ঘুর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে তিনদিনের টানা বৃষ্টিতে যশোর পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে পৌরসভার ৬ ও ৭নং ওয়ার্ডে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পৌরবাসীর মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখগাথা হয়ে আছে এ জলাবদ্ধতা। ভারী কিংবা স্বল্প বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় পৌরসভার বিস্তৃীণ এলাকা।
জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাচ্ছেন রেললাইন সংলগ্ন চোপদারপাড়া ও জমদ্দারপাড়ার মানুষ। বৃষ্টিপাত থামলেও এখনো জমে আছে হাঁটুসমান পানি। এতে চরমদুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মাণ করায় তা দিয়ে ঠিকমত পানি নিষ্কাসন হচ্ছে না। অল্পবৃষ্টিতেই এলাকা তলিয়ে যায় হাঁট কিংবা কোমর সমান পানিতে।
এদিকে গত কয়েক বছরে ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনে পৌর কর্তৃপক্ষ কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও কোন সুফল আসছে না। পৌর শহর থেকে পানি নির্গমনের প্রায় সব পথ বন্ধ থাকায় মানুষের দুর্দশা কাটছে না। যশোর পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ১০ বছরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও তৎসংলগ্ন সড়ক উন্নয়নে পৌরসভার ৯ ওয়ার্ডে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে এ ব্যয় জলাবদ্ধতা নিরসনে খুব একটা কাজে আসছে না। সামান্য বৃষ্টিতেই পৌরসভার ৬ ও ৭ নং ওয়ার্ডে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। ৭নং ওয়ার্ডের শংকরপুর চোবদার পাড়ার বাসিন্দা খন্দকার আবু হোসেন জানান, এলাকায় প্রায় সকল বাড়ির উঠানে এবং অধিকাংশ ঘরে পানি ঢুকেছে। এতে দৈনন্দিন কাজে অসুবিধা হচ্ছে। পানি দ্রুত নিষ্কাসনের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পিত উন্নয়ন না হওয়ায় কোটি টাকার প্রকল্পের কোন সুফল পাচ্ছে না তারা। বরং আধাঘন্টার বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় এ দুটি ওয়ার্ডের রাস্তাঘাট বাড়ি-ঘরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা।
জানা যায়, যশোর শহরকে উত্তর আর দক্ষিণ অংশে ভাগ করেছে মৃতপ্রায় ভৈরব নদ। শহরের উত্তর অংশের পানি নিষ্কাসন হয় এ নদ দিয়ে। আর দক্ষিণ অংশের পানি নিষ্কাশন হয় ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে বিল হরিনায়। তবে হরিনার বিল এখন আর নেই বললেই চলে। পরিকল্পিতভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়ায় দুর্ভোগের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। সামান্য বৃষ্টিতেই এ দুটি ওয়ার্ডের রাস্তাঘাট, বাড়িঘরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এতে বর্ষা মৌসুমজুড়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় স্থানীয়দের। শহরের শংকরপুর, বজপাড়া এলাকার হাজারো বাড়িতে পানি ঢুকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এসব এলাকার বাসাবাড়ির রান্নাঘরে পানি ওঠায় বেশিরভাগ বাড়িতে রান্না বন্ধ রয়েছে।
গৃহ পরিচারিকা লিলিমা খাতুন জানান, আমরা পানির ভিতর কষ্ট করি। কিন্তু মায়ার খাতিরে এ জায়গা থেকে সরতে চাইনা। আমরা বহুকাল ধরে এ জায়গা থেকে যাতি চাইনে। পানি হলেও ওই কষ্ট করেই থাকি। দুই তিনদিন না খেয়েও আমাগের দিন চলে যায়। মাঝে মাঝে দুই এক ওয়াক্ত খিচুরী দিয়ে যায়। আবার মাঝেমাঝে দেয়না। আমাদের কষ্ট হয় একটু।”
শংকরপুর এলাকার বাসিন্দা গৃহিনী শিখা খাতুন জানান, বৃষ্টি শুরু হলেই আমাদের দুর্দশার সীমা থাকে না। এ এলাকার প্রায় সকলের ঘরেই পানি থৈ থৈ করছে। খাটের ওপর উনুন রেখে রান্না করতে হয়। ছেলে- মেয়েদের নিয়ে বড়ই বিপদে আছি। জমদ্দারপাড়ার বাসিন্দা রিকশা চালক আজিজ শেখ জানান, খুবই বাজে অবস্থার মধ্যে আছি। ড্রেনে উপচে ময়লা আবর্জনাসহ পানি ঘরের মধ্যে চলে এসেছে।
তবে পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর ভুক্তভোগীরা বলছেন, পানি নিষ্কাসনে পৌরসভার পুরো পরিকল্পনায় ক্রুটি রয়েছে। বৃষ্টি হলেই পানি ঘরে ঢুকবে। এটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যশোর পৌরসভার সচিব আজমল হোসেন জানান, ৯ ওয়ার্ডের ২০১৬-১৭ অর্থ বছর থেকে নগরাঞ্চলে উন্নয়ন প্রকল্প ও তৃতীয়নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নতিকরণ প্রকল্পের আওতায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও তৎসংলগ্ন সড়ক উন্নয়নে কাজ চলছে। এরই আওতায় হরিনার বিল এলাকার খাল মুক্তেশ্বরী নদীর সাথে সংযোগ দেয়া হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে যশোরে জলাবদ্ধতা নিষ্কাসন আরও সহজ হবে।
তিনি এ জলাবদ্ধতার জন্যে অনাকাঙ্খিত অতিবৃষ্টিকে দায়ী করেন। যশোর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শরীফ হাসান বলেন, যশোর শহরকে দু’ভাগে ভাগ করেছে ভৈরব নদ। শহরের উত্তর অংশের পানি নিষ্কাসনের ব্যবস্থ্যা এ নদকে ঘিরে। আর দক্ষিণ অংশের পানি নিষ্কাশন হয় পৌরসভার ৬ ও ৭ নং ওয়ার্ডের উপর দিয়ে হরিনার বিলে।
যশোর পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র মোকছিমুল বারী অপু বলেন, আসলে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার জায়গা না রেখে অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন ও পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যশোর পৌরসভার মেয়রসহ জনপ্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। আমরা চেষ্টা করছি, আগামী বছরের মধ্যে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসন করার।









