সাত বিভাগে হরেক দাম, পেঁয়াজে স্বস্তি চট্টগ্রামে, গরুর মাংসে অস্বস্তি বরিশালে, মাছে টেনশন ময়মনসিংহে
নিত্যপণ্যের বাজারের সঠিক তথ্য দেয়া ভারী মুশকিল। যে পণ্যের দাম এই মুহূর্তে ঠিক বলে ধরে নিচ্ছেন এক হাত বদল হলেই যে পণ্যের দাম চড়ে যাচ্ছে। আর পণ্যের দাম বরিশালে যা দেখছেন তার দ্বিগুণ দামে হয়তো বিক্রি হচ্ছে রংপুরে। এমনই চরিত্র নিত্যপণ্যের বাজার। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, নিত্যপণ্য বিশেষত পচনশীল পণ্যের লাগাম টানা খুবই মুশকিল। উৎপাদক থেকে শুরু করে সরবরাহকারীদের একটাই লক্ষ্য থাকে- দ্রুত ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিয়ে মুনাফা নিশ্চিত করা। তাই যে দামেই হোক হস্তান্তর করতেই হবে। আর পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি হলেই দাম বিক্রেতারা দাম হাঁকেন দ্বিগুণ তিনগুণ।
আনন্দবাজারের পক্ষ থেকে গতকাল শুক্রবার দেশের আট বিভাগের হরেক পণ্যের দাম বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, চাল ডাল আর সয়াবিন তেলের দামে তুলনামুলক স্বস্তিতে রয়েছেন রাজশাহীর ক্রেতারা। আবার পেঁয়াজের দামে খানিকটা স্বস্তি পাচ্ছেন খাতুনগঞ্জভিত্তিক চট্টগ্রামের ক্রেতারা। অন্যদিকে, গরুর মাংসের দাম সবচেয়ে বেশি বরিশাল অঞ্চলে। আবার মাছের দামে অস্বস্তি রয়েছে ময়মনসিংহের ক্রেতাদের মধ্যে। আর প্রাপ্ত তথ্যমতে, সরিষার তেলের দাম সবচেয়ে বেশি খুলনায়।
ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন আমাকে
যেমন গরুর মাংস সবচেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বরিশালের ক্রেতাদের। দেশের আট বিভাগের মধ্যে দামে চড়া সেখানেই। কেজিতে দিতে হচ্ছে ৬৫০ টাকা। দেশের অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে দামের পার্থক্য ১০০ টাকা। বাজারে গিয়ে ক্রেতারা স্বস্তি পাচ্ছেন শুধু আলুতে। আট বিভাগে একই দামে তথা ২৫ টাকা দিয়ে হল্যান্ডের আলু কিনছেন ক্রেতারা। রুই মাছেও রয়েছে আকাশ ছোঁয়া দাম। এক কেজি রুই কিনতে ময়মনসিংহের ক্রেতাদের দিতে হচ্ছে ৪০০ টাকা। অথচ দেশের সবচেয়ে বেশি পাঙ্গাস মাছ বেশি চাষ হয় বিভাগটিতে।
সাধারণ মানুষ মোটা চালই বেশি খায়। এটি ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে ৫৬ টাকা ও সবচেয়ে কম দাম রাজশাহীতে ৪৩ টাকা কেজি। নাজিশাইল চাল ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে ৭০ টাকা, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহে ৬৫ এবং সবচেয়ে কম খুলনায় মাত্র ৬২ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মসুরের ডাল দেশিটা সবচেয়ে বেশি দাম সিলেটে। সেখানে ১৩০ টাকা কেজি আর সবচেয়ে কম দাম রাজশাহীতে। সেখানে ১১০ টাকা কেজি। মসূরের ডাল (আমদানি) দামের দিকে আগুন হচ্ছে ময়মনসিংহে। এখানে ১১০ টাকা খুলনায় মাত্র ৮০ টাকা। কেজিতে দুই বিভাগে ৩০ টাকা পার্থক্য।
সয়াবিন তেল সবচেয়ে কম দাম ময়মনসিংহে। সেখানে ১৩০ টাকা লিটার। সিলেটে ১৬৫ টাকা। বেশি দুই বিভাগে ৩৫ টাকা ব্যবধান লিটারপ্রতি। খুলনা বিভাগে সরিষার তেল সবচেয়ে বেশি। দাম ৩৫০ টাকা প্রতি লিটারে। কম হচ্ছে ময়মনসিংহে। এখানে মাত্র ২০০ টাকা লিটার। নদীঘেরা বরিশালে ব্রয়লার মুরগির কেজি ২০০ টাকা। ময়মনসিংহে ১৪০ টাকা। রাজশাহী ও খুলনায় ১৪৫, সিলেট ও চট্টগ্রামে ১৯০ টাকা ও ঢাকায় ১৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। বরিশাল ও ময়মনসিংহে দামের ব্যবধান ৬০ টাকা কেজিতে।
গরুর মাংস যেনো সাধারণ মানুষের খাবার তালিকাতে বিরল হয়ে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রাম ও বরিশালে। বিভাগ দুটিতে ৬৫০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে এক কেজি মাংস। অপরদিকে ঢাকা ৬০০, খুলনা ও ময়মনসিংহে ৫৫০ টাকা। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম সিলেটে। সেখানে ৫৩০ টাকায় মিলছে এক কেজি গরুর মাংস।
সব তরকারিতেই চলা আলুর দাম সবচেয়ে কম রাজশাহীতে। এখানে প্রতি কেজি ২০ টাকা। ঢাকাতে ২৪, খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও সিলেটে ২৫ টাকা কেজি হল্যান্ডের আলু। পেঁয়াজের দাম সবচেয়ে কম ময়মনসিংহে। মাত্র ২৮টাকায় এক কেজি পেঁয়াজ কিনতে পারছেন ক্রেতারা। রংপুরে পেঁয়াজের ঝাঁজ চড়া। সেখানে ৭০ টাকা লাগছে এক কেজি পেঁয়াজ ব্যাগে তুলতে। বিভাগ দুটিতে দামের পার্থক্য ৪২ টাকা কেজিপ্রতি।
কাঁচামরিচের ঝাল নেই ময়মনসিংহে। বিভাগটিতে মাত্র ২০ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে হচ্ছে কাঁচামরিচ। তবে বরিশালে ক্রেতাদের কাঁদিয়ে ছাড়ছে। সেখানে ১২০ টাকা কেজি। ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৫০, রাজশাহীতে ৭০, খুলনায় ৫৫, রংপুরে ৬০ ও সিলেটে ৪০ টাকা। ময়মনসিংহ ও বরিশালে কেজিতে ব্যবধান ১০০ টাকা।
রুই মাছ পাতে রাখতে পারছে না ময়মনসিংহের খাদ্যরসিকরা। এক কেজি ওজনের রুইমাছ কিনতে হচ্ছে ৪০০ টাকা দিয়ে। তবে এদিকে স্বস্তিতে আছেন সিলেটের লোকেরা। তারা ২১০ টাকাতেই পাচ্ছেন রুইয়ের স্বাদ। ঢাকা ও রাজশাহীতে ২২০, চট্টগ্রামে ২০০, খুলনায় ২৩০ ও রংপুরে ২৮০ টাকা কেজিতে কিনতে পারছেন খাদ্যরসিকরা।
খোলা আটা সবচেয়ে বেশি বরিশালে। সেখানে কেজিপ্রতি ৪০ টাকা। ঢাকা, রাজশাহী ও রংপুরে ৩২, ময়মনসিংহে ৩৮ ও রংপুরে ৩৬ টাকায় খেতে পারছেন সাধারণ মানুষ। ফার্মের মুরগির ডিম সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রিও হচ্ছে বরিশালে। সেখানে ৪০ টাকা লাগছে এক হালি ডিম কিনতে। ঢাকা, রাজশাহী, রংপুরে ৩২, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটে ৩০ টাকা এবং ময়মনসিংহে ৩৫ টাকা হালিতে বিক্রি হচ্ছে।

চিনির মিষ্টতা থেকে অনেক দূরে বরিশাল। বিভাগটিতে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এক কেজি চিনি। আকাশছুঁয়া দাম বরিশালে। বিভাগটিতে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকা, খুলনা, সিলেটে ৭০টাকা ও রংপুরে ৭২ এবং ময়মনসিংহে ৭৬ টাকা কেজি। ঢাকার চেয়েও ১০ টাকা কেজিতে বেশি হলো বরিশালে।
রাজধানী ঢাকাতে একেক বাজারে পণ্যের দাম একেক রকম। তবে গড়ে প্রায় প্রতিটি বাজারে সিম প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়, কাঁচামরিচ ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে, গাঁজর ৮০ টাকায়, করলা ৬০ টাকায়, বাঁধা কপি ৪০ টাকায় (প্রতি পিস মাঝারি), ফুলকপি ৫০ টাকায় (প্রতি পিস মাঝারি), মূলা ৪০ টাকায়, নতুন আলু ৮০ টাকায়, সাধারণ আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকায়, বরবটি ৬০ টাকায়, বেগুন ৫০ টাকায়, টমেটো ১৪০ টাকায়, ঢেঁড়স ৬০ টাকায়, শসা ৪০ টাকায়, পেঁপে ৩০ টাকায়, শালগম ৬০ টাকায়, পটল ৬০ টাকায়, পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় এবং ডিম প্রতি ডজন বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকায়।
রাজশাহীতে অন্যান্য পণ্যের বাজার দর হচ্ছে- খাসির মাংস ৮০০ টাকাসোনালী মুরগি ২৮০ থেকে ২৯০ টাকা। চালের বাজারে আঠাশ ৫৬ টাকা, সুমন স্বর্ণা ৪৩ থেকে ৪৪ টাকা, মিনিকেট ৫৭ থেকে ৫৮ টাকা, জিরা ৪৮ টাকা। ডালের বাজারে মটর ডাল ৫০ টাকা, মাসকালাই ১৩০ টাকা, মুগ ১০০ টাকা, খেসাড়ী ৬০ টাকা।
সবজির মধ্যে প্রতি কেজি শিম ৪০ টাকা, করলা ৩০ টাকা, ঢেড়শ ৩০ টাকা, বেগুন ৩০ টাকা, পাতাকপি ৪০ টাকা, ফুলকপি ৫০ টাকা, পটল ২০ টাকা, মুলা ২০ টাকা, বরবটি ৩০ টাকা, কুমড়া প্রতি পিস ২০ থেকে ৩০ টাকা, কাঁচামরিচ প্রতি কেজি ৭০ টাকা, আলু ২০ টাকা, পেঁয়াজ ৬০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা, রসূন ৫০ টাকা, আদা ৮০ টাকা কেজি।
মসলার বাজারে প্রতি কেজি জিরা ৩২০ টাকা, তেজপাতা ২০০ টাকা, এলাচ ২ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা, ডালচিনি ৪০০ টাকা, লং এক হাজার ২০০ টাকা। মাছের বাজারে চিংড়ি ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা, পাঙ্গাস ১০০ থেকে ১২০ টাকা, বড় সিলভার কার্প (৩ থেকে ৫ কেজি) ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, মাঝারি সিলভার কার্প (দেড় থেকে আড়াই কেজি) ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।
আনন্দবাজার/শহক








