জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে ‘দিন টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট’ পাস করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই) স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিন পরে ২০০০ সালে জাতীয় সমুদ্র বিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২০০০ সালের জুন থেকে ২০০৫ সালের জুলাই মেয়াদে ‘জাতীয় সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০০৯ সালে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে বিওআরআই প্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়। পরে ২০১৫ সালে জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট আইন পাস হয়। ২০১৭ সালে ইনস্টিটিউট-এর প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে পুর্ণাঙ্গরূপে বিওআরআই গবেষণা কার্যক্রম শুরু করে।
সমুদ্রবিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ, গবেষণালব্ধ ফলাফলের প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন করার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। কক্সবাজার থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণে রামুতে প্রায় ৪০ একর জায়গার নিরিবিলি স্থানে স্থাপিত হয় গবেষণা কেন্দ্রটি। এতে মূলভবন, আবাসিক ভবন, কোয়ার্টার, ডরমিটরী, গেস্ট হাউজ, ডিজি বাংলোসহ সব অবকাঠামোগত কাজের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। এতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সম্বলিত ৮টি আধুনিক ল্যাবরেটরি রয়েছে।
ছয়টি আলাদা বিভাগের মাধমে গবেষণা কার্যক্রম পরিচারিত হচ্ছে। বিভাগগুলো হলো- (১) ভৌত সমুদ্রবিদ্যা;(২) ভূতাত্ত্বিক সমুদ্রবিদ্যা; (৩) রাসায়নিক সমুদ্রবিদ্যা; (৪) জৈব সমুদ্রবিদ্যা; (৫) জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্র ও (৬) মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং। এতে ২২৩টি পদের মধ্যে ১০৩টি পদে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি পদে নিয়োগ কার্যক্রম চলমান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয় নিয়েও কাজ হচ্ছে। সম্প্রতি চীনের থার্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফির একটি প্রতিনিধিদল কক্সবাজারে ইনস্টিটিউট পরিদর্শন এবং যৌথ কার্যক্রম বিষয়ে আলোচনা করেছে। ভারতের সঙ্গে জেএসটিসি সভায় পারস্পরিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে সব বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইতোমধ্যে ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি, গোয়া থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
বঙ্গোপসাগরের নিচে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি (তেল-গ্যাস) মজুদ রয়েছে যা আগামী দিনের জ্বালানি-রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। গবেষণার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে উত্তোলনের ব্যবস্থা নিতে পারে বাংলাদেশ। তাছাড়া বঙ্গোপসাগরে বিভিন্ন ধরনের ভারী খনিজ বা ধাতুর সন্ধান পাওয়া গেছে। যা সঠিক উপায়ে উত্তোলন করতে পারলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এটার জন্যও গবেষণা কাজে সফলতা প্রয়োজন। বঙ্গোপসাগরের এক্সকুসিভ ইকোনমিক জোন এলাকায় প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মৎস্য রয়েছে। আধুনিক ফিশিং ট্রলার সরবরাহ করে জেলেদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মৎস্য আহরণ ক্ষমতা প্রত্যাশিত মাত্রায় বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রেও কাজ করবে প্রতিষ্ঠানটি।
গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করে বন্দরে সুযোগ সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যি জাহাজ সমূহের ফিডার পরিষেবা কার্যক্রম বাড়ানোর মাধ্যমে আমাদের বন্দরসমূহ কলম্বো, সিঙ্গাপুর বন্দরের মতো আরো গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হয়ে উঠতে পারে। সে জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সহায়তা দিবে গবেষক দল। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহকে সেফালোপোড, স্কুইড ও অক্টোপাসসহ অন্যান্য মৎস্য আহরণ কার্যক্রমে অন্তর্ভূক্ত করে নমুনা সংগ্রহের জন্য আধুনিক ট্রলার সরবরাহ ও জেলেদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মৎস্য আহরণ বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এ কাজের জন্যও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পদ্ধতিগত সহায়তা দিবে সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট।
আনন্দবাজার/শহক









