবে দোকনে আগের মতো স্কুল ড্রেস তৈরির অর্ডার পড়ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আয় রোজগারেও ভাটা পড়েছে। ব্যয় কমিয়ে সুসময়ের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া তিনি আর কোনো উপায় দেখছেন।

ছবি: ইয়াহইয়া নকিব
স্থান: রামপুরা সুপার মার্কেট
নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে টিসিবি থেকে তুলনামূলক কম দামে নিত্যপণ্য কেনার দিকে ঝুঁকি বেড়েছে প্রায় সবারই। ফলে ট্রাকের সামনে কম দামে পণ্য কেনার জন্য যেমন লাইন বাড়ছে, তেমনি ট্রাকের জন্য অপেক্ষাও বাড়ছে। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও বলেছেন, ‘ভালো ভালো পোশাক পরা মানুষদেরও এখন টিসিবির লাইনে দেখা যাচ্ছে।’
করোনার ওমিক্রন ধাক্কার মধ্যে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। গত কয়েক মাস ধরেই প্রতিনিয়ত দাম বেড়েই চলছে ভোগ্যপণ্যের। তেল, চাল, ডাল, পেঁয়াজ, চিনিসহ কোনো কিছুর দামেই যেন লাগাম টানা যাচ্ছে না। ক্ষেত্র বিশেষে বাজার কারসাজির কারণে এমনটা ঘটছে বলে অনেকেই বলছৈ। বাণিজ্যমন্ত্রী আর খাদ্যমন্ত্রীর একের পর এক হুশিয়ারি আর আশ্বাসে বাজার নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। উল্টো বাাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের কাছে সহায়তা চেয়েছেন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।
অন্যদিকে, বাজার পরিস্থিতি বলছে, শুধু এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল কিনতেই এখন ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ১৬৮ টাকা। খোলা ১৫৫ টাকা আর পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা লিটার। টিসিবির তথ্য বলছে, খোলা সয়াবিন তেলে বাৎসরিক মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ৩১ শতাংশের বেশি আর পাম অয়েলে ৩৭ শতাংশের বেশি। তবে টিসিবি থেকে ক্রেতাদের দুই লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল দেয়া হচ্ছে যার লিটারপ্রতি মূল্য ধরা হচ্ছে ১১০ টাকা। এছাড়া প্রতিকেজি চিনি ৫৫ টাকা ও মসুর ডাল ৬০ টাকায় কিনতে পারছেন ক্রেতারা। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতিকেজি খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ৭৬ থেকে ৭৮ টাকা আর মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজিতে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস), পিপিআরসি ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এর জরিপ অনুসারে, করোনাকালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সরকার এই দাবি নাকচ করলেও ২০২০ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) তাদের এক জরিপে মানুষের আয় ২০ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য দিয়েছে।
আনন্দবাজার/শহক








