দাম নাগালের মধ্যে আসায় এখন উচ্চ প্রযুক্তির টেলিভিশনও (টিভি) গ্রামে-গঞ্জের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। শুধু একটিই নয়, অনেক ঘরে একাধিক টিভিও রয়েছে। পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান থেকে করপোরেট অফিস, হাসপাতাল থেকে বিপণিবিতান, স্টেশন থেকে বন্দর টিভির ব্যবহার সব জায়গাতেই। তবে এখন শুধু বিনোদন আর সংবাদ জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, টিভি এখন তথ্যের আদান-প্রদান, প্রচারমাধ্যমসহ জীবনযাত্রায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি অনুষঙ্গ হিসেবেই জায়গা দখল করে নিয়েছে।
দেশে মোট ইলেকট্রনিকস যন্ত্রের ৩৫ শতাংশ দখল করে থাকা টিভিতে এখন ক্লাস, জুম মিটিং, ইন্টারনেট ব্রাউজিংসহ জীবনের সব কাজেই লাগছে। এমনকি রাস্তার পাশে বিজ্ঞাপনী বুথ, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা মনিটর, বাস, রেল, বিমানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনায়, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রচারণায় টিভির ব্যবহার বাড়ছে। এতে প্রতিবছর বিক্রি বাড়ছে। দিন দিন টিভিও হয়ে উঠছে স্মার্ট। করোনা মহামারিতে কিছুটা ধাক্কা খেলেও আবারো চাঙা হয়ে উঠছে টিভির বাজার।
উদ্যোক্তারা বলছেন, টিভির বাজারে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের ইলেকট্রনিকসের বাজার আরো অনেক বড় হবে, সঙ্গে সঙ্গে টিভির বাজারও। অনেক সুযোগ রয়েছে এ খাতে। তবে এর জন্য কিছু নীতি সহায়তা দিতে হবে। দেশে মোটরসাইকেল শিল্পের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। এভাবে ইলেকট্রনিকস বা টেলিভিশনশিল্পের জন্যও একটি নীতি করা দরকার। এতে দেশীয় শিল্প আরো শক্তিশালী হবে। আধুনিক টেকনোলজিগুলো আসবে, কর্মীদের দক্ষতাও বাড়বে।
বিভিন্ন উৎপাদক কম্পানির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বাজারের জন্য টিভি উৎপাদনে তারা সবার আগের দামের বিষয়টি মাথায় রাখেন। ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে টিভি তৈরি করছেন তারা। বাজারে ১৫ থেকে ২০টি মডেলের টিভি রয়েছে। এখনো ৯ থেকে ১০ হাজার টাকার টিভিই বেশি চলে দেশের বাজারে। দামের পর বিক্রয়োত্তর সেবায় গুরুত্ব দেন বেশি। বাজারে বর্তমানে এলইডি টিভির চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানিমুখী দেশীয় টেলিভিশন শিল্পের বিকাশে বড় বাধা দাঁড়িয়েছে স্থানীয় বাজার। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে ভ্যাট, ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বিদেশ থেকে টিভি আমদানি করে দামে বিক্রি করছে। এসব টিভির মান খুবই নিম্ন। এদিকে গ্রে মার্কেট থেকে কম দামে নিম্নমানের টিভি কিনে ঠকছেন ক্রেতারা।
অন্যদিকে দ্রুত বিকশিত দেশীয় টেলিভিশনশিল্পের অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই কাস্টমস, শুল্ক বিভাগসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কাছে এ খাতের দেশীয় উদ্যোক্তাদের দাবি—দেশের গ্রে মার্কেটে টেলিভিশন বেচাকেনা বন্ধে তারা যেন দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। অন্যথায় মুখ থুবড়ে পড়বে দ্রুত বিকশিত ব্যাপক সম্ভাবনাময় রফতানিমুখী এই শিল্প।
উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব মতে, কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে টিভি বিক্রি বেড়েছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। বছরে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টিভির চাহিদা রয়েছে শুধু দেশেই। এই চাহিদার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই উৎপাদন করছে দেশীয় কম্পানিগুলো। বাকি ৩০ শতাংশ বৈশ্বিক কম্পানিগুলোর দখলে রয়েছে। দেশে মূলত বার্ষিক টিভির বাজার তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকার। দেশের বড় কয়েকটি কোম্পানি এখন দেশীয় বাজারের চেয়ে রফতানির বাজারের দিকেই মনোযোগ দিয়েছে বেশি।
দেশের গন্ডি পেরিয়ে ওয়ালটনসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান টিভি রফতানি করছে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপের ৪০টিরও বেশি দেশে টিভি রফতানি হচ্ছে। ইউরোপের বাজারে বড় রফতানিকারক হলো দেশীয় ব্র্যান্ড ওয়ালটন। ওয়ালটনের মোট টিভি রফতানির ৯০ শতাংশেরও বেশি যাচ্ছে ইউরোপে। ইউরোপে দুই বছর আগে টিভি রফতানি শুরু করে ওয়ালটন। ইউরোপের নামিদামি গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে অল্প সময়ের মধ্যে ইউরোপের দেশে টিভি রফতানি কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে ওয়ালটন।
ওয়ালটন টিভির চিফ বিজনেস অফিসার প্রকৌশলী মোস্তফা নাহিদ হোসেন জানান, ইউরোপের বাজারে ওয়ালটনের তৈরি টিভি রফতানি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। ইউরোপীয় ক্রেতারা উচ্চমানের পণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের ওপর আস্থা রাখছে।
আনন্দবাজার/শহক








