জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি মানুষ সৃষ্ট দুর্যোগগুলোও বরেন্দ্র জনগণ এবং প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষতি ডেকে আনছে। তীব্র দাপদহ, খরা এবং জলবায়ু পরির্বতনের কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলে নতুন নতুন কিছু সংকট দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন খরার কারণে পানি সংকট আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। পানিকে কেন্দ্র করে বরেন্দ্র অঞ্চলের সমাজ ব্যবস্থায় সহিংসতা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকাগুলোতে ৩০ শতাংশ জমি কোনো না কোনোভাবে অনাবাদি থেকে যাচ্ছে। এমন কি কোনো এলাকায় তারও বেশি জমি পরিত্যক্ত জমি থেকে যাচ্ছে। একই সাথে প্রান্তিক কৃষক জমি হারাচ্ছে। সমীক্ষা এলাকায় ১০টি কেসস্টাডির মাধ্যমে দেখা যায় ১৯৭১ সাল থেকে জুন থেকে ২০২২ পর্যন্ত গড়ে অন্তত ১০টি পরিবার তার ৭০ ভাগ জমি হারিয়েছেন।
অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্পের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অস্বাভাবিক তাপমাত্রা উঠা নামার কারণে রেশম পলু পোকা পালনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন পলু পোকা চাষীরা। বেড়েছে তাদের উৎপাদন খরচও। বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্যতম লাক্ষা চাষেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গবেষণার প্রাথমিক সারসংক্ষেপ ও সার্বিক দিক বিবেচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী দেখা যায় এই অঞ্চলে গড়ে প্রতিবছর ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা গড়ে বাড়ছে। তীব্র তাপদহ এবং অনাবৃষ্টি বেড়েছে যাচ্ছে। এর ফলে মানুষ নানামূখী ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন। প্রান্তিক এবং আদিবাসী মানুষ তার জীবন জীবিকা হারাচ্ছেন। জীবন জীবিকার তাগিদে স্থানান্তরিত হচ্ছেন মানুষজন।
এদিকে, গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলটিতে নানা জাতিগোষ্ঠীর বসবাস এবং প্রাণ ও প্রকৃতির সহবস্থান। কিন্তু দিনে দিনে বৈশ্বিক জলবায়ুর আঞ্চলিক অভিঘাত এবং মনুষ্যসৃষ্টসহ নানা কারণে প্রাণবৈচিত্র্য ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে।
প্রকৃতির পাশাপাশি মানুষ সৃষ্ট নানান সদস্যার কারণেও বরেন্দ্রে প্রভাব পড়ছে। অস্বাভাবিক এবং অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহারের ফলে জনস্বাস্থ্য হুমকির মধ্যে পড়েছে।
আবার কীটনাশকের ব্যবহারের ফলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা তাদের ক্ষতি অনুযায়ী পায়না ন্যায্য ক্ষতিপূরণ। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সরকার প্রধান বার বার সকল ধরনের জমি ব্যবহার বৃদ্ধি করার কথা জানিয়েছেন। অথচ গবেষণায় উঠে এসেছে এই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন এবং স্থানীয়ভাবে আবহাওয়া ও খরার কারণে কিছু এলাকায় অনাবাদি জমির পরিমাণ বাড়ছে। আবার পানির অভাবে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়েছে।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, উঁচু-নীচু ভূমি, মাঠ, খাল-খাড়ি, বিল, নদ-নদী, পুকুর, প্রাকৃতিক জলাধার, বন আজ অনেকটাই হুমকির মুখে। প্রাণ ও প্রকৃতির উপর পরস্পর নির্ভরশীলতা কমে যাওয়ায় দিনে দিনে সহিংসতা বাড়ছে। একই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে বা বিলুপ্তির পথে স্থানীয় এলাকা উপযোগী উৎপাদনশীল নানা শস্য ও ফসলের জাত। কোন কিছু হারালে শুধু সেটিই হারিয়ে যায় না, তার সাথে যে সংস্কৃতি থাকে সেটিও হারিয়ে যায়।
বারসিক বরেন্দ্র অঞ্চল সমন্বয়কারি ও গবেষক শহিদুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, গ্রামীণ জনজীবনে তীব্র্র তাপদাহের প্রভাব, কৃষি জমির সংকট রূপ এবং সমাধানে করণীয় বিষয়ক মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানমূলক সমীক্ষা, কীটনাশকের অপব্যবহার, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় চলে এসেছে। এখন থেকে যদি সচেতন না হই তাহলে বরেন্দ্রের জন্য ভীষণ খারাপ সময় আসছে।









