ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পাওয়া চারুকলার সেই বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা হয়েছিল যশোর থেকে। সেই ১৯৮৫ সালে (১৩৯২ বাংলা) যশোরের চারুপীঠ ‘বর্ষবরণের শোভাযাত্রা’ বের করেছিল। সেই চারুপীঠের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী মাহবুব জামাল শামীম।
পরের বছর ১৯৮৬ সালে (১৩৯৩ বাংলা) যশোরের সব সাংস্কৃতিক সংগঠন একসঙ্গে নতুন বছরকে বরণ করতে ‘যশোর বর্ষবরণ পর্ষদ’ গঠন করে। সেবছর বর্ষবরণ শোভাযাত্রাকে চারুপীঠের আয়োজন না বলে সবার সম্মিলিত আয়োজন বলা হলো। ফলে দেশের প্রতিটি অঞ্চল ও প্রতিষ্ঠান এ উৎসবকে নিজের উৎসব বলে গ্রহণ করে নেয়। পরে এ শোভাযাত্রা বড় পরিসরে প্রকাশ পায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ১৯৮৫ সালের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়াশোনা শেষে নিজ শহর যশোরে ফেরেন মাহবুব জামাল শামীম, হীরন্ময় চন্দ্রসহ কয়েক তরুণ। এর মধ্যে মাহবুব জামাল শামীম আঁকিয়েদের নিয়ে চারুপীঠ নামে সংগঠন চালু করেন। সেই চারুপীঠ প্রথমবারের মতো ‘বর্ষবরণের শোভাযাত্রা’ বের করে। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে মাহবুব জামাল শামীম, হীরন্ময় চন্দ্র উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যান।
সেবছর ঢাবির চারুকলার শিক্ষার্থীরা ও ডিপার্টমেন্টের ছোট-বড়রা পরিকল্পনা করেন বর্ষবরণ শোভাযাত্রার। সেবারই প্রথম ১৯৮৯ (১৩৯৬ বাংলা) সালে চারুকলার শিক্ষার্থীরা বর্ষবরণের শোভাযাত্রা বের করেন। পরের বছর তা কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও বরিশালে এবং এরপর সারাদেশে ছড়িয়ে যায়। যদিও ১৯৯০ সালে সঙ্গীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হক ও ভাষাসৈনিক ইমদাদ হোসেনের পরামর্শে বর্ষবরণের এই শোভাযাত্রাকে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামকরণ করা হয়। ১৯৯৪ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ শহরে ও শান্তিনিকেতনে বাংলা বর্ষবরণে শোভাযাত্রা বের হয়। বর্তমানে সব জেলা-উপজেলায় উদযাপন হয় বর্ষবরণ শোভাযাত্রা।
যশোরে বর্ষবরণ শোভাযাত্রার অন্যতম উদ্যোক্তা মাহবুব জামাল শামিম বলেন, ১৯৮৫ সালে বাংলা ১৩৯২ পহেলা বৈশাখ, আলো-না-ফোটা ভোর, যশোর পুরনো কলেজ প্রাঙ্গণে চারুপীঠের পলাশ মস্কন্দের আঙিনায় ৩০০ শিশু ও ১০০ তরুণ মিলিত হয়। অপরূপ রঙিন মুকুট পরেছে রাজকুমার, রাজকুমারি, পরি, ফুল, প্রজাপতি, ময়ুর, টিয়াা কত না রূপ ধরেছে। বাঘ, দৈত্য, ভূতের মুখোশেরা যেন মুচকি হেসে হাঁউ মাঁউ কাঁউ বলে ভয় দেখায়। নানা ভঙ্গিমার বিচিত্র রঙের বিস্ময় জাগানো মুখোশেরা তামাসা করে সবার সঙ্গে। রঙিন পোশাকে রাঙিয়েছে সারা অঙ্গন। হঠাৎ বেজে উঠলো সানাই, বাড়ি পড়ে ঢাকঢোল, কাশি, ঝাঁঝরিতে।
মাহবুব জামাল শামিম বলেন, দুই মাসের তপস্যায় রাঙানো, সুরের তালে নৃত্যের ছন্দে সাধা সে মনেরা বেজে ওঠলো, সারিবদ্ধ হয়ে শিশুরা নেচে উঠে রূপে অপরূপে নানা ভঙ্গিমায়। জ্বলে ওঠে পোশাকের ঝকমারি। তখন এমন অনুভূতি হয় যে স্বর্গ থেকে অঝোরে নেমেছে আনন্দ বৃষ্টিধারা। ভোর ৬টায় যশোরের নীরব শীতল প্রভাতে, শিশির ভেজাপথে আনন্দ কৌতুক উচ্ছ্বাসে বিস্ময়কর রং ছড়িয়ে বাদ্যের তালে তালে নৃত্যের উচ্ছ্বলতায় শোভাযাত্রা এগিয়ে চলে পথ থেকে পথে। আনন্দ বর্ষণধারা আর যেন শেষ হয় না। শহর প্রদক্ষিণ করে এসে চারুপীঠে থামার কথা, না থামলো না। চলতে থাকল ক্লান্তিহীন। পূর্ব থেকে ফিরে পশ্চিমে, উত্তর-দক্ষিণে দূর থেকে দূরে যেন ছড়িয়ে গেল তা দেশ থেকে দেশান্তরে এমনি অনুভূতি ছিল সেদিন।
এমন সুন্দর আয়োজনে কেন সবাই আমন্ত্রিত নয়, এই আক্ষেপ নিয়ে এলেন যশোর থেকে অ্যাডভোকেট কাজী আব্দুস শহীদ লাল। এরপর নানা সংগঠন থেকে অংশগ্রহণ না করতে পারার আক্ষেপ পকাশের পালা। তখন সিদ্ধান্ত হলো পরবর্তী বছর ১৯৮৬ (১৩৯৩ বাংলা) যশোরের সব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উদ্যোগে বর্ষবরণকে সামাজিক উৎসবে রূপদান করা হবে। সব সাংস্কৃতিক সংগঠন একসঙ্গে নতুন বছর বরণ করতে যশোর বর্ষবরণ পর্ষদ গঠন করা হলো। বর্ষবরণ শোভাযাত্রাকে চারুপীঠের আয়োজন না বলে সবার মিলিত আয়োজন বলা হলো। যাতে সারা দেশে, প্রতি অঞ্চল ও প্রতিষ্ঠান এ উৎসবকে নিজের উৎসব বলে গ্রহণ করে।
ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান যশোর ইনস্টিটিউট যশোরের সব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান-সংগঠনের মাতার ভূমিকায় ছিল। চারুপীঠের অভিনব উৎসব কর্মসূচিগুলোকে সামাজিক রূপদানে সমস্ত প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে দেয়। উৎসবের সব কর্মযজ্ঞের কেন্দ্র ছিল এই প্রতিষ্ঠান। সেদিন ৩৫০০ মানুষের শোভাযাত্রা এগিয়ে যায়। সব দলের নিজস্ব সাজসজ্জা উপকরণ থাকলেও ৩০০০ মানুষের সবার মাথায় বর্ণাঢ়্য মুকুট ও প্রতি দলে ৩০টি করে অলঙ্কৃত শোলার পাখা শোভাযাত্রার আগা-গোড়া দলগুলোকে যেন একই সুরে মেলানো হয়েছিল। উজ্জল রঙিন বানরেরা ১২ ফুট লাঠিতে লাফিয়ে উঠা-নামায় ছিল সারাক্ষণ।
প্রয়াত সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম (বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য) ও খালেদুর রহমান টিটো (আওয়ামী লীগ এমপি) মুকুট পরে সবার সঙ্গে দ্রুত পায়ে হাঁটেন। তারা দুইজন উচ্ছ্বাসে বলেন, ‘এমন উৎসব জাতীয় আয়োজন প্রয়োজন’। ইতালীয় চিত্রকর ফাদার মাচ্চেল্য যশোর ক্যাথলিক গির্জার পুরোহিত, তিনি বিশাল আকৃতির একটি ক্যামেরা ঘাড়ে সারা উৎসবকে ধারণ করেছিলেন। যেন কোনো আন্তর্জাতিক উৎসব সেটি।
শোভাযাত্রা চারুপীঠ থেকে শুরু হয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে যশোর ইনস্টিটিউটে বৈশাখী মেলা উদ্বোধনে শেষ হয়। সেখানে ৩৫০০ মানুষকে কুলি-পাকান পিঠার প্যাকেটে আপ্যায়ন করা হয়। উৎসবের উন্মাদনায় মায়েরা আন্তরিকতায় রাত জেগে বিপুল সংখ্যক পিঠা তৈরি করেছিলেন। পহেলা বৈশাখের এক ঘণ্টা যেন সারা বছরের সেরা সময় এমনই এক পরম অনুভূতি ছিল সবার। শোভাযাত্রা শেষ করে পরবর্তী বছরের পরিকল্পনায় বিভোর ছিল সকলে। উৎসবকে জীবনের সর্বস্ব দিয়ে ফেলে আয়োজক ও অংশগ্রহনকারীরা। বাংলা বর্ষ বরণের সমাজ উৎসবের ধারাবাহিকতা শুরু হওয়ার সেটিই প্রথম লগ্ন।
আনন্দবাজার/শহক









